না বলি, তবু বলি

হাসান আজিজুল হক, রিজিয়া রহমান, যতীন সরকার, হায়াৎ মামুদ, আবুল হাসনাত ও ইমদাদুল হক মিলনের প্রিয় বই কোনটি? কেন এ বই প্রিয়? জানিয়েছেন উম্মে কুলসুম রাহি

কোনো একজন আলাদা লেখকের কথা বলতে নারাজ হাসান আজিজুল হক। বাংলা ভাষার এই অন্যতম সেরা জীবিত গল্পকার প্রিয় লেখকের আলাপে বললেন, রবীন্দ্রনাথ, তারাশংকর, মানিক, শরৎ তার ভীষণ প্রিয়। ভালো লাগে ইংরেজির চার্লস ডিকেন্স আর আর্নেস্ট হেমিংওয়ের রচনা। বারবার পড়া? “কবিগুরুর ‘গল্পগুচ্ছ’, প্রবন্ধের বইগুলো।” প্রিয় উপন্যাস? “আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’।” এই আলাপ করে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপকটি জানালেন, ‘আমার এই প্রিয় লেখকদের সবার রচনার সাহিত্য মূল্য খুব বেশি। সেটি পরিমাপের যোগ্য আমি নই। লেখক হিসেবে আমার মতামত হলো, কোনো লেখককেই অন্য লেখকের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। সম্ভবও নয়। কারণ সাহিত্য হলো এমন একটি দাঁড়িপাল্লা, সেখানে কোনো লেখকেরই লেখার মূল্য ওজন করার মতো কোনো বাটখারা নেই।’ তবে আফসোসে ভুগলেন পশ্চিম বাংলার ‘আনন্দ’ পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশি সাহিত্যিক ‘এই সময়ের সাহিত্য ততটা উন্নত হয় না। ফলে সাহিত্যের প্রতি, শিল্পের প্রতি এই আমলের তরুণদের আগ্রহ দেখা যায় না। তারা সাহিত্যচর্চা ও গভীর মনোযোগ দিয়ে পাঠ কোনোটিই করে না।’ তাহলে তারা কিসে ব্যস্ত? হাসান স্যার বললেন, ‘তারা প্রযুক্তি নির্ভর জীবনের দিকে ঝুঁকছে, তাৎক্ষণিক আনন্দও পাচ্ছে। কিন্তু সাহিত্য না করায়, না পড়ায়, বইয়ের সঙ্গে না থাকায় তাদের সত্যিকারের বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ ঘটছে না। সেটির ছাপ সমাজের সর্বক্ষেত্রেই পড়ছে। যদিও তাদের তথ্য জানার পরিধি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি, জানার সুযোগও এখন অনেক বেশি। তবে ইনফরমেশনের এই ভান্ডারকে মানুষের মানসিক বিকাশেও কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য ভালো পরিবেশের ব্যবস্থা করতে হবে। সেটির জন্য সাহিত্য চর্চারও খুব প্রয়োজন, দেশের সর্বক্ষেত্রের উন্নতি সবার আগে জরুরি। আমাদের দেশের তরুণরা সবদিকে উন্নত দেশগুলোর চেয়ে এই কারণে পিছিয়ে পড়ছে। সাহিত্যহীন, মানহীন সাহিত্যের বিকাশ, দেশের অচলাবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে।’ তার সঙ্গে আলাপের পর কথা হলো রিজিয়া রহমানের সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে ‘অগ্নিস্বাক্ষরা’র মাধ্যমে বাংলা ভাষায় লেখার জগতে তার প্রবেশ। এবারের একুশে পদকজয়ী এই বিখ্যাত লেখক ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। প্রিয় বইয়ের কথা বলতে গিয়েই তিনি জানালেন, “কঠিন প্রশ্ন এজন্য যে আরে অনেক বই ইচ্ছে থাকলেও পড়তে পারিনি। যেগুলো পড়েছি, সেগুলোর মধ্যে প্রিয় বা পছন্দের বই বলার ক্ষমতা আমার নেই। অনেক বই-ই ভালো লেগেছে। খুব ছোটবেলায় পড়া বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ এখনো বারবার মনে দাগ কাটে। এখনো সেই বহুকাল আগের বইটির গল্প ভুলতে পারিনি।”

জনপ্রিয় ইমদাদুল হক মিলনও এবার একুশে পুরস্কার পেয়েছেন ভাষা ও সাহিত্যে। নিজে জনপ্রিয় লেখক স্বীকার করে বললেন, “আমার অনেক লেখা আছে। পাঠকপ্রিয় হয়েছে অনেকগুলোই। তবে ‘নূরজাহান’ আমার নিজের খুব পছন্দের লেখা।” প্রিয় বই? উত্তর দিতে এতটুকু দেরি হলো না কালের কণ্ঠ সম্পাদকের “তারাশংকরের ‘কবি’। জীবনে পড়া হাজারো বইয়ের মধ্যে এটি বহুবার পড়তে বাধ্য হয়েছি। প্রথম হাতে এসেছিল ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র থাকা অবস্থায়, তখনই পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। মানুষের জীবনের অনেকগুলো স্তর আছে। নিতাইয়ের জীবনে অত্যন্ত ক্ষমতাবান তারাশংকর সেটি প্রবলভাবে তুলে ধরেছেন। এই বইটি আমাকে বারবার লেখার জগৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। নারী ও পুরুষের জীবনে প্রেমের প্রভাব কী সেটিও এই উপন্যাস আমাদের শিখিয়েছে” বললেন অনেক জনপ্রিয় প্রেমের উপন্যাসের সার্থক লেখক। ‘একেবারেই অক্ষর-জ্ঞানহীন ছেলে কীভাবে লেখক হয়ে উঠলো তাও বলেছেন তারাশংকর’, বললেন তিনি। তবে ইমদাদুল হক মিলন বলতে ভুললেন না, “কোনো একটি মাত্র বই কোনো মানুষের জীবনে সরাসরি কোনো প্রভাব রাখতে পারে না। অনেক বই মিলে তার বোধ গড়ে দেয়। আমার মতো লেখার ভুবনে সৃজনশীলের জীবনে কোনো বইয়ের চরিত্র বা সংলাপ দাগ কেটে যায়। সেটিই চিন্তায় প্রভাব ফেলে। ‘কবি’ তাই করেছে।”

লেখকদের লেখা পড়ে, তাদের বিকাশ ঘটিয়ে জীবন কাটিয়েছেন আবুল হাসনাত। এই প্রান্ত বয়সে তিনি ‘কালি ও কলম’র সম্পাদক। তার জীবনে মোড় ঘুরিয়েছে মানিকের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। অনেক, অনেক বই আছে তার ভান্ডারে। তবে এটি একেবারেই আলাদা। প্রথম পড়া সেই কিশোরকালে, ১৯৬৫ সালে। পড়েই চমকে গিয়েছেন বলে আজও সালটি ভোলেননি। জীবনের কত অনুষঙ্গ, আলো-অন্ধকার এই রচনার মূল ভাষ্য। জীবনের আলো ও অন্ধকারকে একেবারে তীক্ষèভাবে তুলে ধরতে পারাতেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার দক্ষতা ও মেধার জোর রেখেছেন বলে আবুল হাসনাত মনে করেন। ফলে এই ভিন্ন উপন্যাসটি বাংলা ভাষায় বেঁচে আছে। ‘অনন্য এই উপন্যাসটি আমার জীবনেও অনেক প্রভাব ফেলেছে’ স্বীকার করে আবুল হাসনাত জানালেন, “নায়িকা ‘শশী’ই এর প্রধান চরিত্র। সেও আমার জীবনের পথচলায় সঙ্গী হয়েছে।”

মার্ক্সবাদী ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মী যতীন সরকার চিন্তাশীল লেখায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান। ‘অনেক বই পড়তে হয়েছে নিজেকে গড়তে, বাঁচতে ও বাঁচাতে’ বললেন, বিখ্যাত এই অধ্যাপক। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা যেমন ভালো লেগেছে, রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসও এই মনে ছাপ রেখেছে চিরকালের জন্য’ বলে কথা পাড়লেন তিনি-“আমার তো ‘গোরা’ খুব ভালো লাগে। অনেক উপন্যাস পড়তে হলেও বিশ শতকের প্রথম দিকের যে সম্প্রদায়গত প্রতিহিংসা প্রবলভাবে প্রাণনাশ ও সমাজ-রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে শুরু করল রবিঠাকুর এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ‘গোরা’ লিখলেন। বিশ্বায়নের বীজ বুনলেন। গোরা আয়ারল্যান্ডের এক দম্পতির সন্তান। অন্য গল্পের মতো তার প্লট নয়, একেবারেই আলাদা। মা-বাবার মৃত্যুর পর সে বাঙালি দম্পতির দত্তক সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠে। তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তাকে হিন্দু ও বাঙালি বানিয়ে ফেলে। প্রবল সাম্প্রদায়িক করে তোলে। সে ধর্মের অন্যায়কে কামিয়াব করতে দিতে রাজি হয়ে যায়। তবে আসল পরিচয় জানার পর তার মধ্যে একেবারেই বদল ঘটে। এরপর ‘গোরা’র কাহিনী।” ছাত্র জীবনে একেবারেই গরিবি জীবনে প্রথম হাতে এসেছিল ‘গোরা’। এরপর থেকে এখনো প্রায়ই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট হাসান আজিজুল হক পার্টি ও উদীচীর সাবেক সভাপতিকে নিজের ক্ষুদ্রতা ও সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে ‘গোরা’ পড়তে হয়। এখনো ‘গোরা’ তাকে অসাম্প্রদায়িক করে তোলে। হায়াৎ মামুদও অসাম্প্রদায়িক ভাবনায় উদ্বুদ্ধ জীবনবোধের মানুষ। অনেক বই পড়ে, বইয়ের সঙ্গে থেকে, ভেবে, ভালোবেসে এখন আর কোনো একটিকে আলাদা করতে পারেন না। তবে জীবনে বুদ্ধদেব বসুর অবদানকে কোনোদিন অস্বীকার করেননি, বরং স্বীকার করে বড় হয়েছেন মনে মনে। স্কুলবেলা থেকে বসু তার সঙ্গে আছেন, এখন তো অনেক হলো বয়স। ‘আসলে লেখার ধরন আর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং আধুনিক উপস্থাপনই বসুর সঙ্গে আমাকে থাকতে বাধ্য করেছে। তিথিডোর তো ভালোবাসার জালে আবিষ্ট করেছে। প্রথম হাতে এসেছিল ইন্টারমিডিয়েটে। লেখক হিসেবে তার রচনা লেখার ভঙ্গিতে আমি মুগ্ধ, শিখেছিও অনেক। বাংলা সাহিত্যের গদ্য কতটা ভালো হতে পারে সেটি বসু দেখিয়ে গিয়েছেন’, জানালেন সার্থক অনুবাদক।