চট্টগ্রামে রেলওয়ের ৩ হাজার কোটি টাকার ভূমি বেদখলে

রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বেদখলে গেছে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি। এতে রেললাইনে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি যেমন বেড়েছে তেমনি বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই অবৈধ দখলদারদের হাতে রেলওয়ের ২১৫ একর জমি, কর্মকর্তাদের হিসাবে যার মূল্য আনুমানিক ৩ হাজার কোটি টাকা। ভূমি উদ্ধারে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা আবার দখলদারদের কব্জায় চলে যাচ্ছে। কোথাও জাল দলিল ও কাগজপত্র তৈরি করে আবাসন কোম্পানির ভবন তোলা হয়েছে। রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেও জমি দখলের অভিযোগ আছে।

কর্মকর্তারা জানান, বেদখলে থাকা ২১৫ দশমিক ১৮ একর জমির মধ্যে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে ৮৭ দশমিক ৫ একর। ১০০ একর জায়গা দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।  অবৈধ দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাচ্ছেন না বলে কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন।

জমি উদ্ধারের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলওয়ের জমি উদ্ধার করে কী হবে? উচ্ছেদ করলাম, কিছুদিন পর দেখা গেল আবারও দখল হয়ে যাবে। আপনারা পরামর্শ দেন, উদ্ধারকৃত জমিতে আমরা কী করতে পারি।’ গত ১ মার্চ চট্টগ্রাম সফরে এক মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আগে যা হয়েছে ভুলে যান। নতুন করে কাউকে রেলওয়ের জায়গা দখল করতে দেওয়া হবে না।’

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের রেলওয়ে স্টেশন-সংলগ্ন আইস ফ্যাক্টরি রোড, কদমতলী, পাহাড়তলী, টাইগার পাস, খুলশী, আমবাগান, আকবর শাহ, ফয়’স লেকসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের মূল্যবান জমি দখলে নিয়ে বহুতল ভবন, মার্কেট ও বসতবাড়ি তৈরি করা হয়েছে। রেলের জমিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস। দখল থেকে রক্ষা পায়নি রেললাইনের আশপাশের খালি জায়গা, পাহাড়, টিলাও। স্থানীয়রা জানান, দখলের পাশাপাশি রেললাইনের দুই ধারে মাদকের আখড়া গড়ে তুলেছে বিভিন্ন সিন্ডিকেট।

এদিকে উচ্ছেদ করা রেলের জমি পুনর্দখলও থেমে নেই। এর আগে রেল স্টেশন-সংলগ্ন মাদকের সবচেয়ে বড় স্পটখ্যাত বরিশাল কলোনি উচ্ছেদ করে চারপাশ ঘিরে দিয়েছিল কর্র্তৃপক্ষ। মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত ফারুক র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। গত পাঁচ বছরে তার অংশীদার মনিরের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তাদের ম্যানেজার খ্যাত ইউসুফ ব্যবসা ছেড়ে দেড় বছর ধরে ভারতে। তবে অভিযোগ আছে, বর্তমানে ফারুকের ভাই সেকান্দার ও কুদ্দুছ প্ল্যাটফরমে গড়ে তুলেছে ইয়াবা সিন্ডিকেট। গত ২ মার্চ এ সিন্ডিকেটের ব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচিত শাহজাহানকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে সদরঘাট থানা-পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মাদক ব্যবসার বিস্তারিত জানান।

রেলওয়ে বলছে, সারা দেশে তাদের মালিকানাধীন জমি প্রায় ৬১ হাজার ৬০৫ দশমিক ৮৪ একর। এর মধ্যে রেলওয়ে ব্যবহার করছে ৩১ হাজার ৩১১ দশমিক ৫০ একর। এ ছাড়া ৭৯৫ দশমিক ১৯ একর মৎস্য, ৩০ দশমিক ৫৫ একর নার্সারি, ১২ দশমিক ৪৭ একর সিএনজি স্টেশন, ৪৫ দশমিক ৬৭ একর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২১০ দশমিক ৬৯ একর সরকারি-আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া আছে। বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া জমি ৯০৯ দশমিক ৮৪ একর। বিভিন্ন হিসাবে, স্বাধীনতার পর থেকে রেলওয়ের প্রায় ৪ হাজার ৪৬৫ দশমিক ৬২ একর জমি বেহাত হয়ে গেছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১ হাজার ৭৮ দশমিক ১৫ একর। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দাবি করেছেন রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনায় জড়িত কর্মকর্তা ও নগরবিদরা।

জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা ইশরাত রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেদখল ভূসম্পত্তি রক্ষায় রেলওয়ে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করছে। পূর্বাঞ্চলে এ পর্যন্ত ৪১৯ একর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। আগামী দিনেও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা বলেন, ‘কেউ সামান্য জমি লিজ নিয়ে আশপাশের এলাকা দখলে নিয়েছে। কিছু এলাকায় মামলার কারণে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না।’ রেলের সম্পত্তি পাহারায় নিয়োজিত রেল নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘বাহিনীর লোকবল-সংকট আছে। এর পরও আমরা দায়িত্ব পালন করছি। ইতিমধ্যে যেসব ভূমি দখলমুক্ত হয়েছে সেখানে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’