সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বেশ চাপের মুখে। এমন অবস্থায় এশিয়া ছাড়া বিশ্বের অন্য অঞ্চল তাকে স্বাগত জানাবে এমনটা মনে হয় না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চাপ সত্ত্বেও তিনি যে একেবারেই মিত্রহীন নন এমনটা দেখাতেই এশিয়ার শক্তিধর দেশগুলোতে সফর করেছেন সৌদি যুবরাজ।
পাকিস্তানে তাকে বেশ কায়দা করে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণের বন্দুক দিয়ে তাকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব নিশান-ই-পাকিস্তান দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রোটোকল ভেঙে জড়িয়ে ধরেন সৌদি যুবরাজকে। আর চীনে তিনি প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে পশ্চিমাদের বুঝিয়ে দেন তিনি একেবারেই মিত্রহীন নন। এমন স্বাগতম যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইউরোপে কল্পনা করা যায় না। বিশেষত গত বছর ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর পশ্চিমারা ব্যাপক মাত্রায় যুবরাজের সমালোচনা করেন। যদিও সৌদি যুবরাজ ওই হত্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন।
এমন অবস্থায় সৌদি যুবরাজের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন বেশ জরুরি ছিল। ফলে তিনি বেশ কায়দা করেই এশিয়ায় সফর করলেন। চীন এরই মধ্যে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে আদর্শিক এবং ধর্মীয় পার্থক্য থাকলেও বাণিজ্য সূত্রে তারা এক। আর এই সফরে এশিয়ার কোনো নেতাই একবারও খাশোগি হত্যাকাণ্ডের কথা তোলেননি।
চীনের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আছে। কিন্তু সফরে যুবরাজ এই নির্যাতন নিয়েও কোনো কথা বলেননি। ভারত সরকারের সঙ্গে তিনি ১০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেন। অথচ ভারতের নির্বাচনে দেশটির মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
দুই বছর আগে যখন যুবরাজের বাবা বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এশিয়া সফর করেন তখন তিনি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই, জাপান এবং চীন সফর করেন। কিন্তু যুবরাজ এশিয়ার নীতিনির্ধারণী তিনটি দেশ সফর করেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়েছেন। খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর পশ্চিমা ব্যবসায়ীরা সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনে (দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট) অংশ নেননি। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই সৌদি আরব পাকিস্তানকে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দেয় বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে।
ভারত এবং চীন উভয়েরই সৌদি আরবে বিনিয়োগ আছে। যা নিয়ে পশ্চিমারা অনেকদিন ধরেই নাখোশ। গত সপ্তাহে দিল্লিতে যুবরাজ বলেন, ‘ভারত এবং সৌদি আরবের মধ্যেকার সম্পর্ক আমাদের ডিএনএ’তে আছে। ভারতীয়রা গত ৭০ বছর ধরে সৌদি আরবকে নির্মাণে সহায়তা করছে।’ সৌদি আরবে ভারতের প্রায় ত্রিশ লাখ শ্রমিক কাজ করছে।
ডরহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আনুষ এথেশামি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরবের প্রাণ নির্ভর করে এর জ্বালানির ওপর।’ অথচ যুবরাজ ক্ষমতায় বসার পরেই তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অর্থনীতিকে ভিন্ন খাতের মধ্য দিয়ে উন্নত করতে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেন। তবে এশিয়ার সফরে দেখা যায়, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ বিলিয়ন ডলারের যে চুক্তি করেন তাতে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে পাকিস্তানের গদার বন্দরে একটি তেল পরিশোধন ক্ষেত্র নির্মাণে।