পাঁচ বছর আগে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলেও বর্তমান সরকারের আগামী পাঁচ বছরে তা করে দেখানোর কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য সারা দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্টের মধ্য দিয়ে এই কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে সরকারি খাতেও প্রায় চার লাখ লোক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সরকারি অফিস-আদালতে থাকা সকল শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ সরকার। এরই মধ্যে সরকারের প্রায় চার লাখ পদে দ্রুত লোক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থিত মন্ত্রীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী পাঁচ বছর মেয়াদকালের মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্দেশ দেন। এ জন্য ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়ানো, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, এই পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতি পরিবারে অন্তত একজন করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরগুলোতে থাকা শূন্যপদ দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওই মৌখিক নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরে মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান গত ৪ মার্চ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সরকারি দপ্তরসমূহে দ্রুত শূন্যপদ পূরণের সদয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় তিনি এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সানুগ্রহ অনুশাসন প্রদান করেন।’
সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে শূন্যপদে দ্রুত জনবল নিয়োগ দিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে আগামী ২০ মার্চের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে বলেছেন মুখ্য সচিব। মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে পাঠানো চিঠিতে এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘অনবিলম্বে আপনার মন্ত্রণালয়/ বিভাগ ও আওতাধীন দপ্তর/সংস্থাসমূহে বিদ্যমান শূন্যপদের যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রণয়নের জন্য আপনার ব্যক্তিগত মনোযোগ আকর্ষণ করছি। এ সকল শূন্যপদে কত দিনের মধ্যে জনবল নিয়োগ সম্ভব তার একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। বিদ্যমান শূন্যপদের তথ্য ও এ সকল শূন্যপদ পূরণের জন্য প্রণীত কর্মপরিকল্পনা আগামী ২০ মার্চ বুধবারের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করার জন্য আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’
নজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়াকে বর্তমান সরকার বিশেষ অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোর শূন্যপদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের এ অঙ্গীকার অনেকটা পূরণ করা সম্ভব। এ জন্যই সময়াবদ্ধ ও সক্রিয় কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের সকল শূন্যপদ পূরণের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।’
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, সরকারের বিভিন্ন অফিস ও মন্ত্রণালয়ে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪৬টি সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে শূন্য রয়েছে তিন হাজার ৮৫৪টি পদ। এসব শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সব প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদে দ্রুত লোক নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে সচিবদের বলেছেন, কোনো পদই ফাঁকা রাখা যাবে না। তার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর শূন্যপদ কত, কীভাবে দ্রুত নিয়োগ নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম রুহুল আজাদের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদে দ্রুত লোক নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শূন্যপদের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৮৪টি। এর মধ্যে শুধু ব্যাংকগুলোতেই শূন্যপদ রয়েছে ৪৩ হাজার ৬২৫টি। এসব শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ দিতে সাত দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশনা দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
বৈঠকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক মো. আফজাল করিম বলেন, ১৯৮৬ সাল হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকে অফিসার পদে কোনো লোক নিয়োগ হয়নি। ফলে ব্যাংকটিতে মধ্যবর্তী স্তরে কর্মকর্তার শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা দূর করতে মধ্যবর্তী স্তরে সরাসরি নিয়োগের কথা বলেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনবল সংকট সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে। অগ্রণী ব্যাংকেও জনবল ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত এসব ব্যাংকের শূন্যপদ পূরণে মন্ত্রণালয় থেকে কর্মপরিকল্পনা চাওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’ সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধিমালার জন্য অনেক শূন্যপদ পূরণ করা যায় না। অথচ এ বিধিমালা তৈরি করা খুব কঠিন কাজ না। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত বিধিমালা রাষ্ট্রপতি জারি করলেও যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যায়েই বিধিমালা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগার কোনো কারণ নাই।
তিনি বলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিসিএস নিয়োগের জন্য সুপারিশ করলেও সংশ্লিষ্টদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ দিতে এক বছরের বেশি সময় লাগে। যা মোটেই উচিত না। ২৭তম বিসিএসে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়েছিল মাত্র দুই মাসে। সেই সময় দুই মাসে হলে এখন কেন এক বছরের বেশি সময় লাগবে। কারিগরি পদের বাইরে সাধারণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়। এই দলীয় পরিচয় খুঁজতে গিয়ে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। দ্রুত নিয়োগ দিতে চাইলে রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা বাদ দিতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মনজুরে এলাহী গতকাল বলেন, বাংলাদেশের এখন দরকার কর্মসংস্থান। আর কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ দরকার। বিনিয়োগ বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করতে হবে। এসব না হলে রাজস্ব পাবে সরকার কিন্তু কর্মসংস্থান হবে না।
গত ১০ মার্চ আগামী ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রথম প্রাক-বাজেট সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, আগামী বাজেটেই প্রতি পরিবারে একজনের কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় কৌশল থাকছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি পরিবারে একজন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে গত পাঁচ বছরে তা অর্জন সম্ভব হয়নি। প্রায় এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে গত মেয়াদ থেকেই ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান শুরু হয়েছে।