পঞ্চগড়ে শুরু হয়েছে ৩ দিনব্যাপী বারুণী স্নান

পঞ্চগড়ে করতোয়া নদীর উত্তরমুখী স্রোতে শুরু হয়েছে হিন্দু ধর্মালম্বীদের ৩ দিনব্যাপী বারুনী স্নান।

সূর্যোদয়ের পর থেকেই জেলার বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়নের বোয়ালমারি করতোয়া নদীতে এই স্নানোৎসব শুরু হয়।

ব্রিটিশ আমল থেকেই চৈত্রের মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে প্রতি বছর করতোয়া নদীর উত্তরমুখী স্রোতে এই গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর স্থানীয় গঙ্গা মন্দির কমিটি বারুনী স্নান উৎসবের আয়োজন করে।

সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বী স্নানের পাশাপাশি পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় পূজা অর্চণা করে থাকেন। এখানে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন বয়সী হাজার হাজার ধর্মাবলম্বীরা স্নান ও পূজা অর্চনা করছেন।

সনাতন ধর্মমতে, চৈত্রের মধুকৃষ্ণা ত্রিদশী তিথির এই তিন দিনে নদীর উত্তরমুখী স্রোতে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। দেহ-মনকে পরিশুদ্ধ করতে অনেকে মাথার চুল বিসর্জন দেয়, পূজা আর্চণা করেন। স্নানমন্ত্র পাঠ করে হাতে বেলপাতা, ফুল, ধান, দূর্বাঘাস, হরীতকী, কাঁচাআম, ডাব, কলা ইত্যাদি অর্পণের মাধ্যমে স্নান সম্পন্ন করেন তারা।

স্নান উৎসবে আসা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, মাতৃহত্যার মতো জঘন্য পাপও মোচন হয় এই পূণ্যস্নানে।

এ জন্য জেলাসহ উত্তরাঞ্চলের লক্ষাধিক সনাতন ধর্মালম্বী অংশ নেয় এই স্নান উৎসবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও কোলের শিশুসহ বিভিন্ন বয়সীরা এই স্নান উৎসবে অংশ নেয়।

পর্দানশীল নারীদের জন্য নদীর এক মাথায় বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলবে এই পূণ্যস্নান উৎসব।

স্নান উপলক্ষে এখানে আয়োজন করা হয়েছে সপ্তাহব্যাপী বারুণী মেলা। পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা এ মেলা থেকে গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত নানান সামগ্রী কিনে থাকেন।

নাগরদোলা, মোটরসাইকেল খেলাসহ বিভিন্ন বিনোদনেরও আয়োজন করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বারুণী স্নান চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।

বোদা উপজেলার নরসুন্দর আনোয়ারুল বলেন, “প্রতি বছর এখানে আসি এবং চুলদাড়ি কাটার উপকরণ নিয়ে এবারও আমার মতো অনেকেই এসেছেন এখানে।”

একই উপজেলার বামনহাটের নরেশ চন্দ্র বলেন, “কয়েক দিন আগে বাবা মারা গেছেন। স্বগীয় বাবার সৎকার্য ও পূণ্যনের জন্য এখানে এসেছি।”

দিনাজপুরের সুইহারি এলাকা থেকে আসা অরুপ কুমার বলেন, “এখানে স্নান করলে মাতৃ হত্যার মত জঘন্য পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এই বিশ্বাসে স্নান করতে এসেছি।”

নীলফামারী জেলার জলঢাকা থেকে স্নান করতে এসেছেন প্রমিলা রানী।

তিনি জানান, “বাপ দাদাদের কাছ থেকে শুনেছি নদীর উত্তরমুখী স্রোতে স্নান করলে পাপ মোচন হয়। তাই এখানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্নান করতে এসেছি।"

জেলার আটোয়ারী উপজেলার আলোয়াখোয়া থেকে বোয়ালমারী বারুণী স্নানে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছেন নারায়ন চন্দ্র বর্মণ। দেহ ও মনকে পরিশুদ্ধ করতে এখানে প্রতিবছর আসা হয়। পরিবারের সবাই মিলে স্নান করি এবং পূর্ব পুরুষের আত্মার শান্তি কামনায় পূজা অর্চনা করি।

বোয়ালমারী গঙ্গা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক হরিমোহন রায় জানান, প্রতি বছর তিন দিনব্যাপী করতোয়া নদীর উত্তরমুখী স্রোতে বারুণী স্নান উৎসবের আয়োজন করা হয়। আয়োজন করা হয় সপ্তাহব্যাপী মেলারও।

বোয়ালমারী গঙ্গা মন্দির কমিটির সভাপতি ধনীরাম বাবু জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই চৈত্রের মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশী তিথিতে প্রতি বছর করতোয়া নদীর উত্তরমুখী স্রোতে এই গঙ্গা স্নান অনুষ্ঠিত হয়।

পঞ্চগড়সহ পার্শ্ববর্তী জেলার হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ এখানে স্নান করতে ও পূজা অর্চনা করতে আসেন।

কাজলদীঘি কালিয়াগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন আলাল বলেন, “এখানে করতোয়ার বোয়ালমারী এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার নদীর পানি উত্তরদিকে প্রবাহিত হয়েছে। প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশের কয়েক লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের পুণ্যার্থী ও সাধু সন্ন্যাসী এখানে আসে। এবারও এ উৎসবে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে।