মুক্তিযোদ্ধা তারকারা

একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের আপামর জনতা। তাদের মধ্যে ছিলেন তারকারাও। অনেকে অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে না পারলেও অনেকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন। এমনই তিন তারকার গল্প নিয়ে এই আয়োজন
ভারতে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সময় আমিও ছিলাম

শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়

নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যপরিচালক

যুদ্ধের সময় আমরা থাকতাম চট্টগ্রামের রাউজানে। আমাদের এলাকার পরই পাহাড়ি এলাকা। যুদ্ধ শুরু হলে আমাদের পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যে যা পারছে তা নিয়ে ভারতের দিকে ছুটছে। আমরাও সপরিবারে ভারতের পথে রওনা হলাম। সবাই বলছিল ভালো কাপড়চোপড় পরা থাকলে সমস্যা হতে পারে, তাই হাতের কাছে ছিল সবুজ রঙের প্রায় রংচটা স্কুল ড্রেসটি। ওটা পরেই রওনা দিয়েছিলাম। অমানুষিক কষ্ট করতে হয়েছে সে সময়। রাঙ্গামাটি পাহাড় পেরিয়ে ৮৫ মাইল হেঁটে সাব-রুম বর্ডার দিয়ে অবশেষে আগরতলা পৌঁছেছিলাম। টানা ১০ দিন এক কাপড়ে ছিলাম। শিয়ালদহ স্টেশনে নেমেছিলাম খালি পা আর উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে। সেখান থেকে কলকাতা যাই।

সে সময় যেসব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কলকাতায় চলে গিয়েছিলেন, তাদের দিয়ে ভারতীয় শিল্পীদের সহায়তায় কলকাতায় ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তুলেছিলেন সন্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক। মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার খবর পেলাম শিল্পী স্বপন চৌধুরীর কাছে। আমি ও আমার দুই বোন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। আমি তখন নিয়মিত গান শিখতাম। তাই আমাকেও সেই দলে নিয়ে নেন সন্জীদা আপা। এই দলের হয়ে আমরা তখন ১০টি গান গেয়েছিলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। তার মধ্যে রয়েছে জনতার সংগ্রাম চলবেই, একি অপরূপ রূপে মা তোমার, ফুল খেলবাম দিন নয় ইত্যাদি। বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প ও শরণার্থীশিবিরে গিয়ে তাদের গান শোনাতাম আমরা। যাতে মুক্তিযোদ্ধা ও উদ্বাস্তুরা আরও উদ্বুদ্ধ হয়। এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আমরা অনুষ্ঠান করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করতাম।

কলকাতার ১৪৪ লেলিন সরণিতে আমরা প্রায়ই জড়ো হতাম। সেখান থেকে নির্দেশনা পেতাম আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর আজীবন স্মৃতির পাতায় অম্লান থাকবে। ওই দিনও লেলিন সরণিতে গেলাম। গিয়ে শুনলাম ভারত আমাদের স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। কলকাতা মিশনে প্রথম উঠবে বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা। আমাদের সেই অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে। আমরা সেখানে গেলাম এবং দেশের স্বাধীন পতাকা প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে উত্তোলনের মুহূর্ত গাইলাম ‘আমার সোনার বাংলা...’। এই অনুভূতির সঙ্গে আর কোনো কিছুর তুলনা হবে না।

সোনার বাংলার পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

সুজেয় শ্যাম

সংগীতজ্ঞ

যে স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু, আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছিলাম, আমাদের সেই স্বপ্ন কিন্তু আজও পূরণ হয়নি। কারণ রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যেমন ঐক্যবদ্ধ ছিল, ঠিক তেমনি তারা এত বছর পরও ঐক্যবদ্ধ আছে। কিন্তু আমরা যারা দেশ স্বাধীন করার চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তারা নানাভাবে নানা নামে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে বিভক্ত হয়ে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে আমরা ইতিহাস রচনা করছি। এসব দেখে সত্যিই খুব কষ্ট হয়। আমরা মুখে বলি বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি কিন্তু অনেকেই তা অন্তরে লালন করি না। আমরা অনেকেই নিজেদের স্বার্থের দিকেই বেশি খেয়াল রাখছি, যা আদৌ উচিত নয়। আমি রাজনীতি করি না, তবে সত্যিকার অর্থে মন থেকে ভালোবাসি বঙ্গবন্ধুকে। তিনি যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন হয়তো এক দিন পূরণ হবে আর তা হয়তো হবে বর্তমান প্রজন্মের হাত দিয়েই। আমরা হয়তো দেখে যেতে পারব না। তবে এই শান্তি নিয়ে যেন মরতে পারি, বাংলাদেশ সোনার বাংলার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

৯ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছি

জিয়াউল হাসান কিসলু

অভিনয় শিল্পী

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি ৯ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছি। আমাদের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জলিল। আমরা তো আসলে একটা চেতনার জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। এই সময়টাতে দাঁড়িয়ে আমি বলব, আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনার জায়গায় দাঁড়াতে হলে আমাদের আরও সংগ্রাম করতে হবে। একটা সাম্যবাদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম। যেখানে গরিব-ধনী সবার দেশ হবে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন আমরা দেখি কেবল একটা শ্রেণিই ফুলেফেঁপে বড়রলাক হয়ে উঠছে। অন্যদিকে অনেক মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এটা কাম্য নয়। তবে স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। এটা আমাদের জন্য ভালো খবর। স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তীতে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার প্রাণের বাংলাদেশের কাছে চাওয়া থাকবে। বাংলাদেশ হবে সব মানুষের। এখানে কেউ টাকার পাহাড় গড়বে, কেউ খাবারের খরচ জোগাতে পারবে না এটা দেখতে চাই না। সমতার ভিত্তিতে সব নাগরিক, সব জাতি-সম্প্রদায় মিলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে ভিত্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এটাই চাওয়া। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা থাকবেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেই দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করবেন।