দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা হবে এবং তাদের লোভের জিহ্বা কেটে ফেলা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের কৌশলপত্র-২০১৯’-এর ওপর মতামত ও পরামর্শ নিতে দেশের ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এই হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা বলছেন দুদকের মামলায় শাস্তি হয় না, তথ্যটি সঠিক নয় এবারও ৬৩ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে। আমরা হয়তো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দুর্নীতি কমাতে পারিনি। এই ৬৩ শতাংশ সাজা কিন্তু এমনিতে হয়নি। এটি আমাদের চেষ্টার ফসল।
এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, একসময় বলা হতো অর্থই অনর্থের মূল, কিন্তু সব সময় অনর্থের মূল নয়। অনেক সময় অর্থই, অর্থের মূল। অর্থ মানেই ক্ষমতা। তাই মানুষ বৈধ অবৈধ যেকোনো উপায়ে অর্থের পেছনে ছুটে। অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের দুর্নীতিবাজরা লজ্জা পায় না, তাই দুর্নীতিবাজদের লজ্জা ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন মানসম্মত ও মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষা। দুদককে ভয় পায় না এমন লোক হয়তো সমাজে নেই। তবে ভয় দিয়ে সবকিছু জয় করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সব দুর্নীতিই দুদকের ম্যান্ডেটভুক্ত নয়। দণ্ডবিধির কতিপয় ধারা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন দুদকের তফসিলভুক্ত। দুর্নীতির উৎস বন্ধেও সরকারের নিকট সুপারিশ করার আইনি দায়িত্ব দুদকের রয়েছে। কমিশন স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে জনহয়রানি রোধে বিভিন্ন সুপারিশমালা সরকারের কাছে প্রেরণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়, বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলো অনুধাবন করেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিন বা এক বছরেই দুর্নীতি থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় দুর্নীতি অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।
মতবিনিময় সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্রী তামান্না রিফাত আরা বলেন, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন কোনো পদ্ধতি নেই, যার সাহায্যে দুর্নীতি করার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. সাইদুর রহমান দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার করা না গেলে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মিরা রহমান বলেন, ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল দুর্নীতি করছে এবং নিরাপদ খাদ্যের জন্য এরাই হুমকি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. ফারুক হোসেন বলেন, কৃষি ভর্তুকির অর্থ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিকট পোঁছানোর আগেই বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি সংঘটিত হয়। এটা রোধ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামস আসিফ চৌধুরী বলেন, দুদক স্কুল পর্যায়ে সততা সংঘ গঠন করলেও, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের কোনো সংগঠন নেই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এথিকস ক্লাব গঠনের আহ্বান জানান।
দুদক কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম বলেন, দুর্নীতি দু’টি পর্যায়ে বেশি হয়। একটি প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপরটি ব্যক্তি পর্যায়ে। প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দুর্নীতি অবশ্যই কমে আসবে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে কিন্তু রোগীদের দেওয়া হচ্ছে না, শুধুমাত্র মনিটরিংয়ের অভাবেই রোগীর কাছে ওষুধ পৌঁছাচ্ছে না।
মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দুদক মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) সারোয়ার মাহমুদ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দুদক সচিব মোহাম্মদ দিলোয়ার বখত, মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী, মহাপরিচালক (তদন্ত) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।