পাঁচজনের মৃত্যুর পর তাহেরের বাড়িতে ঝুলছে তালা

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভান্ডারদহ মরিচপাড়া গ্রামের অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে জামাইসহ একই পরিবারের ৫ সদস্য মারা যাওয়ার পর বাড়িটিতে এখন তালা ঝুলছে। ওই বাড়ির গৃহকর্তা আবু তাহের পেশায় ছিলেন কৃষক। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের নিয়ে তার পরিবার।

বড় ছেলে ইউসুফ একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করতেন আর ছোট ছেলে মেহেদী হাসান লাহেড়ী বাজারে একটি বইয়ের লাইব্রেরি দিয়েছিলেন। মেয়ে কহিনুরের বিয়ে দিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া কুজিশহর গ্রামে। সব মিলিয়ে ভরা সংসার ছিল তার। একই পরিবারের কর্তা, স্ত্রী ও দুই ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে বাড়িটি এখন সদস্য শূন্য।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি শরীরে জ্বর আর ব্যথা নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান আবু তাহের। তার বয়স প্রায় ৫৫’র কোঠায় হওয়ায় এলাকার মানুষ তেমন কিছু ভাবেনি। একই উপসর্গ জ্বর ও ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি তাহেরের মেয়ে জামাই হাবিবুর রহমান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ওই দিনই তাহেরের স্ত্রী হোসনে আরা বাড়িতেই মারা যান।

তাহেরের মৃত্যুর পরপরই জামাই ও স্ত্রী মারা যাওয়ায় কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েন এলাকার মানুষ। কি হচ্ছে ওই বাড়িতে? এসব ভাবতে না ভাবতেই রোববার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে জ্বর আর শরীরে জ্বালাপোড়া নিয়ে দুই ভাই ইউসুফ আলী ও তার ছোট ভাই মেহেদী হাসানকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

এরপর তাদের অবস্থার অবনতি দেখা দিলে চিকিৎসকরা তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। একই অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের মধ্যে ইউসুফ আলী রংপুর যাওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ওই অ্যাম্বুলেন্স রংপুরে পৌঁছে মেহেদীকে হাসপাতালে ভর্তির পর বাড়ি ফিরে আসে ইউসুফের মরদেহ। ইউসুফের মরদেহ বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই খবর আসে ছোট ভাই মেহেদীও মারা গেছেন। একে একে আবু তাহেরের পরিবারের ৪ সদস্য ও মেয়ে জামাই মৃত্যুর পর এলাকায় বিরাজ করে আতঙ্ক।

এছাড়া আরও আক্রান্ত হয়েছে মৃত ইউসুফের স্ত্রী কহিনুর বেগম, ছেলে আবির হোসেন, শ্বশুর রবিউল ইসলাম এবং প্রতিবেশী সালমা বেগম।

পরিবারের সদস্যদের পদচারণা আর কোলাহলে ভরপুর ছিল তাহেরের বাড়ি। এখন অন্ধকারে ওই বাড়িটিতে কে জ্বালাবে আলো? প্রশ্ন এলাকাবাসীর। এল প্যাটার্নের তিন রুম বিশিষ্ট ওই বাড়ির দরজায় ঝুলছে তালা।

এ ঘটনা শোনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকে শুনে দূর-দূরান্ত থেকে ঘটনা জানতে আসছে।

স্থানীয়রা জানায়, আবু তাহের কৃষিনির্ভর হলেও জ্বীন-ভূত তাড়ানোর কাজে বিশ্বাসী ছিল তার পরিবার। তাদের মধ্যে এসব কু-সংস্কার ধারণা ছিল।

স্থানীয় সংবাদকর্মী রাজিউর রহমান জিহাদ জানান, আবু তাহের নিজেই মাহাতী (করিবাজী ) করতেন। ঝাড়ফুঁক দিয়ে পানি পড়াও দিতেন অনেক মানুষকে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত রোগে আবু তাহের মারা যাওয়ার আগে তিনি বাড়িতে স্ত্রীকে বলেছিলেন তালাবদ্ধ থাকা একটি রুম না খুলতে। তাহেরের মৃত্যুর পর সে কথা অমান্য করে ওই রুমটি খোলা এবং বাড়িতে গরুর মাংস রান্না করে খাওয়ার কারণে এর প্রভাব পড়েছে ওই পরিবারের উপর এমন ধারণাও করছেন অনেকে।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সমর কুমার চ্যাটার্জী নুপুর জানান, যেহেতু ওই বাড়ির সদস্যরা মারা গেছেন বাড়িতে থাকার কোনো মানুষ নেই। আবু তাহেরের বাবা বেঁচে আছেন। তিনি থাকেন ছোট ছেলে নজরুল ইসলামের বাড়িতে। তাই এখন সেখানে তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

সমর কুমার চ্যাটার্জী নুপুর আরও বলেন, যেহেতু এখনো রোগ নির্ণয় হয়নি। তাই আমরা এখন ওই বাড়িতে বা তার আশপাশে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছি না।

নতুন করে কেউ আক্রান্ত হলে দ্রুত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহজাহান নেওয়াজ জানান, রোগ নির্ণয়ে ঢাকার রোগ তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ৫ সদস্যের একটি টিম ঠাকুরগাঁওয়ে আসছেন। তারা এলেই জানা যাবে ঘটনার বিস্তারিত।