যেভাবে শিসপ্রিয়া হয়ে উঠলেন অবন্তী সিঁথি

কাপ সং গেয়ে পুরো উপমহাদেশের মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন সারেগা মা পা’র প্রতিযোগী অবন্তী। বিচারকরা তাকে শিসপ্রিয়া উপাধিতে ভূষিত করেন। এই শিসপ্রিয়াকে নিয়ে লিখেছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।

অবন্তীকে প্রথম দেখি ২০১৫ সালে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি  ভিডিওতে। খালি গলায় গান গাইছিল মেয়েটা। বাদ্যযন্ত্র বলতে তেমন কিছুই নেই। ফয়েল পেপার আর দুটি কাপ। সুরের মায়াজাল তৈরি করে গেয়ে চলছিল ‘যেখানে সীমান্ত তোমার…’। আমি একবার নয়, বেশ কয়েকবার গানটি শুনি আর নিজের অজান্তেই বলে উঠি, ‘আহা, কী মিষ্টি গলা! পোস্টের নিচের কমেন্টগুলোর দিকে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া!এত কমেন্ট, এত প্রশংসা! লাখ লাখ ভিউয়ার্স ততক্ষণে দেখে ফেলেছে ভিডিওটি। কেউ কেউ মেয়েটির গলার প্রশংসা করার পাশাপাশি রূপের প্রশংসা করতেও ছাড়েনি।

ফেসবুকের সেই কাপ সিঙ্গার অবন্তী একদিন বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে হাজির হলেন কলকাতার এক টিভি চ্যানেলে। মিষ্টি গলায় শোনালেন গান, বাদ্যযন্ত্র হিসেবে সঙ্গী হলো সেই কাপ। পুরো উপমহাদেশ প্রশংসায় ভাসল অবন্তীর। সারে গামা পা’র আসরে নিজেকে মেলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি অবন্তী। তাতে কি, শেষ ১৪তে জায়গা করে নেন তিনি। এটাই বা কম কিসে?

অবন্তী সিঁথি নামে পরিচিতি পেলেও তার পুরো নাম অবন্তী দেব সিঁথি। বেড়ে ওঠা জামালপুরে। বাবা অজিত কুমার দেব। মা দীপ্তি রানী দেব। মফস্বল শহরের আলোছায়ায় বেড়ে ওঠা অবন্তী কখনো ভাবেননি গায়িকা হবেন। গান গেয়ে মানুষের মন জয় করার চিন্তা তো আরও বহুদূর! আর কাপ সং? সে নাহয় নাই বলি।

নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকা একটি মেয়ে। আর দশটা মেয়ের মতো দুষ্ট নয়, লক্ষ্মী স্বভাবের। নম্র ভদ্র মেয়েটি বড়বোনের পাশে বসে বোনের গান শুনত। গান শুনতে শুনতেই গানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। এভাবেই একসময় নিজেই বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গেয়ে ওঠেন মিতালি মুখার্জির গান, সাবিনা, রুনার সুরে নিজের গলা ভেজে পরখ করেন।

বড় বোন তার পরীক্ষাজনিত কারণে গান করা বাদ দেন। বড় বোনের ছেড়ে দেওয়া জগতে তখন পুরোদমে বিচরণ করা শুরু করেন ছোট বোন। বাবা মা-ও মেয়ের গানের প্রতি আগ্রহ দেখে ওস্তাদের কাছে তালিম দেওয়ান। তার গানের হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ সুশান্ত দেব কানুর কাছে।

তারপর...তারপর একদিন আসে সেই সময়, নিজেকে জাতীয় পর্যায়ে মেলে ধরার সুযোগ। ২০০৬ সালে ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায় নিজের নাম লেখান, কিন্তু শুরুতেই থেমে যায় স্বপ্ন। প্রথম ৫৫ জনের ঘরে এসেই ছিটকে পড়েন অবন্তী। তারপর পড়ালেখার কারণে গানের জগতে সময় দেওয়া কমিয়ে দেন।

২০১১ সাল। অবন্তী তখন ঢাকায় বসবাস করেন।এবার নিজেই গান শেখানো শুরু করেন। ছাত্রদের গান শেখানোর পাশাপাশি নিজের চর্চাটাও শুরু করেন পুরোদমে। ২০১২ সালে আবারও নাম লেখালেন ক্লোজআপ ওয়ান প্রতিযোগিতায়। এবার আর পিছিয়ে পড়া নয়, আস্তে আস্তে জায়গা করে নিলেন সেরা দশে। কিন্তু বিধিবাম, সেরা ৯ হওয়ার পর এবারও সিটকে পড়লেন অবন্তী। তবে  এ নিয়ে তার কোনো খেদ নেই। হাসিমুখেই জানালেন  সিটকে পড়ার গল্প, ‘ক্লোজআপ ওয়ানের নম্বর ওয়ান হওয়া আমার লক্ষ ছিল না। আমি চেয়েছি অন্তত সেরা দশে যেন জায়গা হয়। সেটা আমি পেয়েছি।ফলে সিটকে পড়ার বিষয়ে আমার ভেতরে কোনো আফসোস কাজ করেনি।’

ক্লোজআপ ওয়ানে সেরা দশে থাকার কল্যাণে স্টেজ শোসহ গান গেয়ে উপার্জনের পথটা খুলে যায় অবন্তীর। কণ্ঠ দেন সিনেমার প্লেব্যাকেও। ‘মাটির পরী’, ‘পাগলা দিওয়ানা’সহ বেশ কিছু ছবিতে গান গেয়েছেন তিনি।

স্টেজ শো, প্লেব্যাক করলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়নি। কেন এই বিলম্ব? অবন্তী বলেন, ‘নিজেকে আরও ভালো করে প্রস্তুত করছি। দু’চারটি গান রেডিও করেছি। কিন্তু অ্যালবাম করব করব করেও করা হচ্ছে না। খুব শিগগিরই অ্যালবাম বের করে ফেলব।’

এবার আসি মূল চমকে। এবার আমরা প্রবেশ করব কাপ সংয়ের নেপথ্যের গল্পে। প্রথম বাংলাদেশি মেয়ে যে কাপ সং গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, যে কারণে অবন্তীকে আজ সবাই চেনে। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের গল্পটি শোনা যাক অবন্তির মুখেই, ‘২০১৫ সালের কথা। আমি কখনো ভাবিনি ১ মিনিট ১ সেকেন্ডের ১টি ভিডিও আমাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে দেবে। দুই তিন-ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার দর্শক মিলবে। খুলেই বলি, ওই গানটা গাওয়ার মাস কয়েক আগে ইউটিউবে দুটি বিদেশি মেয়ের কাপ সং গাওয়া দেখে ভালো লাগে আমার। এরপর ইউটিউব ঘেঁটে কাপ সংয়ের ওপর কিছু টিউটোরিয়াল দেখে নিই। পরে নিজে নিজেই চেষ্টা করি। কয়েকটি গান ট্রাই করার পর ভাবলাম যে এবার নিজের কিছু গান ভিডিও করে ইউটিউবে ছাড়লে কেমন হয়! নিজের নতুন ইউটিউব চ্যানেলে নিজের গান পোস্ট করার মজাই আলাদা।এরই মধ্যে একদিন বাসার সবাই চলে গেছে গ্রামের বাড়ি। একা বাড়িতে বসে ভিডিও করে ফেললাম ‘কেন যে এই নিঃসঙ্গতা’গানটি। তখন সন্ধ্যা। গানটি আপলোড দিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘণ্টা দু-এক পরে ফেসবুকে ঢুকে দেখি প্রচুর নোটিফিকেশন। আমি তো দেখে অবাক। সাধারণত এত লাইক এত কমেন্ট কখনো আমার হয়নি। ফেসবুকে ঢুকে দেখি প্রায় ২০ হাজার ভিউয়ার্স। এরপর অন্য আরেকটি পেইজে দেখলাম আমার এই গানটি নিয়ে ১ মিনিট ১ সেকেন্ড এর ভিডিও। সেখানে প্রায় ৫ লাখ ভিউয়ার্স। আমি, তো তাজ্জব।’

এরপর অবন্তীর শুরু হয় নতুনভাবে পথচলা। ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে বেশ কিছু গান নিয়ে হাজির হন ইউটিউবে। ফলে অনলাইনের কল্যাণে তার কাপ সংয়ের সুনাম ছড়িয়ে যায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে। ২০১৬ সালে ডাক পড়ে জি বাংলার ‘সারেগামাপা’ অনুষ্ঠানে। সেখানে অতিথি শিল্পী হিসেবে কাপ সং গেয়ে সবার সুনাম কুড়ান। এরপর আবার দেশে ফিরে মনোনিবেশ করেন নিজের কাজে। একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি সলো গান নিয়ে হাজির হন ইউটিউবে।

জি বাংলার কল্যাণে ওপার বাংলার মানুষের কাছেও পৌঁছে যায় অবন্তীর নাম। ২০১৮ সালের ‘সারেগামাপা’র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আবারও তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। সারেগামাপার মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার গল্প শোনা যাক অবন্তীর মুখেই, ‘২০১৬ সালে যখন অতিথি হিসেবে সারেগামাপার প্রোগ্রামে যাই তখন তখন দেখি একটা গান কীভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত করতে হয় সেটা প্রশিক্ষকেরা শিখিয়ে দিচ্ছেন। এটা দেখে আমার ভালো লেগে যায়, মনে মনে ভাবি এখানে যদি একবার আসতে পারতাম। ‍এটলিস্ট শেখার জন্য। তারপর দেখলাম, এবার বাংলাদেশে থেকেও অনেকে অডিশন দিতে যাচ্ছে। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভাবলাম, এটলিস্ট শেখার জন্য তো যাওয়া যেতেই পারে। সেটা ভেবেই ‘সারেগামাপা’য় অংশ নেওয়া। তারপর একটা পর্যায়ে এসে বাদ পড়ে গেলাম।’

প্রতিযোগিতায় ১৪তম হয়ে বাদ পড়েন অবন্তী দেব সিঁথি। তবে এ নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। অবন্তী বলেন, ‘মূলত শেখার উদ্দেশ্যেই যাওয়া। এখানে না গেলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত। এ নিয়ে আমার কোনো দুঃখবোধ নেই।’

প্রতিযোগিতা চলাকালে অবন্তীর শিস বাজানোতে মুগ্ধ হয়ে তাকে শিসপ্রিয়া খেতাব দেওয়া হয়। এই খেতাব পাওয়ার অনুভূতি বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই জানালেন অবন্তী, ‘সত্যি কথা বলতে কি, আমি ওখানে কোয়ালিফাই করব- এটা মাথায় ছিল না। আমি অনেকটা ভয়েই ছিলাম। কারণ ওরা এত বেশি তৈরি থাকে যে, পারা মুশকিল।  আমার তো ওরকম কোনো প্রিপারেশনই ছিল না। তারপরও  যখন করে ফেললাম তখন ওরা অবাক যে এটা কি করে হলো। তারপর আমার হুইসেল শুনে শ্রদ্ধেয় তন্ময় বোস স্যার আমাকে শিসপ্রিয়া নাম দিয়ে দিলেন। আমার মনে হয় যে আমার সেরা মুহূর্তটা ওই সময়টাতেই ছিল। ওখান থেকে এত কিছু শিখেছি, ওদের কাছ থেকে এত আদর, এত ভালোবাসা পেয়েছি যে এ অনুভূতি বলে বোঝাতে পারব না।  আমার খুবই ভালো লেগেছে।’

প্রতিযোগিতার দিন গুলিও বেশ ভালো ভাবেই উদ্‌যাপন করেছেন অবন্তী। তিনি বলেন, ‘একটা অ্যাপার্টমেন্টে আমরা প্রতিযোগীরা সবাই থাকতাম। ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য আলাদা থাকার জায়গা ছিল। ওখানে সারা দিনের রুটিন তৈরি করা থাকত। শুরুর দিকে তিনটা রুমে তিনজন প্রশিক্ষক থাকতেন। আমরা একটা গান নিয়ে তিনজনের কাছেই যেতাম। ওনারা গানটা নিয়ে তিন ধরনের কমেন্ট করতেন। ব্যাপারটা অনেকটা প্রেসক্রিপশনের মতো আমি রোগের যদি ডায়াগনস্টিক করি, সেখানে যেমন রোগটা ধরা পড়ে। কী অবস্থায় আছে সেটা ধরা পড়ে। তেমনি গানটা এখন কোন পর্যায়ে আছে সেটা ধরিয়ে দিতেন তারা। আমাদের সারা দিনই গ্রুমিংয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হতো। শুরুর দিকে সকাল ৯টা থেকে গ্রুমিং শুরু হয়ে চলত প্রায় রাত আটটা পর্যন্ত। পরের দিকে এসে গ্রুমিংয়ের টাইমটা বেড়েছে। কারণ তখন ব্যান্ড মিউজিক করতে হতো। ট্র্যাক তৈরি করত। সকাল আটটা-নয়টা থেকে রাত ১০ টা এগারোটা বেজে যেত।’

এই প্রতিযোগিতা থেকে অবন্তীর প্রাপ্তির শেষ নেই। প্রাপ্তির তালিকাটা অনেক বড়ই। অবন্তী বলেন, ‘আমি তো বলব, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত পুরোটাই প্রাপ্তি। অনেক বড় প্রাপ্তি বলব। সত্যি কথা বলতে, গানতো গাইতাম ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ওখানে না গেলে বুঝতে পারতাম না যে আমার এত ত্রুটি ছিল। আগে গানের কিছু জিনিস আমি বুঝে উঠতে পারতাম না। ওখানে গিয়ে আমি সেগুলো বুঝেছি। শুধু গান না । গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও অনেক ধরনের হয়। গানটা আসলে কী করে রিএরেঞ্জ করা হয় সেটা আমাদের চোখের সামনেই করা হয়েছে। ওখানে যারা মিউজিশিয়ান ছিলেন ওনারা তো স্বনামধন্য ছিলেন। তো ওনাদের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। শুধু একাডেমিক না, হাতে কলমে নয়, ওনাদেরকে দেখলেও অনেক কিছু শেখা যেত।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন অবন্তী। প্রতিযোগিতা শেষে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। আবারও গান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। পাশাপাশি একটা চাকরিরও সন্ধান করছেন অবন্তী। ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে নানা পরিকল্পনা। অবন্তী জানান, ‘আমি বলব এই প্রতিযোগিতার পর থেকেই আমার মূল জার্নিটা শুরু হলো। আমার বেশ কিছু প্ল্যানিং আছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করব। নিজের কিছু মৌলিক গান আছে, সেগুলো করব। আর পরিকল্পনার কথা এখনই বলতে চাই না। এ ছাড়া যেহেতু এখনো সরকারি চাকরির বয়স আছে তাই চেষ্টা করছি কোনো ভালো সরকারি চাকরি পাই কিনা। না হলে কোনো প্রাইভেট জবে ফিরে যাব।’

অবন্তীর গল্প এখানেই শেষ নয়, গল্পটা কেবল শুরু। কারণ নিজেকে ঝালাই করে নিতে অবন্তী গানের তালিম নিচ্ছেন রথিজিৎ ভট্টাচার্যের কাছে। কাপ বাজিয়ে, শিস বাজিয়ে অবন্তী নিজের গল্প বলে যাবেন ধীরে ধীরে।