হেলসিঙ্কিতে কেন এত প্রশান্তি?

বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় জুড়ে তুষারপাত ও বৃষ্টিতে আবহাওয়া টালমাটাল থাকলেও হেলসিঙ্কি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত শহর।

ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কি দেশটির সবচেয়ে বড় শহরও। ছয় লাখের অধিক মানুষ নিয়ে এটি ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে জনসংখ্যাবহুল শহর।

কয়েক হাজার বছর আগেও ইউরোপের এ দেশটি ছিল বরফে ঢাকা। বরফের চাপে এখানকার ভূমি স্থানে স্থানে দেবে গিয়ে হাজার হাজার হ্রদের সৃষ্টি করে। ফিনিশরা নিজেদের দেশকে সুওমি বলে ডাকে। সুওমি শব্দের অর্থ-হ্রদ ও জলাভূমির দেশ।

এ ছাড়া দেশটি জুড়ে রয়েছে ঘন সবুজ অরণ্য। বনভূমিই দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। যার কারণে এগুলোকে প্রায়ই ফিনল্যান্ডের ভাষায় ‘সবুজ সোনা’ নামে ডাকা হয়। এ ছাড়া প্রাচীরঘেরা প্রাসাদের পাশাপাশি অত্যাধুনিক দালানকোঠাও আছে দেশটির শহরগুলোতে।

প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের প্রকোপেও ফিনল্যান্ড পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ। সেই সঙ্গে হেলসিঙ্কি হচ্ছে সবচেয়ে শান্ত শহর। পর্যটকদের মনে ছুঁয়ে দেয় প্রশান্তি।

কম কথা বলে থাকেন হিলসিঙ্কিবাসীরা। খুব একটা হইচইতে মাতেন না তারা। এমনকি পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে খেতে বসলেও তেমন একটা কথাবার্তা বলেন না তারা। নীরবেই শেষ করেন খানাপিনা। তবে এর মানে এই নয় যে পরস্পরের সঙ্গে তারা একেবারেই কথা বলতে চান না। ফিনিশরা কিন্তু যথেষ্ট হাসি ঠাট্টা করতে পারেন। তাদের কৌতুকও বেশ সমাহার। দেশটির টিভি চ্যানেলে নিয়মিত প্রচারিত কমেডি শো বেশ জনপ্রিয় তাদের মধ্যে। আসলে ফিনিশরা কম কথা বলেন এবং যা বলেন খুব ভেবে চিন্তা করে কাজের কথাই বলেন। নীরবতার কারণে হেলসিঙ্কি বলতে গেলে বেশ প্রশান্ত।

রাস্তায় রাস্তায় ও জলাধারে দেখা যায় দৌড়, স্কেটিং, গান, সাঁতার, নাচ, গ্রাফিতি চিত্রকর্ম। নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় নিজেদের ব্যস্ত রাখতে ভালোবাসেন শহরবাসীরা। রক মিউজিকের প্রতি তাদের আকর্ষণ লক্ষণীয়। দেশটিতে রয়েছে বংশ পরম্পরায় রক মিউজিক চর্চাও। ইউরোপের নামকরা বেশ কয়েকজন রক গায়ক ও সুরকারদের জন্মও দেশটিতে।  ফিনিশ বনের নির্জনতায় হেভি মেটালের সুর অন্য এক মেলবন্ধন যেন।

এই অদ্ভুত মেলবন্ধনের মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির সংযোগ। কারণ বছরের অধিকাংশ সময় দিনের প্রাধান্য থাকে দেশটিতে। সূর্য ডুবতে না ডুবতেই আবার দেখা দেয় সূর্যের আলো।

বরফ পড়া তীব্র শীতের পর গ্রীষ্মের দিনগুলো মনে ফুরফুরে নিয়ে আসলেও রাতের দেখা না পাওয়া ফিনিশদের মনে যেন অন্য এক বিষাদের জন্য নেয়। এই অনুভূতি সঙ্গে হয়তো  হার্ড রক মিউজিকের কোথাও একটা সংযোগ খুঁজে পায় ফিনিশরা।

বরফ শীতল পানির মধ্যে গোসল করা ফিনল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহ্য। নারী ও পুরুষ আলাদা হয়ে প্রায় নগ্ন হয়ে রক্ত হিম করা শীতল পানিতে ঝাঁপ মারেন ফিনিশরা। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয়। তবে যৌনক্রিয়া সম্পর্কিত কোনো সংস্কৃতি নয় এটি। এতে যৌন হেনস্তার কোনো ঘটনাও ঘটে না।

শত বছর আগ থেকে আইস সুইমিং বা বরফ পানিতে সাঁতার কাটার এ ঐতিহ্য চলে আসছে দেশটিতে। নভেম্বর থেকে মার্চের বরফ পড়ার দিনে হেলসিঙ্কির হ্রদে দেখা দেয় এই সাঁতার।  

বিশ্বের নিরাপদ রাজধানীর র‌্যাংকিংয়েও শীর্ষে থাকে হেলসিঙ্কি। অপরাধপ্রবণতা নেই বললেই চলে শহরবাসীদের মধ্যে। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতেই হয় না এখানে।