একসময় বাংলাদেশে ১২’শর বেশি সিনেমা হল ছিল । সেখান থেকে হলসংখ্যা কমতে কমতে এখন নেমে এসেছে মাত্র পৌনে দুইশতে। এই হলগুলোরও অবস্থা জরাজীর্ণ। এ বছর বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরও কিছু সিনেমা হল। নানা কারণেই সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় অভাব ভালো সিনেমার। সিনেমা হলগুলোর এই নাজুক অবস্থা সচল করতে এবার ব্যবস্থা চাইলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি। শুধু ব্যবস্থা চেয়েই ক্ষান্ত নন তারা। দিয়েছেন হুমকিও। হল বাঁচাতে সঠিক ব্যবস্থা না হলে বন্ধ করে দেবেন সিনেমা হল। ১২ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রদর্শক সমিতি জানায়, বিদেশি ছবি আমদানির ক্ষেত্রে নীতিমালা সহজ ও দেশীয় ছবি নির্মাণ বাড়ানোর বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ না নিলে ১২ এপ্রিল থেকে দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে উল্লেখ করে সম্মেলনে বক্তারা জানান, তারপরও সুনির্দিষ্টভাবে সিনেমা হলগুলোকে বাঁচানোর, দেশের ছবির উৎপাদন বাড়ানোর এবং উপমহাদেশের ছবি আমদানির বাধাগুলো অপসারণে কোনো কার্যকর পথ নির্দেশ না দেওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সমিতির পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ১ হাজার ২৩৫ থেমে নেমে ১৭৪ এ এসে দাঁড়িয়েছে। দেশের ছবি নির্মাণের সংখ্যা বছরে ৩৫ থেকে ৪০-এ এসে ঠেকেছে। সিনেমা হলের সঙ্গে জড়িত ৫০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে আছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে হল ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল। চলচ্চিত্রের বাজার নষ্ট হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ ও মেধা সম্পন্ন নির্মাতা আসছে না। সিনেমা হলগুলো লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, যখন থেকে ছবি আমদানি করা হচ্ছে তখন থেকে প্রদর্শক সমিতিকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, ভালো নির্মাতা আসছেন, দেশের চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তা হয়নি। ছবি আমদানি করা হলে পরিচালক-শিল্পীদের রোজগার কমে যাবে এমন অজুহাত দেওয়া হচ্ছে।
প্রদর্শক সমিতি এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আগামী ১২ এপ্রিল থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার আমলে নেওয়ার আগ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
এদিকে প্রদর্শক সমিতির এমন ঘোষণায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে চলচ্চিত্রাঙ্গনে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান গণমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, প্রয়োজনে পাল্টা আন্দোলনে নামবেন। জায়েদ খান বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমরা কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে আন্দোলন করেছি। বিদেশি সিনেমা মুক্তির বিপক্ষে, এখন যদি সেই বিদেশি সিনেমায় আবার হলে চালানো হয় তাহলে আমরা আবারও আন্দোলনে নামব। তিনি বলেন, ‘এর আগেও তারা সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আবারও তারা নানা পাঁয়তারা করছে হিন্দি সিনেমা আমদানি করার জন্য। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনকে অমান্য করে হিন্দি সিনেমা আমদানির মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চায়। আমরা এটা মেনে নেব না।’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা সিনেমা হল বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা সিনেমারই একটা পক্ষ। তাদের সিনেমা হল আছে। তারা যে কথাগুলো বলেছে তাতে যুক্তি আছে। তারা ভালো কনটেন্ট চায়। আমরাও মনে করি ভালো কনটেন্ট ছাড়া সিনেমা হল টেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু ভালো কনটেন্ট দিতে হলে আমাদের সুযোগ করে দিতে হবে। সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সিনেমার টিকেট বিক্রির ন্যায্য পাওনা প্রযোজককে পরিশোধ করতে হবে। প্রযোজক যদি তার ন্যায্য হিস্যা পায় তাহলেই সে লাভবান হবে। বারবার ইনভেস্ট করবে। কিন্তু হল মালিকরা ন্যায্য পাওনা থেকে প্রযোজকদের বঞ্চিত করছেন। ধরেন, মধুমিতা হলের টিকেটের দাম ১৫০ টাকা। কিন্তু প্রযোজক পায় ৩০ টাকা। এই ৩০ টাকার মধ্যেই প্রযোজকের সিনেমা বানানো, পাবলিসিটি, মেশিন ভাড়া সব দিতে হয়। এতে করে প্রযোজক হিসেবে আমার খরচ হচ্ছে পার টিকেটে ৩৫-৩৬ টাকা। প্রতি টিকেটে লস ৫ থেকে ৬ টাকা। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে প্রযোজক তো লসই গুনবেন। তারা তো আর সিনেমা বানাবেন না। এই অসম বণ্টনের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এটার কোনো সমাধান হবে না। একটা ভালো ছবি বানাতে হলে ভালো বাজেট লাগবে। সেই বাজেট যদি না তুলে আনা যায় তাহলে ভালো ছবি নির্মাণ করা যাবে না। এখন উচিত সরকারের সঙ্গে বসে সুরাহা করা। আর হল মালিকদেরকেই সুরাহার ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খোকন আরও বলেন, ‘এখন তারা যদি সিনেমা হল বন্ধ করে দেয় তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। তারা যেটা চাচ্ছে ইন্ডিয়ান হিন্দি ছবি চালাতে, সেটা কোনো দিনই আসবে না। এটা বঙ্গবন্ধু নিজে বন্ধ করে দিয়ে গেছেন। আমার বিশ্বাস হিন্দি-উর্দু কোনো ছবিই লাগবে না। যদি আমার সিনেমার বাজার ভালো করা যায়। সে জন্য ভালো সিনেমা বানানোর জন্য একটা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
মধুমতি সিনেমা হলের মালিক ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আল্টিমেটাম হচ্ছে হল বাঁচানোর জন্য। যারা আমাদের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে যায় তারা মধ্যবিত্ত দর্শক। তারা কিন্তু সিনেপ্লেক্সে ছবি দেখতে যায় না। তারা উচ্চ মার্গীয় ছবি দেখে না। তারা বাণিজ্যিক মসলা ছবি চায়। ওই ধরনের ছবি আমরা পাচ্ছি না। আমার সিনেমা হল মধুমিতায় ‘দেবী’র পর ব্যবসাসফল আর কোনো ছবি পাচ্ছি না। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অনেক ছবিই মুক্তি পেয়েছে কিন্তু কোনো ছবিই ব্যবসাসফল হয়নি। ভালো কনটেন্টের অভাবে প্রচুর হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার কিছুই করছে না। সরকার তো অনেক কিছুই করার কথা বলেছে কিন্তু সেগুলো তো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। শুধু বললে হবে না। কার্যকরও করতে হবে। ভারতীয় ছবি আনতে জটিলতা, যৌথ প্রযোজনায় ছবি বানাতে যে শর্ত দিয়েছে, সেটাও খুব কঠিন। ভালো মানের দেশীয় ছবিও নির্মিত হচ্ছে না। তাহলে হলগুলো চলবে কি করে?’
সিনেপ্লেক্সের প্রসঙ্গ টেনে এনে নওশাদ বলেন, ‘আমাদের দেশের সিনেপ্লেক্সগুলো হলিউডের ছবি সরাসরি এনে চালাচ্ছে। যেখানে হলিউডের ছবি আন্তর্জাতিক মুক্তির দিনেই একই সঙ্গে বাংলাদেশে রিলিজ হচ্ছে, সেখানে কলকাতার বাংলা ছবি বা ভারতীয় হিন্দি ছবি এখানে একই দিনে কেন মুক্তি পাবে না? সরকারকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
এদিকে হল মালিকদের কারচুপির কারণে দেশীয় প্রযোজকেরা লগ্নি তুলে আনতে পারছেন না, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওশাদ বলেন, ‘টাকা ওঠে আসছে না, হল মালিকরা কারচুপি করছে- এটা সবাই বলে। হল মালিকরা যদি কারচুপিই করে তাহলে সিনেমা হলে ছবি না দিলেই তো হয়। তারা তো বলে দিতে পারে যে আপনারা কারচুপি করেন, আপনাদেরকে ছবি দেব না। কিন্তু তারা না করে কাদা ছোটাছুটি করছেন। এখন কাদা ছোটাছুটি করলে তো হবে না। বাস্তব বিষয়টা মেনে নিতে হবে। আগে তো ভালো ভালো ছবি নির্মাণ করতে হবে। তারপর তো ব্যবসা। ভালো ছবি নির্মাণ না করলে তো হল চলবে না। আজকে ভালো ছবি না থাকার কারণেই সিনেমা হলের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে কাদা ছোটাছুটি করা ঠিক না।’
এদিকে সত্যিই কি হল বন্ধ করে দেওয়া হবে নাকি এটা নিছকই একটা হুমকি মাত্র? এমন প্রশ্নের জবাবে হল মালিকদের এই নেতা বলেন, ‘সিনেমা শিল্পকে বাঁচানোর লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের সমঝোতায় আমরা আগ্রহী। মূলত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমাদের এমন উদ্যোগ। অনেকেই বলছেন বঙ্গবন্ধু আইন করে গিয়েছেন হিন্দি ছবি চালানো যাবে না। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলব, আজ ৪৭ বছর পর তো অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক আইনও বদল হয়েছে। এখন তো আর সেই ৪৭ বছর আগের নিয়ম অনুসরণ করে লাভ নেই। আমরা চাই, দেশেও যাতে ভালো সিনেমা নির্মিত হয়, পাশাপাশি বিদেশি ছবিও যেন আমরা আমদানি করতে পারি। আগে তো অনেক ভালো ভালো সিনেমা বানানো হতো। এখন কেন ভালো সিনেমা বানানো হচ্ছে না।সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।’
শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রদর্শক সমিতির পরস্পর বিরোধী এমন বক্তব্য কি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে? এই সমস্যার সমাধানই বা কোথায়? এই প্রতিবেদক হাজির হয়েছিল আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও কিংবদন্তি চিত্রনায়ক ফারুকের মুখোমুখি। দেশ রূপান্তরকে নায়ক ফারুক বলেন, ‘প্রদর্শক সমিতির ঘোষণাটি আমিও শুনেছি। বেশির ভাগ পত্রিকায় হেডলাইন করেছে, সিনেমা হল বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছে তারা। আমাদের এ রকম হেডলাইনে থাকলে চলবে না। কারণ এই হেডলাইনের নিচের মূল কথাগুলোর দিকে জোর দিতে হবে। তারা কেন সিনেমা হল বন্ধের মতো ঘোষণা দিতে পারে সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের সেই সমস্যাগুলো নিয়েও ভাবতে হবে। আর সবকিছু ভেবে নিয়েই সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এর সমাধানটা কোথায়?’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাকে উভয় পক্ষের জন্যই বলতে হবে। আমাদের এখানে দুটি পক্ষ আছে, একটা হচ্ছে প্রদর্শক, আরেকটা হচ্ছে প্রযোজক। প্রযোজক পক্ষ মানেই আমরা সবাই। আমরা ১৮ সংগঠনের নামে আন্দোলন করেছি। আমি নিজেই ১৮ সংগঠনের আহ্বায়ক। কিন্তু এরা কোথায়? আলাদা আলাদা করে বলে লাভ নেই। সবাইকে একসঙ্গে বসে একসঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে এটার প্রথম সমাধান হচ্ছে ভালো ছবি বানাও। ভালো ছবি বানাতে হবে। ধরো, মানুষের একটা গান হিট হয় কীভাবে? সুর, তাল-লয়, কণ্ঠ সব ঠিক থাকতে হবে। তবেই না সেটা হিট হবে। চলচ্চিত্রেও সবগুলো দিক ঠিক রাখতে হবে।এখন তোমার তাল নাই, সুর ঠিক নাই-তাহলে তো চলবে না। তো সবাইকে সবকিছু ঠিকঠাক ভেবে নিয়ে তথ্যমন্ত্রলণালয়কে বলতে হবে। তারাই ঠিক করবে তারা কীভাবে এটা ঠিক করবে।’’
হল বন্ধের ব্যাপারে ফারুক বলেন, ‘‘কেউ বললেই কি হল বন্ধ হয়ে যাবে? সরকার কি বন্ধ করে দেবে? না। যারা বলছে তারা বন্ধ করে দিলেও বাকি বাংলাদেশে বন্ধ হবে না। আমাদের ভেতর আসলে বিষ ঢুকে গেছে। এই বিষ থেকে বাঁচার উপায় কি? এর জন্য টোটাল এফডিসির সবাইকে বসে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবার আগে প্রযোজক সমিতির নির্বাচন দিতে হবে। কারণ তারাই ছবিটা বানায়। নিয়ম আছে, যারা ছবি বানায় তারাই কেবল প্রযোজক সমিতির সদস্য থাকতে পারবে। কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যে একটা ইন্ডাস্ট্রি সেটা করতে হলে সব প্রযোজককে প্রযোজক সমিতির সদস্য করতে হবে। যারা ছবি বানান, যারা ছবি বানাচ্ছেন না তাদেরও প্রযোজক সমিতির সদস্য করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম ছবি ‘মুখ ও মুখোশে’র যে প্রযোজক তাকেও যেমন সংগঠনে রাখতে হবে তেমনি এখন যে প্রযোজক ছবি বানাচ্ছে তাকেও রাখতে হবে। যারা শুধু ছবি বানাচ্ছে তারাই কেন থাকবে? একসময় যারা ছবি বানিয়েছে তাদেরও থাকতে হবে। কারণ তাদের পরামর্শও আপনাকে নিতে হবে। কখনো নওশাদ বলে এক কথা, কখনো অন্য আরেকজন বলে আরেক কথা, চারদিক থেকে চারজন বললে হবে না। সবাইকে এক হয়ে কথা বলতে হবে।’’
সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এই সমস্যার সমাধানের উপায় জানতে চাইলে আমি বলব, ‘এগুলোর মূল বিষয় হচ্ছে ছবি বানানো। আগে ছবি বানানোর মতো ছবি বানান। অভিনয় করেন। নায়ক হয়ে ঘরে বসে থাকলে হবে না। ছবির মতো ছবি করতে হবে, অভিনয় ভালো, মেকার ভালো, গল্প ভালো- সব ভালো হলেই ছবি ভালো হবে। আর ছবির ধ্বংসের পেছনে মূল কারা? প্রদর্শকরা। কারণ তারা যদি প্রযোজককে সঠিকভাবে টাকা দেয় তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না। অডিটরিয়াম বানিয়েছেন একবার। কিন্তু ভাড়া নিচ্ছেন সারা বছর। একটা টিকিটের ফিফটি পারসেন্ট টাকাও যদি প্রযোজক পেত তাহলে আর এসব শুনতে হতো না। আর যখন এই রিটার্নগুলো চাইবে তখন তারা বলবে ভালো ছবি বানান। আমাদের বর্তমান সরকার টিকেটের ওপর টেক্স ফ্রি করে দিয়েছে। সরকার তো তার কাজ করছে । এফডিসি বানিয়ে রেখেছে। উন্নত মানের মেশিন এনে দিয়েছে। এখন ১০০টা ২কে রেজুলেশনের মেশিন দিলে সারা বাংলার সিনেমার চিত্র ঘুরে যাবে। তবে এটা করতে হবে সরকারকেই। ছবি দেখানোর ব্যাপারটা এফডিসির না। ছবি বানানোর যন্ত্র দেবে সরকার, পরিবেশ তৈরি করবে সরকার। কিন্তু ছবি বানানো ও প্রদর্শন তো আর সরকার করতে পারবে না। এর জন্য নিজেদেরই তৈরি হতে হবে। আর ইটিকেটিং ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে। এটা থাকলে সিনেমায় প্রযোজক আর লস গুনবেন না।’’
হল মালিকদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন, ‘‘হল মালিকরাও আজ দুঃখ পেয়েই এসব কথা বলছে। কারণ যা ইচ্ছে তা বানিয়ে সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তারপর ব্যবসা না করলেও সেই ছবিকে সুপারহিট তকমা দেওয়া হচ্ছে। আপনি যা ইচ্ছে করতে পারবেন না। শুধু নির্মাতারা নন, এখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও সিরিয়াসলি কাজ করেন না। শুধুমাত্র একজনের ওপর নির্ভর না করে শিল্পী তৈরি করেন। কারণ একজনের ওপর নির্ভর করলে সে ভাব নিবেই। ১০টার শিফটে আর্টিস্টের আসার কথা থাকলে সে যদি ৩টায় আসে তাহলে পরিচালক ভালো ছবি কীভাবে বানাবে? এ রকম ঘটলে তো পরিচালক ওই দিনটা ক্যান্সেল করতে পারে না। ফলে সারা দিনের কাজ নামাতে হয় কয়েক ঘণ্টায়। এত অল্প সময়ে সে ভালো ছবি কীভাবে বানাবে? ফলে আর্টিস্টদের উচিত সঠিক সময়ে আসা। আর সরকার সিনেমার উন্নয়নে ঠিকই কাজ করছে। সরকার বঙ্গবন্ধু স্টুডিও নির্মাণ করছে। ওখানে অনেক টাকা লগ্নি করছে। এসব সিনেমার জন্যই।’’
এদিকে এই অচলাবস্থা দূর করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে নায়ক ফারুক বলেন, ‘এটা এভাবে প্রেস কনফারেন্স করে বলে লাভ হবে না। চারদিকে চাররকম কথা না বলে সবাইকে একসঙ্গে হয়ে কথা বলতে হবে। সে ক্ষেত্রে সবাই যদি চায় তাহলে আমরা শিগগিরই তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বসে মিটিং করব। সেখানে প্রদর্শক ভাইদেরও থাকতে হবে। নিজেদের সমস্যাগুলো সেখানে বলতে হবে। হিন্দি সিনেমা এনে লাভ হবে না। দেশীয় সিনেমায় বানাতে হবে। আমি সংসদীয় কমিটির মেম্বার। আমি একা কিছু করতে পারব না। তথ্যমন্ত্রী মহোদয়ও একা কিছু করতে পারবেন না। এফডিসির এমডিসহ সবাইকে বসেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা না করে অযথা কথা বলে লাভ নেই। তবে শেষ পর্যন্ত আমি বলব, সবার আগে ভালো ছবি বানতে হবে। নতুন যারা ছবি বানাচ্ছে তাদের কিন্তু আলোর ঝলকানি আছে। তাহলে পুরোনোরা কি করছে? এখন তো ডিজিটাল সিস্টেম, প্রযুক্তি সবকিছু আরও সহজ করে দিয়েছে। সেটা যদি তারা আয়ত্ত না করতে পারে তাহলে তো হবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তি তো আর তেমন কিছু না। সেটা তো শিখতে হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরোনো পরিচালকদেরও কাজ করতে হবে। নায়ক-নায়িকাদেরও সঠিক সময়ে স্পটে এসে নিজের ভালোটা দিতে হবে। প্রযোজকেরা যেমন ইনভেস্ট করবেন তেমনি প্রদর্শকদেরও উচিত কারচুপি না করে পাওনাটা মিটিয়ে দেওয়া।’