আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্রী আর আতিক সিনেমায় কাজ করে। মেট্রিকে আমরা ব্যাচমেট ছিলাম। তবে সেটি আমার জানা ছিল না। তারা ছবির শ্যুটিং শুরু করল। বাসাটি আমিই তাদের ভাড়া নিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের পাশের বাসা। এরপর থেকে আতিকের সঙ্গে পরিচয়, আরও পরে প্রেম। চারুকলা থেকে পাস করে শান্তিনিকেতনে উচ্চতর লেখাপড়া করতে গেলাম, তখন দুুদিনের জন্য সে বেড়াতে গেল। কিন্তু থেকে গেল একটি মাস। ২০০২ সালের এই সময়ের মধ্যে আমাদের প্রেম, ভালোবাসা। কেন তাকে ভালোবেসেছি? আতিকের পাগলামো আমার ভালো লাগে। প্রথম যেদিন সে এলো, চাঁদনি রাত ছিল; আমরা পাশের সাঁওতালদের গ্রামে ঘুরতে গেলাম। সেখানে নাচ-গান দেখলাম। সারা রাত আরও কয়েকজনের সঙ্গে মিলে গল্প করলাম। ভোর হয়ে যাওয়ার পর আমার উপলব্ধি হলো, এই মানুষটি তো আমাকে ছাড়া আর ফিরে যেতে পারবে না। অন্যদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আতিক যখন ফিরে যাচ্ছে, সে দূর থেকে চিৎকার করতে করতে বলছিল, ‘আমি কিন্তু ফিরে যাব না, আমি থাকব।’ এই কথাগুলো এখনো আমাকে নাড়া দেয়। আসলেই সে আর যেতে পারেনি।
আতিক আমার জীবনের পুরোটা জুড়ে আছে। সে সিনেমার লোক, আমিও এদিকে আছি। আমার তিনটি সন্তানের নামও আতিক সিনেমার নামে রেখেছে। প্রথমটি ঋত্বিক সাধু, দ্বিতীয়টি ওম শান্তি আর সর্বশেষ হলো অগ্নি সত্য। বাবা যেমন ওদের জন্য সারাক্ষণ অস্থির থাকে, ওরাও বাবা ছাড়া কিছু বোঝে না। কিন্তু বাবার কোনো কাজই সে করে না। সব আমাকেই করতে হয়। সব দায়দায়িত্ব আমার। কিন্তু বাবা হিসেবে সে-ই সামনে দাঁড়ায়।
এই সংসারে আমি আতিকের সঙ্গে সারা জীবন ঝগড়া করেই যাচ্ছি। কিন্তু অন্যদের মতো আমরা কেউ কারও মান-অভিমান ভাঙাতে যাইনি। তুমুল ঝগড়ার পর তোমার সংসার তুমি দেখÑ এই বলে আমি বেরিয়ে যাই। আতিক আমাকে খুঁজে খুঁজে বের করে। অথবা আমার সামনে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য সে তার পরিচিতদের মাধ্যমে আমার প্রিয় ‘চা’ বাক্স কিনে পাঠিয়ে দেয়। তবে কোনোদিন আতিকের মান-অভিমান আমি ভাঙাইনি। একটু শান্তি সে আমাকে বরাবরই দেয়। লেখার প্রতি তুমুল ভালোবাসা থেকে যেহেতু আমি লিখি, আমার সবগুলো স্মৃতিই উজ্জ্বল। ফলে নুরুল আলম আতিকের সঙ্গে মাতিয়া বানু শুকুর জীবনের সব স্মৃতিই তার মনে থাকে। ফলে এই অন্যরকম, অসাধারণ মেধাবী কিন্তু খেয়ালের ঘোরে থাকা মানুষটিকে সে দারুণভাবে ভালোবাসে। এই মানুষটিই ঘোর কৃষ্ণবর্ণেও মেয়েটির জীবনে ভালোবাসার জন্ম দিয়েছে। কোনোদিন প্রেম হবে না বলে ছোট থেকে সারাক্ষণ সে হতাশ হয়ে থাকত। অন্যদের হয়, আমার কেন হয় না? হবে না তো কোনোদিন? কালো মেয়েদের তো কেউ ভালোবাসে না। একা একাই কোনো না কোনো ছেলের সঙ্গে মনের গভীরে ভালোবাসা গড়ে নিতাম আমি। বিরহ তৈরি করতাম। কিন্তু বড় হয়ে সেই বোধ আমার বদলে গেল। দেখলাম, আমারও আছে প্রেমিক, তাও অসংখ্য। কেন? আসলে মানুষের বোধ, ব্যক্তিত্বই প্রধান।
অনেকেই জানেন, আমার বাবা আবদুল মতিন। মরহুম এই মানুষটি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক ছিলেন। তারা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি আদায় করেছেন। আমার মা-বাবা কোনোদিন ভালোবাসা বা সম্পর্ককে খারাপ চোখে দেখেননি। তাই খুব ছোটবেলা তারা তাদের বড় মেয়েকে বন্ধু বেছে নেওয়ার, চলাফেরার স্বাধীনতা দিয়েছেন। বলে দিয়েছেন, তোমার জীবনের প্রয়োজনীয় সব সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নিতে পারবে। কিন্তু কোনটি ভুল, শুদ্ধ তারা শিখিয়ে দিতেন। ভালো মন্দ শেখানোয় ভুল না করার সিদ্ধান্ত তারা মেয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে যখন-তখন চাইলেই যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারতাম না। সেই শিক্ষাটি হয়েছে। আতিকের কথা বলার পর বাবা বলেছিলেন, যাকে ভালোবাসো আগে দেখো তার ওপর কতটা আস্থা রাখতে পারো? শতভাগ আস্থা রাখতে পারলে ভালোবাসো। একশ ভাগ বিশ^াস করতে পারলে তাকে ভালোবাসো। তোমাকে সম্মান করলে তার কাছে যাও। এটিই ভালোবাসা। প্রেম তো আতিকের সঙ্গে আমার অনেক গল্পে ভরা। যে নাটক-সিনেমা লিখে চলছি, সেগুলোর পুঁজি তো ওই।