রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনারের উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী। তার বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন জাওয়াদুল আলম, ছবি তুলেছেন নূর
আপনার জন্ম? মা-বাবা?
আমি ১৯৩১ সালের ২৮ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্মেছি। বাবা মরহুম আফতাব উদ্দিন আহমেদ
শিক্ষার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার কালিয়াচক থানায় চাকরি করেছেন। তখন সেখানে কোনো হাইস্কুল ছিল না। তিনি নিজ উদ্যোগে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও স্কুল তৈরি করেছেন। মা গুলআরজান নেছা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। মা-বাবা দুজনের কাছেই আমি নানা কাজে ব্যাপক উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছি। পড়ালেখার পাশাপাশি রাজনীতিতে খুব ব্যস্ত থাকতাম। মাস্টার্স পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন আরও বেশি সাংগঠনিক কাজে বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে হয়েছে। এ কারণে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইনে মাস্টার্সে ভর্তি হলেও শ্রেণি উপস্থিতির হার কম ছিল। ফলে আমাকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়নি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। এই মা-বাবার সহযোগিতা ছাড়া কোনো দিনই পড়ালেখা ও রাজনীতি দুটো একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। আমি ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৫২ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে ডিগ্রি এবং ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি।
রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে হলো?
মূলত দুঃখী, নির্যাতিত মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে এবং অশিক্ষা ও কুশিক্ষার প্রভাব থেকে তাদের মুক্ত করতেও নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষ যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় আমার মধ্যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (এখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন এ দেশে প্রথম অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পীড়াদায়ক, আমার কাছে। তাই সাম্প্রদায়িক বা এই দৃষ্টিভঙ্গির কোনো দলের সঙ্গে কখনোই যুক্ত হতে চাইনি। স্বাভাবিকভাবেই তখন যেহেতু অসাম্প্রদায়িক ছাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছাত্র ইউনিয়ন যাত্রা শুরু করল, তাই এ দলের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলো। ছাত্র ইউনিয়নে কাজ করতে করতে ছাত্র সংগঠনটির নেতাদের আমার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হলো। তখন যারা ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন, তাদের কীভাবে যথাযথ কাজে সম্পৃক্ত করা যায়, সে কাজটি আমি সব সময় করেছি। ইউনিয়নের রাজনীতি করার সময় বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতার সংস্পর্শে এসেছিলেন। তাদের কথা মনে পড়ে?
শুধু কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নন, বিভিন্ন রাজনৈতিক চেতনার ব্যক্তিত্বদের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ছিল। সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, ছাত্রদের কল্যাণে কীভাবে আমরা যথার্থভাবে কাজ করতে পারি, সেসব জানার জন্যই তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হতো। তবে সে সময়ের বিভিন্ন দলের নেতাদের নাম বলে তাদের মতাদর্শের সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আমাকে যিনি পড়িয়েছেন, সেই স্কুলের শিক্ষক ‘রমেন’ বাবু কমিউনিস্ট নেতা ছিলেন। তার সঙ্গেও আমার সম্পর্ক ছিল। তার কথা বলতে চাই, তিনি আমার মতাদর্শ গড়ে দিয়েছেন। তবে আমাদের সম্পর্ক রাজনীতি ছাপিয়ে শ্রদ্ধাবোধ ও ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কই মুখ্য ছিল।
ভাষা আন্দোলনে যখন জড়ালেন, তখন তো আপনার বয়স ২১। জড়ালেন কীভাবে?
১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব তার বক্তৃতায় যখন বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষাÑ কথাটি বলার ফলে এ দেশের যুবক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ হলেন। ভাষাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের ওপর যে বর্বর ও নারকীয় ব্যবহার করল এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলÑ তা আমরা মেনে নিতে পারিনি। ফলে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করলাম। মাতৃভাষার
প্রশ্নে আমরা ১৯৪৮ সাল থেকে রাজশাহী থেকে সংগ্রামের দিকে এগোতে লাগলাম। ৫২ সালে ঢাকা থেকে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকল। আমাদের আন্দোলন ৫২ সালে ব্যাপকতা লাভ করল। প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষাকে বাঁচানোর জন্য আমাদের পরিচালিত সংগ্রাম গণমানুষের ভেতরে দারুণ জাগরণ তৈরি করল। রাজশাহীতে আমাদের ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটানোর ক্ষেত্রে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। এই কলেজের আটটি হোস্টেলে বিভিন্ন অঞ্চলের ৬ থেকে ৭০০ ছাত্র থাকতেন। মেয়েদের আলাদা হোস্টেল তো ছিলই। আমরা সবাই আন্দোলনে নেমে গেলাম। নানা প্রান্তের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ালেখা করত বলে আমাদের এই সহপাঠীদের সংগঠিত করে তাদের নিজ নিজ এলাকায় ভাষা আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে শুরু করলাম। ঢাকায় মিছিলে গুলি চালানোর পর আর আমাদের মধ্যে সংগ্রাম সীমাবদ্ধ থাকল না, পূর্ব বাংলার সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। আমরা সালাম, বরকতের স্মরণে রাজশাহী কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার তৈরি করলাম। তবে পরদিনই পুলিশ শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল। আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়লাম, আন্দোলন আরও তীব্র হলো। আমিসহ ১৪-১৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। আমাদের ভাষার লড়াই জেলেও চলতে থাকল।
কীভাবে রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল?
এই মিনারটি মূলত কলেজ হোস্টেল গেটে নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৫২ সালে ঢাকায় ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলা ও গুলি চালানোর খবর পেয়ে আমরা মুহূর্তেই এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করেছি। আশপাশের মিস্ত্রি, হোস্টেল কর্মচারীরা শহীদ মিনার তৈরিতে সাহায্য করেছেন। হোস্টেলের পড়ে থাকা ইট, বালু সিমেন্ট দিয়ে এক রাতেই আমরা ছাত্ররা দেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করলাম।
পরে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সরে গেছেন কেন?
আমি কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি করতাম না। কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে আমার চেতনার যোগাযোগ ছিল। মূলত ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গেই আমি জড়িত ছিলাম। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার সময় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) আত্মপ্রকাশ ঘটল। তারা আমার মতো মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন। তাই তখন ন্যাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। রাজনৈতিক কাজের সূত্রেই আমার ন্যাপের সঙ্গে পরিচয়। আগে ছাত্র ইউনিয়নে কাজ করতাম, যখন আর ছাত্র হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নে থাকার সুযোগ থাকল না, স্বাভাবিকভাবেই ন্যাপে জড়িয়ে গেলাম। যুবক হিসেবে ন্যাপে কাজ করলাম। আমরা একটি বাম-প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে গণমানুষের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কাজ শুরু করলাম। তখনকার সব ঘটনা এ বয়সে এসে মনে করতে না পারলেও কিছু কিছু ঘটনা তো বলতেই পারি। আমরা ন্যাপের ওই সময়ের কর্মীরা রাজনীতিতে খুব তৎপর ছিলাম। বিভিন্ন জেলায় ন্যাপের আদর্শ ছড়িয়ে দিয়েছি। সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে তাদের আশা, আকাক্সক্ষা, চাওয়া, পাওয়ার কথা জানার চেষ্টা করেছি। তাদের দেখানো পথেই, তাদের সমস্যার সমাধানের জন্যই আমরা প্রথম থেকে কাজ করেছি।
দেশের প্রত্যন্ত জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা?
আমাদের নানা সংগ্রাম ও পাকিস্তানিদের বৈষম্যের ফলে মানুষের মধ্যে তখন ব্যাপকভাবে মুক্তির চেতনা কাজ করছিল। ছাত্র-শিক্ষক-নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে তখন যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিকে পুঁজি করে আমাদেরও আন্দোলন শুরুর সুযোগ এলো। সেই ধারা অনুসারে আমরা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমাদের প্রথম কাজটি ছিল ছাত্র ও যুবসমাজকে সংগঠিত করা। আমরা তাদের মুক্তির চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সংগঠন গড়ে তুললাম। সেটির মাধ্যমে ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষকে সংগঠিত করতে পেরেছিলাম। তখন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য যা যা করা প্রয়োজন ছিল ঠিক সেসব কাজই করেছি।
আইনজীবী হিসেবে খ্যাতিমান। সেই জীবন?
আমি ১৯৫৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। পরের বছর থেকে আইন পেশা শুরু করেছি। বহু মামলায় কাজ করেছি। রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সব মামলাই আছে। অসংখ্য মামলায় কাজ করার ফলে আলাদা করে কোনো একটি বা কয়েকটির কথা আর মনে করতে পারি না। তবে ১৯৭৬ সালে নেহার বানু হত্যা মামলায় লড়েছিলাম। মামলাটি তখন সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা, খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন আদালতে মামলা লড়েছি, যথেষ্ট সুনামও লাভ করেছি। আইন পেশায় ভালো কাজের সুবাদে রাজশাহী বারের সভাপতি ছিলাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কীভাবে জড়ালেন?
সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আদালত স্থাপনের পর সরকারের পক্ষ থেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। সরকারই এ মামলায় প্রয়োজন মনে করে আমাকে প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানাল। তাই আমার এই ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সরকার আমাকে মামলার প্রয়োজনে নিয়েছিল। আমি সেই নিরিখে কাজ করেছি। এখনো কাজ করে চলেছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে আপনার কাজ, মামলা পরিচালনা ও বিচার প্রক্রিয়ায় অবদান?
এই ট্রাইব্যুনালের সবগুলো মামলার বিচারের জন্য যা যা প্রস্তুতি দরকার ছিল, সেগুলোর সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। কাজগুলো যেন যথার্থভাবে সম্পন্ন হয়, সেসবও দেখভালের দায়িত্ব আমার ছিল। এই মামলাগুলোর যত ধরনের তদন্ত হয়েছে, সেগুলো যথার্থভাবে অনুধাবন ও তদন্তগুলোকে যথার্থ লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার পর চার্জশিটগুলো আমার কাছে আসত। আমার অনুমোদন পেলেই সেগুলো আদালতে উপস্থাপনের জন্য গেছে।
খেলোয়াড় হিসেবে একসময় বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন।
স্কুলজীবন থেকে ফুটবল খেলতে ভালোবাসতাম। কলেজে ওঠার পর আরও বড় পরিসরে খেলেছি। পড়ালেখা ও রাজনীতির পাশাপাশি যুবক বয়সেও খেলেছি। অত্যন্ত প্রাণবন্ত ফুটবলার হিসেবে আমার খ্যাতি ছিল। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাঠেও ফুটবল খেলতে গেছি। দেশ-বিদেশে খেলতে গিয়েছি।
ব্যক্তিগত জীবনের গল্প?
১৯৫৯ সালে বিয়ে করেছি। স্ত্রী জাহানারা বেগম। আমার চার মেয়ে ও এক ছেলে। সময় পেলে এখন গান শুনি। দেশাত্মবোধক, মানবিক গান আমার অত্যন্ত প্রিয়। মেয়েরা মোবাইলে গান তুলে দেয়। সেসব গান শুনি। কলেজে পড়ার সময় হোস্টেলে আমার রুমে প্রায়ই গানের আসর বসত। কলেজে যারা গান করত, তারা আমার রুমে এসে গাইত। স্কুল, কলেজে নিয়মিত আবৃত্তি করেছি। আমার মেয়েদেরও আমি আবৃত্তি শিখিয়েছি। আমার অবসর বলে তেমন কিছু নেই। এখনো আইন পেশায় যুক্ত আছি। কাজের মধ্যে থাকতে ভালোবাসি, ফলে সব সময় কাজ করছি।
(১৬ ফেব্রুয়ারি, বেইলি রোড, ঢাকা)