২ অন্ধ হয়েও নারীর পাশে

চোখে দেখেন না জন্মের পর থেকে। মা-বাবার সাহায্যে মারজিয়া রব্বানি ভালো ছাত্রের মতোই ফল করেছেন।  এলএলবি পাস করে ফরিদপুরের আদালতে অসহায় নারী, শিশুর মামলা লড়ছেন। এই আইনজীবীকে নিয়ে লিখে, ছবি তুলেছেন শেখ মফিজ শিপন

ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম হলো। তবে সেই খুশির হাসি কিছুক্ষণের মধ্যে ফিকে হয়ে গেল। চমকে গেলেন মা-বাবা। অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানি মৃধা বাবু দেখলেন, তার এই মেয়ে জন্মগতভাবে অন্ধ। মেয়ের চোখের আলো ফিরিয়ে আনতে অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন, অনেকের পরামর্শও নিলেন। তবে কেউই মেয়ের চোখের আলো ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো আশা দিতে পারলেন না। ভেঙে পড়লেন না তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন, এই মেয়েকেই মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার জীবনে আলো এনে দেবেন। সেই থেকে শুরু হলো এই পরিবারের নতুন এক যুদ্ধ। মা আফরোজা রব্বানি সবসময়, জীবনের সব কাজে মেয়েকে বন্ধুর মতো পরামর্শ দিতে লাগলেন। পাখির ছানার মতো আগলে রাখতে শুরু করলেন। মারজিয়া রব্বানি শশীকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। তারা ফরিদপুর শহরের মানুষ। শহরের খাবাসপুর এলাকার মহাখালী পাঠশালায় লেখাপড়ার শুরু তার। এরপর মাহিম স্কুলে ভর্তি হলেন। এই স্কুল থেকেই ২০০৯ সালে এসএসসি পাস। ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো। তিনি ৪.৭০ সিজিপিএ নিয়ে এসএসসি পাস করেছেন। বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রীটি ভর্তি হলেন বিখ্যাত সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজে। সেখানেও ভালো ফল নিয়ে পাস করেছেন। তার সিজিপিএ ৪.২৫। কীভাবে লেখাপড়া করেছেন? শশী বললেন, ‘আমাকে মা সবসময় স্কুলে আনা-নেওয়া করেছেন। কখনো অন্য বোনেরা স্কুলে দিয়ে এসেছেন। বন্ধুদের সঙ্গেও স্কুল থেকে ফিরেছি।’ চোখে দেখতে না পারলেও কোনোদিনই অযথা কোনো কারণে স্কুল কামাই দেননি। নিয়মিত লেখাপড়া করেছেন। কীভাবে পড়েছেন সেই গল্পটি জানা গেল তার কাছে, ‘আমার জীবনের মেন্টর আমার মা। তিনি বাসায় বই দেখে দেখে পড়তেন, আমি সেগুলো আত্মস্থ করে নিতাম। বাবা প্রয়োজনে পড়া দেখিয়ে দিয়েছেন। স্কুলের শিক্ষকরা সাহায্য করেছেন। বাসায় শিক্ষক রেখে হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজির মতো জটিল বিষয় বুঝে নিতে হয়েছে।’ পরীক্ষার খাতায় লেখার কৌশল? ‘আমাকে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে সহ-লেখক নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তরগুলো মুখস্ত বলে গেছি। তিনি সেগুলো খাতায় লিখে দিয়েছেন। বিনিময়ে তাকে সম্মানী দিতে হয়েছে।’ ভবিষ্যৎ জীবনে কী হবেন এই প্রশ্নটি যখন সামনে এলো, বাবার পথই অনুসরণ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন শশী। তার বাবা ফরিদপুর জেলা জজকোর্টের বিখ্যাত আইনজীবী। বাবাকে সবসময় মামলা নিয়ে পড়ে থাকতে দেখতেন, যেকোনো বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখে অভ্যস্ত বলে মেয়েও সিদ্ধান্ত নিলেন, আইন পেশাতেই যাবেন। আরও একটি কথা তার মনে হলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলে তো অন্য কোনো পেশাতে যেতে পারবেন না। তার প্রয়োজন স্বাধীন ও সৃজনশীল পেশা, যেখানে নিজের মেধা ও অর্জনকে কাজে লাগাতে পারবেন। ফলে ‘এলএলবি’ পড়বেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।

চলে এলেন ঢাকায়। একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে এলএলবিতে ভর্তি হলেন। বাবা মেয়ের জন্য ভালো ক্যাসেট রেকর্ডার কিনে নিয়ে এলেন। তার চার বছরের সঙ্গী হলো এই ক্ষুদে যন্ত্রটি। শ্রেণিকক্ষে স্যার, ম্যাডাম যখন আইনের ধারা, উপ-ধারা কিংবা জটিল কোনো মামলার উদাহরণ দিয়ে তাদের পাঠ দিতেন, তিনি সেগুলো যতটা পারেন খাতায় নোট করে নিতেন। বসতেন এমন কোনো জায়গায়, যেখানে থেকে স্যারের কথাগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ক্লাস শেষে সেই রেকর্ডার নিয়ে এসে রুমে ফিরে সেগুলো ভালোভাবে শুনতেন। শুনে শুনেই মুখস্ত করে ফেলতেন আইনের পড়া। এভাবে যুদ্ধ করে এলএলবি পাস করলেন চার বছরে। বাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত মা ফোন করে মেয়ের খোঁজ নিতেন। তাকে উৎসাহ দিতেন, জীবনের স্বপ্নগুলো তার বুকে বুনে দিতেন। বাবা যতটা পারতেন, মেয়ের সমস্যার সমাধান করতেন।

এরপর বাবার জুনিয়র উকিল হিসেবে ফরিদপুর জেলা জজ কোর্টে কর্মজীবন শুরু করলেন মারজিয়া রব্বানি। এখনো তার সেই দিনটির কথা স্পষ্ট মনে আছে ২০১৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে এক অসহায় নারীর পক্ষ হয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন। মামলাটি ছিল যৌতুকের। জজ সাহেবের সামনে মামলার যুক্তিগুলো উপস্থাপন করলেন। সেই মামলা থেকে প্রথম দিনই ৫শ টাকা সম্মানী হিসেবে আয় করলেন। তাতেই তার বোধ বদলে গেল। আমিও আয় করতে পারি কথাটি মনে গেঁথে গেল। এই মামলা তাকে আরও অনেক কিছু দিল। আদালতের সবাই তাকে সাহায্য করলেন। এমনকি বিপক্ষের আইনজীবীও মানবিক কারণে এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আইনজীবীকে সাহায্য করলেন। শুরু হলো তার নতুন জীবন। নারীর পাশে দাঁড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবাও তাতে সায় দিলেন। অ্যাডভোকেট গোলাম রব্বানির কাছে যৌতুক, নারী নির্যাতনের যে মামলাগুলো আসে, সেগুলো তিনি মেয়েকে বুঝিয়ে দিলেন। প্রথম মামলাটিও অ্যাডভোকেট মারজিয়া রব্বানি এভাবেই পেয়েছিলেন। বাল্যবিবাহ রোধ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, মাদক, হত্যা, শিশু নির্যাতনÑ এই ধরনের মামলাগুলোর দিকেই তার বেশি আগ্রহ। তাতে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, সমাজের উপকার করা সম্ভব হয়। এই তরুণ আইনজীবী জানালেন, এখন তার কাছে এই ধরনের মোট ১০টি মামলা আছে। সেগুলো নিয়ে আদালতের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি ফরিদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সক্রিয় সদস্য। আইনের এই জীবনের পেছনে বাবার অবদানের কথা বারবার বললেন, ‘বাবাই আমাকে আইনজীবী হিসেবে গড়ে দিচ্ছেন। তিনি ফরিদপুর জেলা জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী, ফরিদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য। রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত আছেনÑ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।’

মা-বাবা তাকে কেবল জীবনে প্রতিষ্ঠিতই করে দেননি, তার ব্যক্তিগত জীবনও গুছিয়ে দিয়েছেন। মাগুরা জেলার বিনোদপুরের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তাকে বিয়ে দিয়েছেন। তারা বেশ ভালো আছেন, লাজুক হেসে বললেন শশী।

জীবনের গল্প করতে করতে শশী বললেন, ‘আমার দুই বোন স্বাভাবিক মানুষ। বড় বোন মারিয়া রব্বানি গৃহিণী, ছোট বোন আবিদা রব্বানি চীনের একটি মেডিকেল

বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষের এমবিবিএসের ছাত্রী। তারা আমাকে সর্বোচ্চ সাহায্য করেছে।’  ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী হতে চান তিনি। সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য অধিকারের লড়াই করবেন, নারী হয়ে অসহায় নারীর পাশে দাঁড়াবেন। তবে এত সব স্বপ্ন নিয়ে এখনো তার জীবনযুদ্ধ শেষ হয়নি। তার দুটি কিডনিই কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অকেজো হয়ে গেছে। সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করে তিনি বেঁচে আছেন। মানুষের দোয়াই এখন তার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল।