দীপ জ্বেলে যায়

বাঁশের চাটাইয়ে, তারা মাটিতে বসে পড়ালেখা করে। রোল নম্বর নেই। ৫০ পেলে পাস। নীতি শেখে, লাইব্রেরিতে বই পড়ে। স্কুলে তাদের পণ্য কেনা-বেচার দোকান আছে। স্কুলটি ঘিরে কম্পিউটার ও সেলাইয়ের কাজ শিখে বদলে যাচ্ছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার অনেকের জীবন। রুদ্রপুর গ্রামের ‘দীপশিখা মেটি স্কুল’, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে, লিখে, ছবি তুলেছেন আব্দুল মোমেন

স্কুলটি সকাল ৯টায় শুরু হয়। ততক্ষণে সব ছাত্রছাত্রী চলে আসেন। বিশাল হলঘরে তাদের নীতিশিক্ষার ক্লাস ‘দিশালয়’ শুরু হয়। প্রতিজ্ঞা করানো হয়Ñ কখনো মিথ্যা বলব না, অন্যের কিছু পেলে লুকিয়ে ফেলব না, বরং ফেরত দেব ইত্যাদি। এ ক্লাসে তারা ধ্যান করে মনস্থির করা শেখেন, আশপাশের ভালো, খারাপ খবর জানলে অন্যদের জানান। ৩০ মিনিট পেরিয়ে যায়, তারা ক্লাসে যান। অন্যরকম এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক কল্পনা রানী রায় বললেন, ‘প্রচলিত লেখাপড়ার বাইরে ছাত্রছাত্রীদের ২৪টি অতিরিক্ত কাজ শেখাই। সেগুলোর মধ্যে আছেÑ গ্রাম পরিদর্শন, শিক্ষা সফর, শিক্ষামেলা, ভবিষ্যৎ পেশার আলোচনা, স্কুল লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া, কম্পিউটার ক্লাস, নাচ-গান, হাতের কাজ, ছবি আঁকা শেখা, দেয়ালিকা প্রকাশ, যেকোনো কাজে সতেজ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেওয়া, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, ছবি আঁকা।’ এসব কাজ ও লেখাপড়ার মাধ্যমে গ্রামের এই ছেলেমেয়েদের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। সে গল্প করলেন সুনামির (১০ম শ্রেণি) ছাত্র দিপু দেব শর্মা, ‘আমাদের স্কুলে শেখার শেষ নেই। ক্লাসের বই তো পড়িই, আমরা আরও অনেক কাজ শিখি। অন্য কোথাও এগুলো শেখানো হয় না।’ টাইফুনের ছাত্রী ইন্দ্রাণী রানী রায় বললেন, ‘আমাদের অতিরিক্ত শিক্ষা সহায়করা শিক্ষা সহায়কদের মতো আন্তরিক। দীপশিখার বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকরাও কখনো আমাদের ক্লাসে আসেন।’

তাদের এই মাটি, বাঁশের স্কুলে মোট ১২টি শ্রেণিকক্ষ আছে। সেগুলোর নামও অন্য স্কুলের শ্রেণিকক্ষের চেয়ে আলাদা।

প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘আমরা চাই, শ্রেণিকক্ষের নামগুলো থেকেও যেন তারা কিছু শিখতে পারে।’ নামগুলো হলো বৃষ্টি (প্রাক-প্রাথমিক শিশু), ঝর্ণা (প্রাক-প্রাথমিক), নদী (প্রথম), সাগর (দ্বিতীয় শ্রেণি), ওশান (তৃতীয়, ইংরেজি শেখার শুরু বলে এই নাম, বাংলায় সাগর) ক্লাউড (চতুর্থ, বাংলায় মেঘ), স্টর্ম (পঞ্চম, বাংলায় ঝড়) সাইক্লোন (ষষ্ঠ), টর্নেডো (সপ্তম), টাইফুন (অষ্টম), হেরিকেন (নবম) ও সুনামি (১০ম)। খেয়াল করলে বোঝা যাবে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ম সবগুলো শ্রেণিকক্ষের নাম ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগের নামে। এগুলো আমাদের দেশে বারবার আঘাত করে, বিশ্বে দুর্যোগ নিয়ে আসে। সবাইকে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত করে। স্কুলটির শিক্ষকরাও আলাদা। অন্য স্কুলের মতো তাদের ‘শিক্ষক’ বলা হয় না, তারাÑ ‘শিক্ষা সহায়ক’। তারা বললেন, এই নামগুলো থেকে ছাত্রছাত্রীরা প্রকৃতি ও আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারছে, সেগুলোকে রক্ষার জন্য তাদের মধ্যে বোধ তৈরি হচ্ছে।

প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা শিখতে শিখতে বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে ছাত্রছাত্রীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। ঢুকেই সুন্দরভাবে সারি আকারে তাদের জুতোগুলো একপাশে সাজিয়ে রাখেন। পাটের চট বিছানো মেঝেতে দুই সারিতে বসে পড়েন। সব মানুষকে সমান চোখে দেখতে শেখেন। তাদের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে গোলাকার জানালা। বাঁশের ক্লাসরুমে লাইট-ফ্যান নেই। বাইরের আলো-বাতাসে তারা লেখাপড়া করে। স্কুল ভবনটি দোতলা বাঁশের তৈরি, মাটির দালান, ওপরে টিন। নিচতলায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি; দোতলায় তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস হয়। গোলাকার ইটের দালান অবশ্য আছে। তাতে  ওপরের ক্লাসের লেখাপড়া চলে। প্রতি শ্রেণিতে ৩০ জন ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করতে পারে। ভর্তি ফি দিয়ে এবং মাসে ৩শ টাকা বেতনে তারা লেখাপড়া করেন। স্কুল থেকে প্রয়োজনীয় বই, খাতা ও কলমও দেওয়া হয়। গরিব ও মেধাবীদের জন্য ‘শিক্ষাবৃত্তি’ আছে। তাদের নাচ, গান, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন, বিষয়ভিত্তিক দলগত আলোচনা, ইংরেজিতে কথা বলে ইংরেজি শেখানো হয় প্রত্যন্ত এই গ্রামের স্কুলে আড়াই হাজার বইয়ের বিশাল লাইব্রেরি আছে। নামটি দীপশিখার প্রতিষ্ঠাতার নামেই ‘পৌল চারোয়া তিগ্যা লাইব্রেরি’।

স্কুল ক্যাম্পাসের গেট থেকে ঢুকে পূর্ব দিকের গোলাকার ভবনের দোতলায় লাইব্রেরি। তাতে সাধারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান, ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, গল্প-উপন্যাস সবই আছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেলজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’; কবি নজরুল, হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদসহ আরও লেখকের নানা স্বাদের বই আছে। বেশিরভাগই দীপশিখার টাকায় কেনা, কিছু বই অনুদানে পাওয়া। আলাদা লাইব্রেরিয়ান নেই। শিক্ষকরা ছয় মাস করে ঘুরে ঘুরে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন। তারা ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা ও প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বই কেনেন। ছাত্রছাত্রীরা টিফিনের সময় লাইব্রেরির বই বাড়িতে পড়ার জন্য জন্য নিয়ে আসতে পারে। স্কুল ছুটি হলে প্রতি বিকেলে তারা লাইব্রেরিতে বই পড়ার অতিরিক্ত ক্লাস করে।

টাইফুনের ছাত্র সুধাংশু পাল বললেন, রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পটি কয়েকবার পড়েছে। লাইব্রেরির সব বই-ই পড়ে ফেলবেন। স্কুল চলার সময় লাইব্রেরি খোলা থাকে। চাইলে শিক্ষকরাও বইগুলো নিয়ে পড়তে পারেন। তাদের ছুটি মেলে বিকেল সাড়ে ৪টায়।  দীপশিখা মেটি স্কুলেই প্রথম ‘স্ব-ক্রয়কৃত দোকান’ চালু হয়, জানালেন প্রধান শিক্ষক। ‘সততার দোকান’ নামে এটি এখন অনেক স্কুলে আছে। দোকানটির জন্ম ২০১৪ সালের আগস্টে। শুরুতে সাতটি পণ্য বিক্রি হতো। এখন ৫৪টি পণ্য আছে। ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় খাতা, কলম, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্স, নোট বুক, নাস্তার আইটেম, রাবার, স্যানেটারি ন্যাপকিন, টিস্যু আছে; তাদের তৈরি বাঁশের বাতি, মাটির বাঁশি, খেলনা ফুল, পাখিও আছে। স্কুলে শিক্ষক ১৭ জন, নারী সাতজন।  সবাই নিয়মানুযায়ী  নিয়োগ পেয়েছেন। কম্পিউটারে আগে থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া। নিজেরা প্রশ্নপত্র টাইপ করেন।

প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, ছাত্রছাত্রীরাই লেখাপড়া করবে, আমরা শিক্ষা-সহায়করা কেবল প্রয়োজনীয় সহায়তা দেব। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শ্রেণি রোল নম্বর নেই, তারা গ্রেডিং পদ্ধতিতে পাস করে। নিয়মটি ১৯৯৯ সাল থেকে চালু করেছি। ফলে তাদের মধ্যে রোল নম্বর নিয়ে হতাশা থাকে না। ৫০ নম্বর পেলে পাস। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য, মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া।’ তবে এই অন্যরকম স্কুলের সমস্যাও আছে।

প্রধান শিক্ষক জানালেন, ‘অনেক ভালো ফল করলেও আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা স্কুলের নামে দেওয়ার অনুমোদন পাইনি। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হয়ে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদের সার্টিফিকেট সেই স্কুলের নামে আসছে।’ তারপরও ছাত্রছাত্রীরা স্কুলের সাহায্যে তৈরি মেধার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। মেডিকেল ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছেন। লেখাপড়া শেষে ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

গ্রামের এই স্কুলের ঠিকানা দিনাজপুর জেলা শহর থেকে বালিয়াডাঙ্গি বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে বোচাগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এরপর মঙ্গলপুর বাজারের ভেতর দিয়ে গ্রামের পথ ধরে আরও ১০ কিলোমিটার। শেষ মাথায় বাঁশঝাড়। তারপর ‘দীপশিখা মেটি স্কুল’ সাইনবোর্ড। এত কষ্ট কেন করছেন? প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘এই স্কুল থেকেই ভালো মানের কলেজ করব বলে।’