চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দুয়ার খুললো

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কাল এখন। পৃথিবীজুড়ে শুরু হয়ে গেছে এই ডিজিটাল বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার তোড়জোড়। বিপ্লবকে মহাসমারোহে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশও। রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সদ্য শেষ হলো ১৫তম বেসিস সফটএক্সপো প্রযুক্তি মেলা। মেলা ঘুরে নতুন শিল্পবিপ্লবের রূপকল্প নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

শিল্পের চার বিপ্লব

১৭৮৪ সালে প্রথম শিল্পবিপ্লবটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ডে, যখন বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছিল। এই একটি আবিষ্কারের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে। এই বিপ্লবের মাধ্যমেই প্রথম ঘুরছিল ইঞ্জিনের চাকা। স্থাপিত হয় কল-কারখানা, চালু হয় রেল। যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আগের চেয়ে কয়েক শ গুণ গতি বৃদ্ধি পেয়েছিলেন মানুষে। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবটি অনুষ্ঠিত হয় প্রথম শিল্পবিপ্লবের ৯৬ বছর পর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে। আর তৃতীয় শিল্পবিপ্লবটি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয়টির ৯৯ বছর ১৯৬৯ সালে যখন ইন্টারনেট আবিষ্কার হয়। শিল্পবোদ্ধারা বলছেন, পৃথিবীজুড়ে শুরু হয়ে গেছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবও। এই বিপ্লবের অন্য নাম ডিজিটাল বিপ্লব।

শুরু হয়ে গেছে?

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব কি বাংলাদেশেও শুরু হয়ে গেছে? বেসিস সফটএক্সপো প্রযুক্তি মেলার প্রথম দিনে বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখার এক ফাঁকে মৃদু হেসে এই উড়ো প্রশ্নটির জবাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বললেন, ‘অনেক আগেই শুরু হয়েছে।’ মেলা ঘুরে এর প্রমাণও পাওয়া গেল। আর এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এটি মেলা না ঘুরেও বোঝা সম্ভব। গত এক দশক আগের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আর বর্তমানের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল ফারাক। এ সময়ের মধ্যেই যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ঘটে গেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। কেউ চাইলেই এখন নিমেষে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করতে পারছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের হাতে হাতে চলে এসেছে স্মার্টফোন। এই স্মার্টফোনে আসছে নিত্যনতুন ডিজিটাল ফিচার। আমরা চাইলেই ঘরে বসেই অ্যাপস ব্যবহার করে উবার কিংবা পাঠাও কল করছি। বাজারে না গিয়েও হাতের নাগালে চলে আসছে পছন্দের পণ্য। মানিব্যাগে আমরা অনেকই এখন আর টাকা রাখি না, আমাদের সব টাকা ক্রেডিট হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ব্যাংকের এটিএম কার্ডে। কার্ড ব্যবহার করেই আমরা এখন লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। অনলাইনে গ্রাহক হচ্ছি পৃথিবীর নামিদামি সব পত্রিকা কিংবা নেটফ্লিক্স সিনেমা হলের মতো অপরাপর অনেক কিছুর। গত এক দশকের এই পরিবর্তনটিই ডিজিটাল পরিবর্তন। তাই এ কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই, আমরা আমাদের অগোচরেই ডিজিটাল বিপ্লব তথা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অংশ হয়ে গেছি। তো এই বিপ্লব আমাদের দেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কত দূর এগিয়েছে, তা বোঝার জন্যই বেসিস সফটএক্সপো মেলা ঘুরে দেখা।

মেলা প্রাঙ্গণ

রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটির চারটি সুবিশাল হলজুড়ে বেসিস সফটএক্সপো মেলার বিস্তৃতি। চারটি হলে দশটি জোনে ভাগ হয়ে মেলাটি অনুষ্ঠিত হলো। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর পিছু ধাওয়া করে চতুর্থ হলটিতেই সবার প্রথম প্রবেশ করল এই প্রতিবেদক। হলজুড়ে বিভিন্ন স্টলে পরিদর্শন আর ফটোসেশন করছিলেন প্রতিমন্ত্রী। রং-বেরঙে সাজানো বিভিন্ন স্টল আর ওই সব স্টলের প্রমোটরদের হাসিমুখ আহ্বানে হারিয়ে ফেললাম প্রতিমন্ত্রীকেই। মেলায় ঘুরতে ঘুরতেই বোঝা গেলÑ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের আধুনিক জীবন পাড়ি দিলেও এই শিল্প সদ্যই বিকাশ হতে শুরু করেছে আমাদের দেশে। উন্নত বিশে^র সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবার আমাদের নিজস্ব ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই লক্ষ্য। এ লক্ষ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বেসিস সফটএক্সপো মেলা। দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দান এবং পরিচিতি তুলে ধরতেই মেলার আয়োজন।

যা দেখা হলো

মেলায় হঠাৎই চোখ পড়ল ‘গুলি মার কোচিং’ এই ব্র্যান্ডিংয়ে। এই সেøাগানকে সামনে রেখেই যাত্রা শুরু করেছে ‘এডুটিউব’। আমাদের কোচিংনির্ভর পাঠ্যক্রম থেকে শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসতেই অনলাইনভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান। এডুটিউব স্টলের প্রমোটর তন্মনা তৌহিদ শ্রাবণী জানালেন, তারা অনলাইনে এমন একটি প্ল্যাটফরম তৈরি করছেন, যেখানে শিশুরা ঘরে বসেই বিনামূল্যে ক্লাস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। শুধু শিশু নয়, বড়দের উপযোগী বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমও শুরু করেছে তারা।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একদল শিক্ষার্থীর আয়োজন বেশ চোখে পড়ার মতো। তারা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ল্যাবে তৈরি করে ফেলেছে একটি রোবট। তাল-লয়ে কোনো ভুল না করে একটি মিউজিকের সঙ্গে দিব্যি নেচে চলেছে ওই রোবট। আর তার সব কাজকর্মই নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল শুধু মুখের ভাষায়।

মেলায় ছিল আইপের স্টলও। এটি মূলত একটি ভার্চুয়াল ওয়ালেট। প্রতিষ্ঠানটি বিশ^াস করে শিগগিরই পৃথিবী থেকে কাগুজে মুদ্রাব্যবস্থা উঠে যাবে। সে ক্ষেত্রে অর্থের লেনদেন থেকে শুরু করে কেনাকাটায় এ ধরনের ওয়ালেট বা মানিব্যাগই হয়ে উঠবে ভরসা। একটি অ্যাপসের মাধ্যমে আইপে তার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। মেলায় যারা আইপে নিবন্ধন করছিল তাদের জন্য ছিল ৫০ টাকার প্রণোদনা অফার। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকের সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে।

ড্রিমার ল্যাব জেড ল্যাবের কার্যক্রম সত্যিই বিস্ময়কর। আমরা ভার্চুয়াল রিয়ালিটির যেসব এআর ভিআর প্রযুক্তির কথা শুনি, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেসব নিয়েই কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের সিইও তানভীর হুসেইন খান। নিজ মুখেই জানালেন তার প্রতিষ্ঠানের উত্থানের কাহিনী। তিনি আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর যখন ক্যারিয়ার শুরু করতে যাবেন, তখনই ঘটে বিপর্যয়। কারণ সে সময় তার বাবা মারা গিয়েছিলেন। বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্নও ছিল তার। কিন্তু এসবের কোনো কিছু না হওয়ায়, এক্সপার্ট বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে গড়ে তুললেন ড্রিমার জেড ল্যাব। এই ল্যাবের অ্যাপস ব্যবহার করে আপনি ঘরে বসেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন আকৃতির ফার্নিচার ভার্চুয়ালি আপনার নিজের বাসায় স্থাপন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে দোকানে গিয়ে কোনো পণ্য কিনে বাসায় এনে তা যদি মানানসই না হয়, কিংবা কোনো কারণে পছন্দ না হয়, তবে তা ফেরত দেওয়ার ঝক্কি-ঝামেলা থেকে বাঁচাবে ড্রিমার জেড ল্যাবের অ্যাপস। কোনো ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনতে চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই ভার্চুয়ালি আপনি চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারবেন ওই গাড়িটি। আপনি খুব কাছ থেকেই গাড়ির বিভিন্ন অংশ এমনকি এর ভেতরের অংশও দেখে নিতে পারবেন। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর মার্কেটিংয়ে বিপ্লব নিয়ে আসবে ড্রিমার জেড ল্যাবÑ এমনটাই আশা করছেন তানভীর। কারণ তাদের অ্যাপসের মাধ্যমে কোনো একটি ভবনের স্থাপত্যশৈলী থ্রি-ডি অ্যাঙ্গেলে দেখতে পারবেন গ্রাহক। শুধু তা-ই নয়, ওই ভবনের প্রত্যেকটি কক্ষে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখারও অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন তারা। তাই কোনো ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে সেখানে গিয়ে তা দেখার আর দরকার নেই। ঘরে বসেই এটি সেরে নেওয়া যাবে এখন।

মেলার বিভিন্ন স্টলের মধ্যে সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন করপোরেট অফিসের হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনা করার জন্য অসংখ্য সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে দেশে।

আপনি তৈরি তো?

ডিজিটাল শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ব্যাপারটি প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। এটি নিয়েও কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। ‘বিটলস’ দ্য হ্যাকার অ্যাপ্রোচ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও সাধারণ মানুষকে নতুন শিল্পবিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তুলতে বেশ কিছু প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠানেরও উপস্থিতি ছিল মেলায়। বেসিসের ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম। আরও ছিল ইউওয়াই ল্যাব। মেলায় ই-কমার্সভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টলও ছিল চোখে পড়ার মতো। ওম্যান জোনে নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন স্টল স্থান পেয়েছিল। এসব উদ্যোক্তার মধ্যে রাকশান্দা রুখামের প্রিনিউর ল্যাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বেশ কিছু অ্যাপস আছে এই প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে গ্রামীণ নারী শক্তিবিষয়ক ‘বেগম’ অ্যাপসটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ‘ওম্যান ইন ডিজিটাল’, উদ্যোক্তা তানিয়া সুলতানার ‘সিনার্জি ইন্টারফেইস’, তানিয়া চৌধুরীর ‘তালহা ট্রেইনিং’, সাবিলা ইনুনের ‘ডিসিএস্টালিয়া’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াই আগামীর লক্ষ্য। এমন পরিস্থিতিতে বলাই যায়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দুয়ার উন্মোচনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। আপনি তৈরি তো?