ফেসবুক বন্ধুর ফাঁদে ৯০ লাখ টাকা খোয়ালেন পঞ্চাশোর্ধ নারী

স্বামী মারা গিয়েছেন বছর দুয়েক আগে। ছেলে এবং মেয়েও থাকতেন দূরে। একাকী বাসায় থাকতেন তিনি। বেশ সচ্ছল পরিবার। স্বামী ছিলেন দেশের একটি প্রথম সারির বেসরকারি সংস্থার শীর্ষ স্থানীয় কর্তা। সেই সুবাদে অবসরকালীন ভাতাসহ বেশ ভালো অঙ্কের টাকা ছিল ব্যাংকে। এভাবে বেশ সুখেই বসবাস করছিলেন একান্ন বছর বয়সী ওই নারী।

ছেলে এবং মেয়ে দূরে থাকায় তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি আইডি খুলেন তিনি। পরে সেখানেই এক ব্যক্তির সঙ্গে তার আলাপ হয়। কিন্তু, সেই আলাপেই যে তার ৯০ লাখ টাকা খোয়া যাবে, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তিনি!

গত ২৩ মার্চ কলকাতা পুলিশের সাইবার অপরাধ থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন ওই মহিলা।

অভিযোগে এই নারী জানিয়েছেন, এ বছরের গোড়ার দিকে ফেসবুকে মণীশ কুমার নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার আলাপ হয়। মণীশ কুমার নিজেকে ইংল্যাণ্ডের বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তিনি একজন পাইলট।

অভিযোগ, সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই মণীশ কুমার এক দিন ওই নারীকে জানান যে, তিনি কিছু প্রসাধন সামগ্রী পার্সেল করে পাঠিয়েছেন উপহার হিসাবে।

মণীশ ওই মহিলাকে একটি বেসরকারি ভারতীয় ব্যাংকের জয়পুর শাখায় জনৈক সেলিম খানের অ্যাকাউন্টে ৪৫ হাজার টাকা জমা করতে বলেন। ওই পার্সেল ছাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় শুল্ক হিসাবেই ওই টাকা জমা করতে বলা হয়।

গত ৮ মার্চ সেই টাকা জমা করে দেন তিনি। এর পরে মণীশ ফের তাকে জানান আসলে ওই পার্সেলে প্রসাধন সামগ্রী নয়, আছে প্রায় ৭০ হাজার ডলার মূল্যের গয়না। ভারতীয় মুদ্রায় যা ৪৮ লাখেরও বেশি। মণীশ ওই মহিলাকে জানান, পার্সেলে থাকা গয়নার হদিশ পেয়ে গিয়েছেন শুল্ক দপ্তরের কর্তারা। তাই স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে টাকা দিতে হবে ওই পার্সেল ছাড়াতে।

কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম থানার তদন্তকারীদের সূত্র জানিয়েছে, মণীশের কথা বিশ্বাস করে পরবর্তী দু’সপ্তাহে দফায় দফায় সাড়ে ৮৯ লাখ টাকা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ১১টি আলাদা আলাদা ব্যাংকে জমা করেন ওই মহিলা। তার পরেও পার্সেল না আসায় তিনি বুঝতে পারেন যে, প্রতারিত হয়েছেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রতারকেরা গোটা বিষয়টি আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ফোন এবং ইমেলও করে।

তদন্তে নেমে পুলিশ এখন পর্যন্ত ১১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হদিশ পেয়েছেন যেখানে ওই টাকা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি মিলেছে দু’টি ফোন নম্বর, যে নম্বর থেকে ব্যাংক অব আমেরিকার প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ফোন করা হয়।

তদন্তকারী দল অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছে, এ ধরনের প্রতারণার পেছনে থাকে নাইজেরীয় জালিয়াতরা। অ্যাকাউন্টগুলো ভাড়া নেওয়া হয়। টাকা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট অঙ্কে ওই টাকা আবার চলে যায় অন্য অ্যাকাউন্টে। তাই ওই অ্যাকাউন্টের মালিকদের হদিশ পেয়েও খুব একটা লাভ হয় না। প্রতারণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওই জালিয়াতরা টাকা নিজেদের দেশে পাঠিয়ে দেয়। তাই টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা কমে যায়।

একই ধরনের পর পর ঘটে যাওয়া কয়েকটি অপরাধের ঘটনা থেকে তদন্তকারীদের একাংশ মনে করছেন, জালিয়াতরা সোশ্যাল সাইটে ওই মহিলার মতো ‘একাকী’ মানুষদেরই বন্ধুত্বের টোপ দেয়।

সাইবার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ফেসবুকের মতো সোশ্যাল সাইটে নিজের সম্পর্কে বেশি তথ্য না দেওয়াই ভাল এবং মনে রাখা উচিত ভার্চুয়াল জগতে ভুয়া পরিচয়ে প্রোফাইল তৈরি করা এমন কোনও কঠিন বিষয় নয়!