শীতের কম্বল বিলাতে গিয়ে গড়েছেন স্কুল, তৈরি করেছেন কুয়া, গুণীজন সংবর্ধনা দিয়েছেন, অনেক পাঠাগারও তৈরি করেছেন। মিরসরাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ফোরাম নিয়ে লিখেছেন প্রতিষ্ঠাতা শারফুদ্দিন কাশ্মীর
শুরুটি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, এসএসসি পাসের পর। আমরা থাকি চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ সত্তরুয়া গ্রামে। সে বছর আমার এই গ্রামের অনেক বছরের পুরনো ‘উদয়ন’ ক্লাবে পা পড়ল। মানুষের জন্য কাজ করার খুব আগ্রহ দেখে সিনিয়ররা নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সর্বোচ্চ ভোটে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হলাম। সরাসরি ভোটে এভাবে নির্বাচিত হয়ে নিজেও অবাক! অনেক বছরে অনেকগুলো পদ পেরিয়ে এখনো উপদেষ্টা হিসেবে উদয়নে জড়িয়ে আছি। তবে এই ক্লাবই আমার একমাত্র কর্মক্ষেত্র নয়। আমরা যে কোনো প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। ২০১২ সালের তীব্র শীতে করেরহাট ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকা সাইবেনীখিল আদিবাসী পাড়ায় আমরা কম্বল দিয়েছি। তখনই একটি স্বপ্ন আমাদের জড়িয়ে ধরল। পুরো পাড়াটিতে মোট ৮৪টি আদিবাসী পরিবারের বসবাস। তারাও ভোটার, মানুষও বটে; কিন্তু অসহায়। ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মানুষরা তাদের কাছে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চেয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু পরে সব ভুলে যায়। এসব এলাকায় কাজ করার সুবাদে আমাদের জানা। তবে সেবার গিয়েই নতুন পৃথিবী চেনা হলো। তারা ত্রিপুরা থেকে আসা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমরা এই জীবনে কোনোদিন এক টুকরো শীতের কাপড় পাইনি; ফলে আমাদের উদ্যোগে তারা খুব খুশি। মিরসরাইয়ের অন্যতম সমাজকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জামসেদ আলম, এলাকার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী সাঈদ মাহমুদসহ আরও অনেককে নিয়ে আমরা বিশাল এই কর্মযজ্ঞ করলাম। প্রতিটি পরিবারের বয়স্ক বুড়ো মানুষরা কম্বল পেয়ে খুব খুশি। তবে ফেরার সময় তাদের একটি দাবি আমাদের নতুন এক পৃথিবীতে নিয়ে গেল। তারা বললেন, আমাদের এই দুর্গম এলাকায় চলাফেরার কোনো পথ নেই। আমরা পাহাড় ডিঙিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারি। বর্ষাকালে পুরো এলাকা বানের পানিতে ডুবে যায়। বড়রা কাজের জন্য কষ্ট করে বাইরে যান। তবে শিশু-কিশোরদের বাড়ি থেকে বেরুনোর উপায় থাকে না। ফলে ওই সময়টায় তিন-চার কিলোমিটার দূরের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে যাওয়ার কোনো উপায় থাকে না। আদিবাসী পাড়ার বেশিরভাগ শিশুই করেরহাট-রামগড় সড়ক পেরিয়ে করেরহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। অনেকবার স্কুলে যেতে গিয়ে তারা হাত-পা ভেঙেছে, নানা দুর্ঘটনায়ও পড়েছে। কাঁদতে কাঁদতে এই কথাগুলো যখন মা, খালাদের মুখে শুনছি; তখন আর চোখের জল বাঁধ মানল না। ডা. জামসেদ আলম দাঁড়িয়ে বলে ফেললেন, ‘আপনাদের পাড়ায় আমরা স্কুল তৈরি করে দেব।’
২০১২ সালের সেই ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকেই আমরা কাজে নেমে পড়লাম। পাড়ার নেতা (তারা তাকে রেয়াজা বলেন) রূপাইধন ত্রিপুরা নিজেই জমি দান করলেন। ফলে তার নামেই স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত হলোÑ ‘সাইবেনীখিল রূপাইধন ত্রিপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সবাই মিলে খেটেখুটে স্কুল বানিয়ে ফেললাম। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ৮৪টি ছাত্রছাত্রী নিয়ে স্কুল চালু হলো। এখন সেখানে ছাত্রছাত্রীরা ফাইভ পর্যন্ত পড়ছে। গত দুই বছর পিএসসিতে এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা শতভাগ পাস করেছে। ফলে পুরো এলাকায় স্কুলটির অনেক সুনাম ছড়িয়েছে। পাস করা ছেলেমেয়েরা অন্য স্কুলে ভালোভাবে লেখাপড়া করছে। এখন আদিবাসী পাড়াটি পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই পাড়ায় পা রাখলেই ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার উচ্চস্বর কানে আসে, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদও পাড়ার মানুষের যে কোনো সমস্যার সমাধানে আগ্রহী হয়েছে। নিজেদের স্কুলটি যেন ভালোভাবে চলে সেজন্য নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের একটি কমিটি আছে। তবে শিক্ষার আলো পৌঁছালেও সাইবেনীখিল আদিবাসী পাড়ায় এখনো বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। বন বিভাগ ও পল্লীবিদ্যুৎ কর্তাদের ফাইল নিয়ে ঝগড়ার কারণে সাত-আট মাস আগে সব কাজ শেষ হলেও আলো আসছে না। স্কুল তৈরির এই কাজ আমাদের এত উদ্দীপ্ত করেছিল যে তখন থেকেই আমরা ‘মিরসরাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ফোরাম’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি গড়ে তুলেছি। সভাপতি অধ্যাপক ডা. জামসেদ আলম ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি দায়িত্ব পেলাম। আমরা ফোরাম থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আরেকটি স্কুল তৈরি করেছি। সেটি আছে মিরসরাই সদরের পাহাড়ি এলাকায়। নাম ‘মধ্যম তালবাড়িয়া খোকন ত্রিপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়’। সেখানেও ছেলেমেয়েরা বর্ষায় বাইরে বেরুতে পারত না বলে আগে স্কুলে তখন যেতে পারত না। পরে জমিদাতার নামে স্কুল হলো। এখন তাতে শিশু ও প্রথম শ্রেণি আছে। এই দুই ক্লাসেই ১১৫টি শিশু পড়ালেখা করছে। সাইবেনীখিল রূপাইধন ত্রিপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ওরাও ওপরের ক্লাসে উঠে শ্রেণিগুলো চালু করবে। আমরা এই মাসের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্কুলে আরও একটি নতুন ঘর তৈরি করে দেব। এই কাজ করতে করতে আরও একটি বিরাট সমস্যার সমাধান আমাদের করতে হয়েছে। এই মধ্যম তালবাড়িয়ার আদিবাসীরা বছরের পর বছর ধরে প্রচ- খাবার পানির অভাবে ভুগছেন। সরকারি কর্মকর্তা ও নেতাদের কাছে অনেক বলেছেন। কোনো কাজ হয়নি। ফলে আমরা সমস্যাটির কথা জেনেই কাজে নামলাম। আমরা ফোরাম থেকে এক লাখ টাকা সাহায্য তহবিল জোগাড় করে সে পাড়াতে মোট ১৩টি গভীর কুয়া নির্মাণ করেছি। ২৩ ফেব্রুয়ারি কুয়াগুলোও উদ্বোধন করা হবে। এরপর আর পানি ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদার কষ্ট থাকবে না তাদের।
আমাদের ফোরাম পাঠাগারও তৈরি করে। নানা কাজে শুরু থেকেই আমাদের স্কুলে যেতে হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, তারা বাইরের বইগুলো পড়ে আনন্দ পেতে চায়। কিন্তু এলাকার বেশিরভাগ স্কুলেই কোনো পাঠাগার নেই। ফলে মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ‘মিরসরাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ফোরাম’ পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিল। ঢাকার জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ডা. রাজিয়া রহমান জলি তার প্রকাশনীর বইগুলো বিনা পয়সায় দিচ্ছেন, অন্য প্রকাশনী থেকে কম খরচে বই জোগাড় করে দিচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমরা নানাজনের কাছ থেকে বই জোগাড় করছি। এসব বই দিয়েই আমরা আটটি স্কুলে পাঠাগার তৈরি করে দিয়েছি। স্কুলগুলো হলো ‘ওছমানপুর উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘জাফরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘নাহেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘ছৈয়দুল হক উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘সুফিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়’, ‘চরশরত উচ্চ বিদ্যালয়’, ‘করেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়’ ও ‘বামনসুন্দর ফকির আহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়’। এখন আট স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা নানা স্বাদের বই পড়তে পারছে, তারা এখন থেকে পরীক্ষায়ও আরও ভালো ফলাফল করবে বলে সবাই আশা করছি। এলাকার মানুষের পড়ার ক্ষুধা মেটাতে আমরা ‘ড. শামসুল আলম সাঈদ স্মৃতি পাঠাগার’ ও মিরসরাই সদরে ‘গণপাঠাগার’ গড়ে দিয়েছি। তবে পাঠাগারগুলো তৈরি করে দিয়েই আমরা কাজ শেষ করিনি। মোবাইলে নিয়মিত সেগুলোর খোঁজ রাখি, পরামর্শ দিই, সমস্যার সমাধান করি। নিজেরাও সেগুলোতে গিয়ে আরও উন্নতির ব্যবস্থা করি। স্কুলের পাঠাগারগুলো নিয়ে আমাদের অনেক আশা। কারণ ছাত্রছাত্রীরা পড়ালেখায় আরও ভালো করে পুরো দেশের আরও ভালো করবে। এবার গণপাঠাগারের কথা বলি। এখানে হাজারখানেক বই আছে। দুর্লভ কিছু পুঁথি, পা-ুলিপিও আছে। পুঁথিগুলো নিয়ে ফোরাম পুঁথিপাঠের আসর বসিয়েছে। গণপাঠাগারের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা, গণ ও রণসংগীত, উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গণপাঠাগার শত বছরের দুর্গাপুর এনসি উচ্চ বিদ্যালয়, আবুরহাট মাদ্রাসা, মিঠাছড়া মাদ্রাসা ও আবুতোরাব মাদ্রাসার ভূমিকা ও কার্যক্রম এলাকাবাসীদের জানানোর জন্য, তাদের এই বিষয়ে আরও উদ্যোগী করতে চারটি আলোচনা সভা করেছে। এখন আমরা এলাকার যেসব বিদ্যালয়ে পাঠাগার আছে, সেগুলোতে বই পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা চাই পাঠাগারগুলোর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের হাতে আনন্দের এই উপকরণগুলো পৌঁছে যাক এবং তারা সেগুলো পড়ে ফেরত দিয়ে অন্যদের পড়ার ব্যবস্থা করে দিক। সেজন্য পাঠাগারগুলোতে ‘কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা চলছে। পড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাঠাগারগুলোতে পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থাও আমরা করছি। শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি অন্যান্য মেধা বিকাশের জন্য বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতাসহ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলো সচল ও নিয়মিত করার চেষ্টা করছি। তাছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যÑ নখ ছোট রাখা, নিয়মিত দাঁত ব্রাশ, জামা-কাপড় পরিষ্কার রাখা, বিদ্যালয় ও বাড়ি পরিষ্কার রাখার জন্য তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। সে জন্য শিক্ষকদের সাহায্য করছি। বাল্যবিবাহ, ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ করছি।
মেয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্ন টয়লেটের জন্য এরপর আমরা কাজ করব। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও আমাদের এই সামাজিক সংস্থার সাহায্য পায়। মিরসরাই সদরের সরকারি এসএম মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমরা শ্রেণিকক্ষগুলোর পার্টিশন করে দিয়েছি। সুফিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চরশরত উচ্চ বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা করেছি। চরশরত কাছেমুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা কিতাবের অভাবে পড়তে পারছিল না। ছয়শ শিক্ষার্থীর জন্য ৫০ হাজার টাকার কিতাব সরবরাহ করেছি। চরশরত এলাকার এক মসজিদের অবকাঠামো উন্নয়নেও সহযোগিতা করেছি। ফোরাম এখন ট্রমা সেন্টার গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৩৭ কিলোমিটার গিয়েছে আমাদের মিরসরাই দিয়ে। আবার ঢাকা-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার পড়েছে আমাদের অংশে। এসব জায়গায় প্রায়ই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। সময় মতো চিকিৎসার অভাবে অনেক বাস ও অন্য পরিবহনের যাত্রীরা মারা যান, অনেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। এমন অনেক ঘটনার আমরা সাক্ষী। কুমিল্লার ট্রমা সেন্টারটি এখন বন্ধ। ফেনীর ট্রমা সেন্টারটিও কার্যকর নয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান। কিন্তু সেখান থেকে আরও ভালো চিকিৎসার জন্য রোগীদের অন্য কোথাও স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেই। রোগ বাড়তে পারে বলে গুরুতর অসুস্থ এসব রোগীর স্বজনরাও তাদের অন্য কোনো হাসপাতালে নিতে চান না। তাই একটি ট্রমা সেন্টার মানুষকে বাঁচানো ও ভালো করে দেওয়ার জন্য খুব প্রয়োজন। সে কাজ চলছে।