দেখতে শিখেছি মানুষের ভেতরের অমানুষকে

লিখে তুমুল খ্যাতি পেয়েছেন হরিশংকর জলদাস। তার জীবনও উপন্যাসের মতো গতিময়, ভাঙা-গড়ায় ভরা। লেখার চরিত্র আশপাশের মানুষ। জীবনের গল্প বলে উপন্যাসেরই প্লট উপহার দিলেন ৫৫ বছরে লেখা শুরু করা সাহিত্যিক। আলাপ করেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন তাহসীনুল হক 

আপনার দাদা চন্দ্রমণি পাতরের কথা মনে পড়ে? তার জীবন? আপনার জীবনে তার প্রভাব?

চন্দ্রমণি পাতরকে স্মৃতিতে পেয়েছি ঠাকুরমা পরান্বেশ্বরীর মাধ্যমে। তাকে আমি দেখিনি। বাবার বয়স যখন আড়াই, তখন চন্দ্রমণি সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে মারা গেছেন। জলডুবি হয়েছে, তিনি ফিরে আসেননি, তখন ঠাকুরমার বয়স ১৭। আড়াই বছরের ছেলে আমার বাবা যুধিষ্টির জলদাসকে নিয়ে তার নতুন জীবন সংগ্রাম শুরু হলো। চন্দ্রমণিকে নিজের চোখে না দেখলেও বংশপরম্পরা, উত্তরাধিকারী সূত্রে তার প্রভাবটি আমার ওপরে আছেই। প্রত্যক্ষ প্রভাব আমার জীবনে তিনজন

মানুষের প্রথমত আমার ঠাকুরমা পরান্বেশ্বরী, দ্বিতীয়ত বাবা যুধিষ্টির, তৃতীয়ত মা শুকতারা। তবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কে আমার ওপর, যদি জিজ্ঞেস করেন, তাহলে অবশ্যই পরান্বেশ্বরী। তিনি লেখাপড়া জানতেন না, পাড়ায় পাড়ায় মাছ বিক্রি করে মাছ

বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে সংসার চালাতেন। আমার পড়ার খরচ চালাতেন। বাবাও সাহায্য করতেন, মাছ ধরতেন; কিন্তু সে সময় মাছ বিক্রি করে যা টাকা পাওয়া হতো, আমাদের পরিবারের লোকসংখ্যা ছিল ১১ জন, তাদের খাবার জোগাড় করার মতো টাকা বাবা আয় করতে পারতেন না।

পরন্বেশ্বরীকে এত ভালোবাসেন কেন?

ঠাকুরমা আমার স্মৃতিতে জড়িয়ে আছেন। বংশপরম্পরায় উত্তরাধিকার সূত্রে অবশ্যই তার রক্তকণিকা আমার শরীরের মধ্যে আছে। এই আমার স্মৃতির মধ্যে তিনি জৈবিকভাবে আছেন। যখন লিখতে বসি, এখনো যখন পারিবারিক, সামাজিক বা মানসিক সংকটে পড়ি; দাদির কাছ থেকে আমার বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ, উপকরণ সংগ্রহ করি। কারণ জীবনে যত নারী দেখেছি তাদের মধ্যে তিনি সেরা। এমন সংগ্রামশীল, সহিষ্ণু এবং কোনোকিছুকে পরোয়া না করে শুধুমাত্র পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের জীবনকে বিনির্মাণ করার জন্য জীবন উৎসর্গ করা

মানুষ আর দেখিনি। আমার লেখার মধ্যে প্রায়ই তিনি এসেছেন। ‘নোনা জলে ডুবসাঁতার’ বইটিতে এসেছেন। প্রথম উপন্যাস ‘জলপুত্র’, আলাওল পুরস্কার পেয়েছে, সেখানে ‘ভুবনেশ্বরী’ নামে কেন্দ্রীয় চরিত্র আছে। সেটি পরন্বেশ্বরীর চরিত্রের আদলেই নির্মাণ করেছি। আমার জীবনের একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা চরিত্র, প্রভাবক তিনি। আমাদের জাল, নৌকা ছিল না। ঠাকুরমা অন্যজনের কাছ থেকে মাছ কিনে পাড়ায় মহল্লায় ‘মাছ লইবা না মাছ?’, ‘তাজা লইট্যা মাছ?’ চাঁটগাইয়া ভাষায় বলে বলে বিক্রি করতেন। সেই লভ্যাংশ দিয়ে তিনি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, বড় করেছেন, মানুষ করার চেষ্টা চালিয়েছেন।

আপনাকে লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কে?

বাবা। ঠাকুরমা লেখাপড়া জানতেন না, মাও জানতেন না। বাবা কিছুদূর লেখাপড়া করেছিলেন। তার বাবাকে সমুদ্রে হারিয়ে, মাছ ধরতে ধরতে, কষ্ট সইতে সইতে সমুদ্রের প্রতি তার বিতৃষ্ণা জেগেছে। সবসময় সমুদ্রের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু নিজে সেই যুদ্ধে কখনো জয়ী হননি। তিনি সন্তানদের দিয়েও জীবনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত বোধহয় সার্থকতা অর্জন করেছেন। না হলে কেমন করে আমরা ভাইয়েরা সমুদ্র ছেড়ে স্থলভূমিতে বিচরণ করছি? আমাদের তো মাছ ধরার জন্য জলে থাকার কথা ছিল।

মায়ের কথা একটু বলুন

আমার মায়ের নাম শুকতারা জলদাসী। তিনি লেখাপড়া জানতেন না। ভাইবোনের ছোট ছিলেন। বাবার কাছে শুনেছি, সাড়ে নয় কি ১০ বছর বয়সে মাকে বিয়ে করে আনা হয়েছিল। সন্তানদের স্নেহ কীভাবে দিতে হয়, বাৎসল্য দিয়ে জড়িয়ে রাখতে হয়, তিনি জানতেন। ১১টি সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, আমরা আটজন জীবিত ছিলাম; মা নিজে না খেয়ে আমাদের খাইয়ে সকাল-সন্ধ্যা খাওয়ার অভিনয় করে যেতেন। আমরা স্বার্থবাদী সন্তানরা কখনো মা খেয়েছে কি না সেটি ভালো করে খোঁজ নিইনি। আমরা হয়তো তিন সের চাল লাগবে, বাবা জোগাড় করতে পেরেছেন, নয়তো দাদিমা দুই সের জোগাড় করতে পেরেছেন। আরেক সেরের ঘাটতি রয়ে গেল। সবাইকে দিয়ে মায়ের কাছে যে খাবারটি থাকার কথা; সেটি থাকত না। ফলে মা আমাদের কাছে খাওয়ার অভিনয় করতেন। আমরা সবাই খেয়ে বাইরে চলে আসতাম। মা একগ্লাস পানি খেয়ে, পান মুখে দিয়ে বাইরে এসে আমাদের সঙ্গে অভিনয় করতেন। জিজ্ঞেস করতাম, ‘মা ভাত খেয়েছ?’ ‘হ্যাঁ খেয়েছি।’ এরকম মিথ্যা বলতে বলতে একদিন তিনি আমার কাছে ধরা পড়েছেন, ‘মা তুমি বছরের পর বছর বিশেষ করে দিনের বেলায়, রাতের বেলায় নয়, এই না খেয়ে খাওয়ার অভিনয় কেন করে গেলে?’ মা বললেন, ‘বাবা, আমি যদি খেতাম বা খাই; নিজের খাবার যদি রেখে দিই; তাহলে তোরা তো কম পাবি। তোদের জন্ম দিয়েছি, তোদের তো বড়, পুষ্ট, সতেজ রাখবার দায়িত্বও আমার। সেজন্য এই মিথ্যাটুকু বলে গেছি। কিছু মনে করিস না বাবা।’ যখন সরকারি চাকরিতে ঢুকি, প্রথমে আমার বেতন ছিল ৭৫০ টাকা; ওই টাকা দিয়ে ভালোভাবে আমাদের পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে পারিনি। কারণ পরিবারের খরচ ছিল, দ্রব্যমূল্যও ছিল অনেক বেশি। সে সময় মায়ের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে পেরেছি কি না জানি না, তিনি ভালোভাবে খেয়েছেন কি না জানি না। তবে এখনো আমাকে ওই অতৃপ্তিটি বারবার খোঁচায়, রক্তাক্ত করে যে মা আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে, খাওয়ানোর জন্য বছরের পর বছর খাওয়ার অভিনয় করে গেছেন।

যুধিষ্টির জলদাস ছেলেমেয়েদের কীভাবে লালন-পালন করেছেন?

তিনি আমার বাবা। বাবা যেভাবে সন্তানদের লালন-পালন করেন, সেভাবে করেছেন। তবে তার মধ্যে অনেক গুণ ছিল। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলেন, কিন্তু পূর্ণ মনুষ্যত্বের গুণ তার ছিল। তার  অগুণ বা গুণ ছিল সত্য কথাটি স্পষ্ট করে বলা এবং স্বীকার করা। আমার পদবির কথা চিন্তা করেন, সে পদবি আমি ধরে রেখেছি এবং সেজন্য হয়তো মানুষ আমাকে ভালোবেসেছে। আমি সত্য কথা বলবার, সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলে জোর গলায় চিৎকার করে বলার যে সাহসটি, সেটি বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। বাবা কোনোভাবেই, কোনোমতেই, কোনো সংকটেও, কখনো সত্যকে মিথ্যা বা মিথ্যাকে সত্যি বলতেন না। বাবার মধ্যে সংসার পরিচালনার নেতৃত্বটি ছিল। মনুষ্যত্ব ছিল। পরিবারকে কম খাবার দিয়েও কীভাবে সংহত করে রাখা যায়, সন্তানদের কীভাবে পড়ালেখার দিকে অনুপ্রাণিত করা যায়, সেটি বাবার মধ্যে ছিল। তবে বাবার মধ্যে অগুণও ছিল। সেটি আমার মধ্যেও আছে, আমার থেকে বাহিত হয়ে পুত্রের মধ্যেও প্রবাহিত হয়েছে। সেটি হলো, বাবা ভীষণ ক্রোধপরায়ণ ছিলেন। অন্যরা সত্যকে তার সামনেই মিথ্যা হিসেবে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন, এককভাবে যুদ্ধ করে পারছেন না, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা দিতে পারতেন না বলেই তিনি ক্রোধান্বিত হতেন। নিজে যখন কিছু করতে পারতেন না, তখন ক্রোধকে প্রশমিত করতে নিজের হাতের বাহু কামড়াতেন। মাঝে মধ্যে ভাবি, মহাভারতের যে চরিত্রটির নামানুসারে তার নামটি হয়েছে, সেই যুধিষ্টির অত্যন্ত শান্ত, সমাহিত ও ধৈর্যশীল পুরুষ। আমার বাবার নাম আমার ঠাকুরদি কিংবা তার বাবা চন্দ্রমণি রেখে গেছেন। তারা হয়তো চেয়েছিলেন, ছেলে ক্রোধজিৎ হবে, ক্রোধকে জয় করবে। কিন্তু বোধহয় সংসারের অত্যাচারে, দরিদ্রতায়, অশিক্ষার ধাক্কায় তার মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে যেত। যখন আশপাশটিকে নিজের কব্জায় রাখতে পারতেন না; যখন পরিবেশটিকে অনুকূলে রাখতে পারতেন না, তখনই বোধহয় নিজের ওপর তার সবচেয়ে বেশি রাগ হতো। এই রাগটিকেই তিনি সেভাবে প্রকাশ করতেন। তবে সব মানুষের মধ্যে কিছু না কিছু দোষ থাকে, অগুণ থাকে। এগুলো ছাপিয়ে, মাড়িয়ে যদি বাবাকে  মূল্যায়ন করতে বলেন, যুথিষ্টির ছিলেন বলেই হয়তো আমি কিছু একটা লিখতে পেরেছি, লিখতে পারছি। তারই অনুপ্রেরণা ছিল। আমার লেখার মধ্যে, জীবনের মধ্যে মহাভারত, রামায়ণের প্রভাব ভীষণ। এ বাবাই যখন টু-থ্রিতে আস্তে আস্তে পড়া শুরু করলাম, আমাকে মহাভারত, রামায়ণ এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিজে নিজে যখন পড়তে শিখেছো, এখানে অনেক গল্প, কাহিনী আছে। এখান থেকে শিখে নাও।’ আজও আমি সেই মহাভারতকে অস্বীকার করছি না। একলব্য বলে মহাভারতের কাহিনীতে চরিত্র আছে। আমরা ‘শকুনী মামা’ বলি, সে তাই, পরম আত্মীয় কিন্তু ক্ষতিকর। সেই শকুনী, মহাভারতের চরিত্রকে নিয়ে ‘সেই আমি নই আমি’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছি। ‘মৎস্যগন্ধা’ নামের জেলেনিকে নিয়ে উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় লিখছি। এ চরিত্রটিও বাবার জীবন থেকে পাওয়া। বেঁচে থাকার সমস্ত অনুরাগ, প্রেরণা বাবার কাছ থেকে আমি পেয়েছি।

কৈবর্ত পাড়ার প্রথম হাইস্কুল পড়ুয়া হরিশংকর জলদাসের লেখাপড়া কীভাবে শুরু হলো?

আমার লেখাপড়া শুরু হয় উঠান স্কুলে। দেবেন্দ্রলাল দে নামে একজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি নিজেও বোধহয় থ্রি, ফোর পর্যন্ত পড়েছিলেন। যখন আমার সাত বছর বয়স বাবা আমাকে সেই হিন্দু পাড়ায় নিয়ে গিয়ে তার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার এই ছেলে লেখাপড়া কিছুই জানে না। তাকে একটু মানুষ করবার চেষ্টা করেন।’ বাবার চোখে নিশ্চয়ই আমি অমানুষই ছিলাম। মানে মানুষ ছিলাম না, মানবেতর ছিলাম। ওই দেবেন্দ্রলালের কাছে নিয়ে বাবা তাই বললেন গ্রামের মানুষ যা বলে মানে শিক্ষিত করাকে তারা মানুষ করা বলে। তার একটি উঠান স্কুল ছিল। ছালায় বসে পিঁড়িতে আমরা বই রেখে পড়তাম। সেখানে এক-দুই বছর পড়ে পরে পতেঙ্গা বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। ক্লাস ফাইভ পাস করার পরে পতেঙ্গা হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি এবং ১৯৭১ সালে মেট্রিক পাস করেছি। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়েছি। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজেই অনার্স পড়েছি। সেই সময়ে-১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের এমন চার-পাঁচটি কলেজে অনার্স পড়ে ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স পড়া যেত। এমএ করেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপরে ২০০৭ সালে পিএইচডি করেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ময়ুখ চৌধুরী স্যারের অধীনে ‘নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্তজনজীবন’ নামে।

জেলে পরিবার থেকে এসে লেখাপড়া করতে করতে আপনার কী শেখা হলো?

জীবনকে দেখা শেখা হলো। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, আমি মানুষকে দেখতে শিখেছি। মানুষকে জানতে শিখেছি। সবচেয়ে বেশি দেখতে শিখেছি মানুষের ভেতরের অন্য অমানুষকে। প্যান্ট-শার্ট পরা যে অমানুষগুলো আছে, তাদের দেখবার সুযোগ হয়েছে, যখন আমার বোঝার বোধ হয়েছে। দেখা ও অবলোকনের মধ্যে পার্থক্য আছে। দেখা মানে এমনি দেখা, অবলোকন মানে খুঁটিয়ে দেখা, একেবারে অনুবীক্ষণের চোখ দিয়ে দেখা। আমি যখন মানুষকে দেখতে শিখলাম, তখন দেখলাম সুসভ্য, ভদ্র মানুষগুলোর ভেতরেও কী রকম যেন ক্ষয়াটে, পাংশুটে, বিবর্ণ জরাজীর্ণ মানুষ আছে। আমরা বলি-আমরা অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী, ধনী-দরিদ্র, মেথর, জেলে, নাপিত সবাইকে ভালোবাসি। আসলে সেটি শুধু মুখের কথায় বলে অনেকে। লেখাপড়া করে আমি সেই মানুষদের দেখবার সুযোগ পেয়েছি, দেখতে শিখেছি।

(২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ঢাকা; সাক্ষাৎকারটি মোবাইলে নেওয়া)