রহিমা বেগমের চোখের পানি ঝরছে অঝোর ধারায়। কান্না থামছেনা। একমাত্র উপার্জনক্ষম পুত্র হারিয়ে পাগলপ্রায় তিনি। নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল-নূর মসজিদে সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত নারায়ণগঞ্জের ওমর ফারুকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর কেঁদেই চলেছেন সন্তানহারা মা রহিমা।
শনিবার রাতে নিউজিল্যান্ডে যোগাযোগ করে লাশ শনাক্ত হওয়ার পর পরিবারটির ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। দুই মাস ছুটি কাটিয়ে ১৮ জানুয়ারি ফের নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানো ওমর ফারুকের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারটি।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে ফারুকের ভগ্নিপতি সারোয়ার হোসেন ওমর ফারুকের লাশ দ্রুত ফিরিয়ে আনাসহ ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পরিবারটির উপার্জনক্ষম আর কেউ রইল না। ৩ বোনের একমাত্র ভাই ছিল এই ওমর ফারুক। স্ত্রী সানজিদা জামান নেহা ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এমতাবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিটিকে হারিয়ে সংসার চালানোর মতো আর কেউ রইল না।
বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল দেশ রূপান্তরকে জানান, ওমর ফারুক ঘটনার সময়ই মারা গেছে এটা তারা নিশ্চিত হয়েছেন। নিহত ওমর ফারুক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের শ্যালিকার মেয়ের জামাই।
চেয়ারম্যানের পুত্র রেজানুর রহমান জানান, নিউ জিল্যান্ডে অবস্থানরত ৭১ টিভির সাংবাদিক দেব চৌধুরী তাকে টেলিফোন করে ওমর ফারুকের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে।
চেয়ারম্যান মুকুল আরো জানান, তারা লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিন্টু ব্যাপারী দেশ রূপান্তর বলেন, আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছি। তবে ওমর ফারুকের মৃত্যু সম্পর্কে সরকারি ভাবে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। শুধু তাদের পরিবার দাবি করছে ওমর ফারুক মারা গেছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার রাজবাড়ি এলাকার বাবা হারা তিন বোনের একমাত্র ভাই ছিল ওমর ফারুক। পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখতে ভালো উপার্জনের আশায় ২০১৫ সালে পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডে। সেখানে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতেন।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাড়িতে ছুটিতে আসার পর একই এলাকার সানজিদা জামান নেহার সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর আবার নিউজিল্যান্ড চলে যান ওমর ফারুক। গত ১৬ নভেম্বর ছুটি নিয়ে আবারো দেশে আসেন। কিছুদিন বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে ১৮ জানুয়ারি নিউজিল্যান্ড ফিরে যান তিনি। স্ত্রী সানজিদা জামান নিহার বর্তমানে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্ত্রীর সঙ্গে তার শেষ কথা হয় বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ৫১ মিনিট আর নিউজিল্যান্ড সময় শুক্রবার সকাল ৮টার সময়। এরপর ওমর ফারুকের সঙ্গে পরিবারের আর কোন যোগাযোগ হয়নি।
শুক্রবার দুপুরে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ আল-নূর মসজিদে জুম্মার নামাজের সময় এক বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে ৪৯ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন ওমর ফারুক। শনিবার দুই বাংলাদেশির লাশ শনাক্ত হওয়ার খবর জানতে পেরে স্বজনরা যোগাযোগ করেন নিউ জিল্যান্ডে। সেখান থেকেই তারা ওমর ফারুকের নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ওমর ফারুক নিহত হওয়ার খবর শুনে একদিকে শোক, অন্যদিকে হতাশায় পড়েন পরিবারের স্বজনরা। সরকারের কাছে তারা দ্রুত দেশে লাশ ফিরিয়ে আনাসহ পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।