সততার সঙ্গে অভিনয় করে গেছি

প্রজন্মের ব্যবধান ডিঙিয়ে সবার প্রিয় অভিনেত্রী হয়েছেন। সারা দেশের মানুষের কাছে সম্মানিত ‘সুবর্ণা মুস্তাফা’ এবার একুশে পদক  পেয়েছেন। রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় সম্মাননা এবং অভিনয় জীবনের আলাপে মেতে উঠলেন তিনি ওমর শাহেদের

সঙ্গে সাংসদ হিসেবে শপথবাক্য কবে পাঠ করবেন?

২০ ফেব্রুয়ারি আমাকে ওথ (শপথ) নিতে হবে। এরপর আমাদের কাজ বিতরণ করা হবে। যে কাজগুলো আমাকে দেওয়া হবে সেগুলো করব।

এবার সিনেমা প্রসঙ্গ অসাধারণ অভিনেত্রী হওয়ার পরও সিনেমায় নিয়মিত অভিনয় করলেন না কেন?

সিনেমা হচ্ছে কোথায় এখন বাংলাদেশে? যখন সিনেমা করছিলাম, তখন তো করছিলামই। এখন যে দু-একটি ভালো ছবি হচ্ছে, সেগুলোতে অভিনয় করতে বললে করব।

‘ঘুড্ডি’, ‘নয়নের আলো’তে আপনার স্মরণীয় অভিনয়ের কথা এখনো অনেকে বলেন। আবার ছবিতে অভিনয় করলে আমাদের দেশের উপকার হতো।

এই মুহূর্তে আমার সিনেমায় অভিনয়ের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, সিনেমা হল সংস্কার বা নবায়ন। যাতে দর্শকরা উপযুক্ত হলে গিয়ে সিনেমাগুলো দেখতে পারেন। সিনেমা হল যদি ঠিক না হয়, সেটি যদি সিনেমা দেখার উপযুক্ত না হয় এবং সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশন যদি ঠিকভাবে না হয়, তাহলে সেই ছবিগুলো বেশির ভাগ মানুষ দেখতে পান না। ফলে সবার আগে হলের পরিবেশ ভালো করতে হবে। এখন তো সবকিছু ডিজিটাল; ফলে হলের মেশিনপত্রসহ সবকিছুর মাধ্যমে প্রত্যেকটি হলকে আপ টু ডেট করতে হবে। তাহলে সিনেমার, এই দেশের সিনেমাশিল্পের উপকার হবে। এক বছরে একটিমাত্র ছবি ভালো চলল, তাতে ইন্ডাস্ট্রির কিন্তু কোনো উপকার হয় না। এই ইন্ডাস্ট্রিকে ঠিক করতে হলে সব ধরনের ছবি হলগুলোতে চলতে হবে। সেগুলো দেখার জন্য সব ধরনের দর্শকদের হলগুলোতে যেতে হবে। সে জন্য অনেক উপযুক্ত সিনেমা হল দরকার।

মঞ্চ-টিভির সেরা অভিনেত্রী, সিনেমায় অসাধারণ সাফল্য; এর রহস্য?

কঠোর পরিশ্রম এবং আবার বলছি কঠোর পরিশ্রম এই একটি উত্তরই আমি দেব।

তিন প্রজন্মের প্রিয় অভিনেত্রী কীভাবে হলেন?

এর উত্তর তো দর্শকদের বলতে হবে। এই প্রশ্নের উত্তরে আমি কী বলব? তবে নিজের কথা বলতে পারি, কোথাও গিয়ে হয়তো আমি দর্শকের বিশ্বাসের জায়গাটি অর্জন করেছি, ভালো লাগার জায়গাটি তৈরি করেছি। সে জন্যই আমাকে তারা পছন্দ করেছেন। তবে আমার চেয়েও কথাটি দর্শকরা, যারা আমাকে দেখছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। আমি বলতে পারব আমি পরিশ্রমী, সৎভাবে কাজ করি; কাজটি ভালোবেসে করি, এই কাজকে শ্রদ্ধা করি; কাজের জায়গাটিকেও ভালোবাসি। আর ঈশ্বর-প্রদত্ত কিছু গুণাবলি তো থাকেই। এসব কারণে বাংলাদেশের দর্শকরা অনেক বছর ধরে আমার সঙ্গে ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে আছেন।

আপনার টোটাল প্রেজেন্টেশনটাই আলাদা। গত ২০, ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এটি কীভাবে সম্ভব করে আসছেন?

(হাসি) আমি তো বললামই যে, আমি এই একটি কাজই করেছি। আমি ব্যবসা করিনি, চাকরি করিনি। এই একটি কাজই বছরের পর বছর ধরে করে আসছি। আমার জীবনটি এই একটি কাজেই ব্যয় করছি। তাতে আমার পুরো মনোযোগ ও ভালোবাসাটি আছে। ফলে কোথাও গিয়ে দর্শকের আমার কাজ ভালো লেগেছে। প্রতিযোগিতার কথা যদি বলো, তাহলে আমি সব সময় নিজের সঙ্গে নিজের কমপিট (প্রতিযোগিতা) করতে পছন্দ করি। নিজের আগের কাজটির চেয়ে পরের কাজটি যেন আরও ভালো হয়, সেই চেষ্টাটি আমার থাকে। সেটি বোধ হয় কোথাও ঠিক হয়। বোধ হয় কোথাও কোথাও গিয়ে আমার এই ওয়েটি (পথ) কারেক্ট (নির্ভুল); ফলে তুমি যেটি বলছো, সেটি সত্য হয়েছে।

‘কোথাও কেউ নেই’র ‘মুনা’ বা এমন আরও কিছু বিশেষ চরিত্রে আপনার স্মরণীয় অভিনয় মানুষ এখনো মনে রেখেছে।

এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। যে চরিত্রগুলোর কথা বলছো, সেগুলো স্ট্রং ক্যারেক্টার ছিল, নাটকের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। নির্মাতারা ভালো ছিলেন।

এ ধরনের চরিত্রের অভাববোধ করেন বা ভালো নির্মাতার অভাববোধ করেন?

কিছুটা তো করি।

বছর বিশেকের মতো মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন। মঞ্চে স্মরণীয় নাটক?

আরও বেশি সময় মঞ্চে কাজ করেছি। আমি তো সেলিম আল দীনের পান্ডুলিপি নিয়ে কাজ করেছি, তার লেখার চরিত্রগুলোর মধ্যে এটি বেটার বা ওটি বেটার তো বলা যায় না। তবে যদি বলো, ‘শকুন্তলা’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘কীর্তনখোলা’র কথা বলব।

অভিনয় ক্ষমতা অসীম আপনার। এখানে বাবা গোলাম মুস্তাফা বা আরও যেসব মানুষ আপনার জীবনে এসেছেন, তাদের অবদান কতটুকু?

অ্যাকচুয়ালি (সত্যিকারভাবে) সবকিছু মিলিয়ে আমি তৈরি হয়েছি। আবদুল্লাহ আল মামুন, নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আতিকুল হক চৌধুরী, পরবর্তী পর্যায়ে মোস্তফা কামাল সৈয়দ, মমতাজউদদীন আহমদ, সেলিম আল দীন, বাবা-মা তো আছেনই; এই জায়গাটিতে আমি প্রিভিলেইজ (বিশেষ সুবিধা) পেয়েছি যে, এত বড় মাপের নির্মাতা, নাট্যকারদের সঙ্গে কাজ করেছি। সো, আমার এক ধরনের আনুকূল্য ছিল। তবে নিজের চেষ্টাও ছিল, আগ্রহ ছিল। তবে ডেফিনেটলি আমি এ ব্যাপারে খুবই প্রিভিলেইজ পেয়েছি।

আপনার কি দুঃখ হয় না যে বাংলাদেশের সীমানায় বন্দি, ইন্টারন্যাশনাল অভিনেত্রী হতে পারেননি?

না, আমি কী হতে পারতাম, সেটি নিয়ে কোনো দিন পেছনে যাই নাই রে বাবা, যেটা আছে সেটি নিয়ে আমি খুব খুশি। আমি অন্য দেশে জন্মগ্রহণ করলে কী হতো ইউ নেভার নো। তাই না?

বাংলাদেশের অনেকেই বড় অভিনেত্রী হয়েছেন, বিশেষ করে সিনেমায় যেমন ববিতা...?

ভালো তো, ভেরি গুড। আমি সব সময়ই   বলেছি, আমার কখনো যদি সুযোগ হয় সিনেমায় কাজ করার করব। আমার জীবনে আক্ষেপ ব্যাপারটি একেবারেই নেই। কারণ আমি আমার বর্তমানকে নিয়ে সব সময় খুশি থাকি।

আফজাল-সুবর্ণা জুটির অসাধারণ সাফল্যের রহস্য কী?

দর্শকপ্রিয়তা, দর্শক আমাদের পছন্দ করেছেন। আমরা তৈরি করিনি, আমরা একসঙ্গে কাজ করাতে দর্শক আমাদের পছন্দ করেছেন, প্রডিউসাররা তখন আমাদের দিয়ে একসঙ্গে কাজ করিয়েছেন। জুটি সারা পৃথিবীতে এভাবেই তৈরি হয়। কেউ ঠিক করে না আমি অমুকের সঙ্গে জুটি বাঁধব। দর্শক পছন্দ করার পরই জুটি হয়, দুটো নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়।

আসাদ-সুবর্ণা?

আমি আর আসাদ তো একটি ছবিই একসঙ্গে করেছি। একটি ছবিতেই আমরা ছিলাম কো-অ্যাক্টরস, সেটি ‘ঘুড্ডি’; তা ছাড়া আমরা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সবাই সবার সঙ্গে অভিনয় করেছি। জুটি ধরতে গেলে শুধুই ‘আফজাল’।

টিভি নাটকের গ্ল্যামার, বিশেষত নায়িকার; এতে কি বাংলাদেশের টিভি নাটকের কোনো অসুবিধা হবে?

টেলিভিশন সম্পর্কে তো বলাই হয় এটি বাড়ির ভেতরের মাধ্যম। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের টেলিভিশনের শিল্পীরা অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছেন। তারা তাদের চরিত্রগুলোকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করতে পেরেছেন। একজন ফেরদৌসী মজুমদার, ডলি জহুর, নাজমা আনোয়ার, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ যখন একটি চরিত্রে অভিনয় করেন, তখন সে চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়। দর্শকরা মনে করেন, এই চরিত্রগুলো আমার পরিচিত, আমার পাশের বাসার ভাইটি এমন, আমার কোনো এক ভাবি এ রকম, আমার মা এ রকম; এই যে চরিত্রগুলো, এগুলোর সঙ্গে গ্ল্যামার যায় না, হতে পারে একটি চরিত্র খুব গ্ল্যামারাস; সেটি আলাদা কথা; কিন্তু আমার মনে হয় খামাখা গ্ল্যামার টেলিভিশনে কিছু অ্যাড করে না।

ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আমাদের কতটা ক্ষতি করে?

কোনো ক্ষতি করে না। কোনো প্রগতি বা প্রযুক্তি কখনো কোনো ক্ষতি করে না। ক্ষতি করে সেটির ব্যবহার। এ কথাটি অনেকবার বলেছি সিরিঞ্জ দিয়ে জীবন বাঁচানোর ওষুধ দেওয়া যায়, আবার সেই একই সিরিঞ্জ দিয়ে কেউ নেশা করে। তাই বলে কী আমরা সিরিঞ্জ দিয়ে ওষুধ প্রবেশ বন্ধ করে দেব? না। প্রযুক্তির ব্যবহারটিকে আগে ঠিক করতে হবে। ভারতীয় টিভি সিরিয়াল আমাদের দেশে নতুন। ফলে প্রথমদিকে একটু এক্সপেরিমেন্ট হবে। আর গ্ল্যামার তো সারা পৃথিবীর টিভি-সিনে ইন্ডাস্ট্রিতে হচ্ছে; তবে বিলো কোয়ালিটির জিনিস ধোপে টিকবে না, দর্শকরা দেখেন না। কারণ এখানে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেখানোর কিছু নেই। আপ টু দ্য মার্ক না হলে লোকে সেটি দেখে না; বড়জোর একবার, দুবার দেখে।

করতে চান এমন কোনো চরিত্রের কথা মনে পড়ে?

তা তো বটেই। কতশত চরিত্র পড়ে আছে পৃথিবীতে, আমরা করেছি কটি? আমি বলি হ্যামলেটের মায়ের চরিত্র ‘গার্থুড’, ‘লেডি ম্যাকবেথ’ এগুলো এখন করতে পারলে ভালো হতো।

পরিচালনা ছেড়ে দিয়েছেন কেন?

না, ছাড়িনি। একটি জিনিস কিছুদিন না করলেই কী ছেড়ে দেওয়া হয়?

বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা পেলেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাই

এটি আমার অর্জন। আমি এই সম্মাননা লাভকে এভাবে দেখি। এই যে এতগুলো বছর ধরে আমি খুব সততার সঙ্গে একমাত্র অভিনয়ই করে গেছি; এটি হচ্ছে তার স্বীকৃতি। এটুকুই আমার অর্জন। ফলে একুশে পদক আমার কাছে অনেক বড় অর্জন। একুশে পদক পাওয়া নিয়ে আমার ভেতরে অসম্ভব ভালো লাগা কাজ করে। রাষ্ট্র যখন কোনো শিল্পীকে সম্মান করে, তখন সেই শিল্পীর যেমন ভালো লাগে, আমার ভেতরেও তেমন অনুভূতি হচ্ছে। যখন অভিনয় করি, তখন আমি যে একাগ্রতা নিয়ে কাজ করি বা যতটা সততার সঙ্গে কাজটি করি; ওভাবেই সারা জীবন অভিনয় করে যেতে চাই। কাজে কখনো আমি ফাঁকি দিই না।

(১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ঢাকা; সাক্ষাৎকারটি মোবাইলে নেওয়া)