‘বিশ্বযুদ্ধে’ গ্রেটা থার্নবার্গ

একসময়ের অটিস্টিক বেবি এখন বিখ্যাত পরিবেশ আন্দোলনকারী। জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে তার প্রচেষ্টা ছড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতেও। ভবিষ্যতে ১০০ দেশের ছাত্রছাত্রীরা জড়াবেন বলে বিবিসির জরিপ আছে। এবারের নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হওয়া ১৬ বছরের কিশোরী গ্রেটা থার্নবার্গকে নিয়ে লিখেছেন নওরীন সুলতানা

মেয়েটির পুরো নাম গ্রেটা আর্নমান থার্নবার্গ। জন্ম ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারিতে। বাবা সাভান্তে থার্নবার্গ অভিনেতা, মা মালেনা আর্নমান অপেরা গায়িকা। তিনি খুব বিখ্যাত। তার মেয়ে গ্রেটাও মায়ের মতোই বিখ্যাত, অল্প বয়সেই খ্যাতি পেয়েছেন। বয়স মাত্র ১৬। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতার বিপক্ষে আন্দোলন, সোচ্চার কণ্ঠ, জীবনযাপনে গ্রেটা সারা দুনিয়াতে হইচই ফেলে দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের আবহাওয়ার তাপমাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। তাতে উপকূলীয় ও সাগরের কাছে বা সাগরের ভেতরে থাকা দেশগুলো পানিতে তলিয়ে যাবে। ফলে অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হবেন, চিরকালের জন্য বসবাসের ভূমি হারাবে এই দেশগুলো। গরিব রাষ্ট্রগুলো এই ক্ষতির ভয়াবহ শিকার হবে। এ জন্য দায়ী যে কার্বন-ড্রাই অক্সাইড নিঃসরণ, সেটির প্রধান দায়ী উন্নত দেশগুলো। গ্রেটা সেই অন্যতম উন্নত দেশ সুইডেনেরই মানুষ।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তার কাজের শুরু আট বছর বয়সে। তখন তিনি স্কুলের ছোট্ট ছাত্রী। তিনি টের পেলেন, সারা দুনিয়ায় জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে তেমন কারওরই গরজ নেই। উন্নত কী অনুন্নত বা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সমস্যাটির মোকাবিলায় একসঙ্গে উদ্যোগী হতে পারছে না। কেন এখনো টিভি চ্যানেল, পত্রিকার খবরের প্রধান শিরোনাম হচ্ছে না জলবায়ুর পরিবর্তন? এ তো আসলে বিশ্বযুদ্ধই। কেন মানুষ বিদ্যুৎ, পানি ও খাবারের অপচয় নিয়ে এত কথা বলছেন? কেন এ নিয়ে বলছেন না। শৈশবের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (অটিস্টিক) শিশুটি টানা ছয় বছর এই বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে ভাবলেন। মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলেন। প্রয়োজন নেইÑ এমন যেকোনো কিছু কেনা বাদ দিলেন। এ সংগ্রামকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করলেন। তার সব সময়ের সঙ্গী বাইসাইকেলে লেখা আছেÑ ‘আবহাওয়ার পরিবর্তনকে বৈশ্বিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হোক।’

বিশেষ চাহিদার শিশু হিসেবে এক কাজ বারবার করতেন বলে তার সেই অভ্যাসটি নতুন এ আন্দোলনে কাজে দিল। নিজেকে তৈরি ও সচেতন করে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংগ্রামে তিনি গত বছর থেকে নেমে পড়লেন। তারিখ ২০ আগস্ট। তখন গ্রেটা তার দেশের গ্রেড ‘নাইন’ ছাত্রী। সে দেশে তখন প্রচ- গরমে দাবানল তৈরি হয়েছে, গাছপালা গরমের তাপে পুড়ে যাচ্ছে, আবহাওয়াও উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েটিকে এ সমস্যা প্রবলভাবে আক্রান্ত করল। ঘটনার কদিনের মধ্যে সুইডেনে সাধারণ নির্বাচন হলো। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, নির্বাচনের আগে স্কুল নয়, বরং নির্বাচনের সময় জনগণকে আরও সচেতন করতে হবে, তাদের জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। লেখাপড়া ফেলে তিনি কাজে নামলেন। স্কুলের সময়সূচিতে নিয়ম করে এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তার হাতে লেখা পোস্টার থাকতÑ ‘জলবায়ু পরিবর্তনে স্কুলের আন্দোলন’। তার মতো স্কুল ছাত্রছাত্রীদের সচেতন ও এ আন্দোলনে যুক্ত করতে চেষ্টা করলেন। গ্রেটা থার্নবার্গ দাবি তুললেন, প্যারিস চুক্তি মেনে অবশ্যই সুইডেনকে কার্বন-ড্রাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে হবে। নির্বাচন শেষ হলো, গ্রেটা জনমত গঠনে সফল হলেন। তবে থেমে গেলেন না।

প্রতি শুক্রবার আগের মতো পোস্টার হাতে ছাত্রছাত্রীদের দ্বারে দ্বারে গেলেন। ফলে অভাবনীয় সাফল্য এলো। চার মাসের মাথায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গ্রেটার নেতৃত্বে সুইডেনের ২৭০টি শহরের অন্তত ২০ হাজার স্কুল ছাত্রছাত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের সচেতনতা আন্দোলনে যোগ দিলেন। সে আন্দোলন টুইটার, ফেইসবুক ইউটিউবে ছড়িয়ে গেল আরও অনেক উন্নত দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পার্ক ল্যান্ড স্কুলের কিশোর ছাত্রছাত্রীরা ‘গ্রেটা আমাদের জীবনযাত্রা’ নামের পোস্টার প্রদর্শনী করলেন। তাতে এই কিশোরী অধিকার কর্মীর জীবনের নানা দিক তুলে ধরলেন। ২০১৮ সালে জার্মানির বার্লিনে জলবায়ু পরিবর্তনের আন্দোলনে ২০ হাজার ছাত্রছাত্রী যোগ দিলেন। তারা দাবি তুললেন, ‘গ্রেটার জলবায়ু পরিবর্তনের আন্দোলনকে অনুসরণ করুন।’ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন নিয়ে তার দেশের রাজধানী স্টকহোমে সবাইকে সচেতন করতে তিনি বক্তব্য রাখলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংসদ চলার সময় জলবায়ু বদলে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে জনমত গড়ে তুললেন।

মানুষের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কিশোরী এই মেয়েটিকে এ বছরের ২৩ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এ আমন্ত্রণ জানানো হলো। ‘আবহাওয়া প্রতিনিধি’ হিসেবে তার বক্তব্যে বিশ্বনেতাদের বললেন, ‘কিছু মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা খুব ভালো করেই জানেনÑ টাকা আয় করার জন্য তারা কতটা মূল্যহীন কাজ করছেন। আমি মনে করি, এখানে উপস্থিত আপনাদের মধ্যে অনেকেই সেই মানুষগুলোর মধ্যে পড়েন।’ এ বলে ফিরে আসার পর গ্রেটা আরও সোচ্চার হলেন।

সপ্তাহখানেক পর তিনি বিশ্বনেতাদের বললেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। আমি চাই, আপনারা এ বিষয়ে ভয় পান, ভাবুন। কারণ আমি ও আমরা প্রতিদিনই আরও বেশি আতঙ্কে ডুবে যাচ্ছি।’ কথাগুলো আসলে দুনিয়ার হাজারো মানুষের মনের কথা হয়ে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। ফলে আরও পরিচিতি পেলেন, আরও অনেকে সংগ্রামে তার সঙ্গী হলেন।

এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটিতে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে গ্রেটা

থার্নবার্গ গেলেন। সেখানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জঁ ক্লদে জাঁকার ছিলেন। গ্রেটা তাকে আহ্বান জানালেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর কার্বন-ড্রাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা ৮০ ভাগ কমিয়ে আনতে হবে।’ এরপর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী পরিবেশ অধিকারকর্মীদের আন্দোলন হলো। সেখানেও তিনি গেলেন। ব্রিটেনের বিখ্যাত বিবিসি ম্যাগাজিন গ্রেটা

থার্নবার্গের এই সংগ্রাম নিয়ে জরিপ করেছে। তাতে সংবাদমাধ্যমটির কর্মীরা দেখেছেন, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের শিশু-কিশোররা গ্রেটা থার্নবার্গে দারুণ অনুপ্রাণিত। তারাও তাদের দেশে তার মতো, তার বক্তব্যের অনুলিপিতে পরিবেশ বাঁচাতে সংগ্রাম শুরু করেছেন। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে বিবিসির গবেষকরা ধারণা করছেন, গ্রেটা থার্নবার্গের সংগ্রামে ভবিষ্যতে ১০০ দেশ যোগ দেবে। টুইটার, ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলন দানা বাঁধছে, ছড়াচ্ছে। কেন এ সংগ্রাম? টাইম ম্যাগাজিন গ্রেটার মুখোমুখি হলে ২০১৮ সালের সেই আলাপে এই কিশোরী নেতা বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ভবিষ্যৎ আপনারা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছেন, তাকে তো বদলানোর সুযোগ থাকবে না। ফলে আমাদের সবাইকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কেমন ভবিষ্যৎ চাই? আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ সীমানায় চলে এসেছি। জলবায়ু রক্ষার জন্য অবশ্যই ব্যয় কমাতে হবে। সে জন্য আমি নিরামিষ খাই, গাড়ির বদলে সাইকেল চালাই।’ জলবায়ুর সমতা আনতে গ্রেটা বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও অবশ্যই কার্বন-ড্রাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে হবে। তাহলে সেই দেশগুলোর জীবনযাত্রার মানও বাড়ানো যাবে।’

এই সংগ্রামের জন্য তাকে কমমূল্য দিতে হচ্ছে না। লেখাপড়া আপাতত ছাড়তে হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো স্কুল ছেড়ে কেন আন্দোলনে গিয়েছেন ও তার মতো অন্যদের লেখাপড়ায় ক্ষতি করছেন, সে প্রশ্ন তুলে প্রতিবেদন করেছে। তবে গ্রেটা স্বপ্ন হারাননি। বলেছেন, ‘এখন লেখাপড়া না করতে পারলেও ভবিষ্যতে জলবায়ুবিজ্ঞানী হব।’ বিজ্ঞানের বর্তমানকে তিনি বিশ্লেষণ করলেন ‘এটি আমাদের ধ্বংস ও এড়িয়ে চলাই শেখাচ্ছে।’ এ কাজ কেন করছেন, সে প্রসঙ্গে বললেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের প্রশ্ন করতে পারে, কেন সময় থাকতেই উদ্যোগ নিইনি?’ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় চলমান প্রক্রিয়ানীতি তৈরি করার প্রবণতার বিষয়ে বললেন, ‘বর্তমানের নীতি বদলাতে হবে, নীতি করে বিশ্বকে বদলানো যাবে না।’ বিখ্যাত এই জলবায়ুযোদ্ধা জলবায়ুর পরিবর্তনে মাঠের পাশাপাশি খাতা-কলমেও কাজ করছেন। ২০১৮ সালে সুইডেনের বিতর্ক ও প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা ‘সাভেন্সকা দাসব্লদেত’ জয়ী হয়েছেন। টেকসই উন্নয়ন তৈরির জন্য কাজ করা শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতা ‘তেলগে এনেরগি’ পুরস্কারে মনোনীত হয়েছেন। সে বছরের নভেম্বরে কিশোর রোল মডেল হয়ে ‘ফ্লাসুজেই বৃত্তি’ পেয়েছেন। টাইম ম্যাগাজিন তাকে ২০১৮ সালের সেরা ২৫ প্রভাবশালী কিশোরের একজন হিসেবে কভার করেছে। এবারের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসে সুইডেন সরকার গ্রেটা থার্নবার্গকে ‘সেরা সুইডিশ নারী’র স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। নরওয়ের তিন বিখ্যাত সংসদ সদস্য গ্রেটাকে ২০১৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। পুরস্কার পেলে তিনি হবেন সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল জেতা মানুষ।

এর আগে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই নোবেল পেয়েছেন ১৭ বছর বয়সে, ২০১৭ সালে।