চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা চলছেই জরিমানাতেই খালাস দায়ীরা

নগর ও এর বাইরে অবাধে পাহাড় কাটা চললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জরিমানা করেই দায় সারে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর। মাঝেমধ্যে মামলা হলেও এর সংখ্যা নগন্য, নিষ্পত্তি হওয়ার সংখ্যা তো আরও কম। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার দায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিগত ১৬ বছরে মাত্র ৪৩টি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে তিনটির। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২৫টির, তদন্ত চলছে ১৫ মামলার। অধিদপ্তরের এই ঢিলেঢালা অবস্থানের ফলে পাহাড় কাটা থাকছে না।

গত এক বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে নতুন কোনো মামলা করেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। সর্বশেষ গত ৬ মার্চ সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ডে পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় পরিবেশ অধিদপ্তর। এ অপরাধে মাত্র চার লাখ টাকা জরিমানাতেই পার পায় প্রতিষ্ঠানটি। ২৭ ফেব্রুয়ারি বায়েজিদ বোস্তামীর চন্দ্রনগর এলাকায় পাহাড় কাটার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি জেড ‘এ’ আবাসিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

গত বছর ডিটি-বায়েজিদ সংযোগ সড়ক নির্মাণে অনুমোদন ছাড়াই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (সিডিএ) পাহাড়তলী অংশে ১৫টির মতো পাহাড় কাটে বলে প্রমাণ পায় অধিদপ্তর। এ জন্য সিডিএকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। আর বেসরকারি পর্যায়ে খুলশী ক্লাবকে পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানা করে মাত্র দুই লাখ টাকা।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৬ বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে হওয়া মামলার বেশির ভাগই বায়েজিদ ও খুলশী এলাকায়। এ ছাড়া ষোলশহর, ফয়স লেক, আকবর শাহ, লালখান বাজার, পাহাড়তলী ও পলিটেকনিক এলাকায় পাহাড় কাটা চলছে। বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান নির্বিচারে পাহাড় কাটছে। আকবর শাহ লেক সিটি আবাসিক, বায়েজীদের কুঞ্জছায়া আবাসিক, ওয়্যারলেস কলোনির পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং, গ্রিনভ্যালী হাউজিংসহ আরও বেশ কয়েকটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অভিযোগ করা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।

কুসুমবাগ, কাইচ্যাঘোনা, উত্তর পাহাড়তলীর বিশ্ব কলোনি, মক্কীঘোনা, বাটালি হিল, লালখান বাজার মতিঝর্ণা, প্রবর্তক পাহাড়, গোলপাহাড়, বন গবেষণাগার সংলগ্ন পাহাড়, জয়পাহাড়, রেলওয়ে এমপ্লয়িজ গার্লস স্কুল পাহাড় এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনা ও অবৈধ বসতি। আর নগরীর আকবর শাহ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়, ফয়স লেক আবাসিক এলাকা পাহাড়, গরীবুল্লাহ শাহ্ মাজারের পাশে বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি পাহাড়, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকাসংলগ্ন পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে মুরগির খামার, মাছের প্রকল্প, ঘর ও দোকান।

নামমাত্র জরিমানা, মামলা পরিচালনায় ধীরগতির সুযোগ নিচ্ছে পাহাড়খেকো চক্র। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পেলে শুরুতে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে শুনানি শেষে জরিমানা করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাহাড় কাটা ঠেকাতে বিভিন্ন অভিযান এবং জরিমানা অব্যাহত আছে।’

এ পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের করা মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া তিনটি হলোÑ২০০৭ সালে পাঁচলাইশ থানায় নগরীর হিল ভিউ এলাকায় পাহাড়কাটার দায়ে মিরসরাইয়ের মিঠারছড়ির জামাল উদ্দীনের বিরুদ্ধে করা মামলা, একই বছর ১৫ এপ্রিল খুলশী থানায় নাছিরাবাদ এলাকার আশরাফ জামানের বিরুদ্ধে করা মামলা এবং ওই বছরের সেপ্টেম্বর আকবর শাহ আবাসিক এলাকার পান্থনগর বাই লেনের বাসিন্দা খোরশিদ জাহানের বিরুদ্ধে করা মামলা। ১০ বছর পর প্রথম দুটি মামলা নিষ্পত্তি হয়। আদালত অপরাধীদের এক বছর করে কারাদণ্ড দেন। আর শেষ মামলায় খোরশিদ জাহানকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। মামলা ও এর দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, ‘মামলার চার্জশিট দেওয়া পর্যন্ত আমাদের মূল কাজ। এর পরের বিষয় আদালতের। এরপর যদি আরও তদন্তের প্রয়োজন হয় তখন আবার তদন্ত করে জানাতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তরের জনবল কম হওয়ায় অভিযান, মামলা, প্রতিবেদন তৈরি করতে বেগ পোহাতে হয়। তবে পাহাড় কাটার সংবাদ পেলেই আমরা অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

পাহাড় কাটার অভিযোগে সর্বশেষ মামলাটি হয়েছে ২০১৮ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি বায়েজিদ থানায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী বাদী হয়ে বায়েজীদ বোস্তামির পূর্ব নাসিরাবাদ মৌজার খাসজমির পাহাড় কাটার অভিযোগে হাসান জাহিদুল ইসলাম বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। এ বিষয়ে তাহাজ্জুত বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। মামলার সাক্ষী অনেক সময় আসতে চায় না, আবার অনেক তদন্তকারী কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় বিচারকাজে বিলম্ব হয়।’