মানুষকে অহেতুক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, ঠাট্টা-মশকরা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের প্রভাব নিজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। ফলে যারা এমন কাজ হরহামেশা করে তাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস থাকে না। তারচেয়ে বড় বিষয় হলো এই বিদ্রূপ প্রবণতা আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষকে উদাসীন করে তোলে। পবিত্র কুরআন তাই হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, এ ধরনের আচরণ পুরোপুরি অস্বাভাবিক। তাই এ রকম আচরণ পরিহার করতে হবে। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান উপায় হলো আন্তরিকতার সঙ্গে মেলামেশা এবং কথা বলা। এটা একটা শিল্প। কল্যাণকর এবং সুন্দর করে কথা বলার মধ্য দিয়ে অনেক ইতিবাচক দিক অর্জিত হয়। এই গুণটি অর্জন করার বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সমব্যথী হওয়া, দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করে নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
সহানুভূতি একটা বিরাট গুণ। অপরের দুঃখ-কষ্ট নিজের ভেতরে লালন করতে পারা সহজ বিষয় নয়। কোনো মানুষ যখন কোনো সংকটে পড়ে, জীবনে যখন কোনো বিপর্যয় নেমে আসে; তার জীবনে তখন একটু সহানুভূতি ওই ব্যক্তিকে আত্মিক এবং মানসিক দুরবস্থা থেকে সহজে মুক্তি দেয়। এ ছাড়া অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এরকম সহানুভূতি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। বিপদাপদে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথ সুগম ও ত্বরান্বিত হয়। মোটকথা সহানুভূতি হচ্ছে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার যোগসূত্র। তদুপরি সম্পর্কের ধরন এবং গভীরতা বাড়ে সহানুভূতির মধ্য দিয়ে।
সহানুভূতির বিষয়ে কুরআনে কারিমে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহানুভূতি হলো সেই গুণ যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অন্যের জীবনের সুখ-দুঃখকে দূর থেকে উপলব্ধি করতে পারে। ইসলাম বহু শতাব্দী আগে থেকে মানুষের মাঝে ঐক্য, সংহতি, ভালোবাসা, আন্তরিকতা অর্থাৎ পারস্পরিক সুসম্পর্কের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে সহানুভূতি মানে অপরের মনকে সমানভাবে উপলব্ধি করা। এটা মানুষের সবচেয়ে সুন্দর একটি বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মানুষেরা অন্যের প্রতি নিজেদেও শ্রদ্ধা সম্মান ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে পারে। এই আন্তরিক অনুভূতি মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের চাকাকে সহজ ও অবাধ করে তোলে। যার ফলে সম্পর্কেও চাকা সুন্দরভাবে ঘুরতে থাকে। সহানুভূতির ফলে মানুষ অন্যকে তার কঠিন দুঃসময়ে কিংবা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে মানসিক ও আত্মিক চাপ, উত্তেজনা ও অস্থিরতা থেকে রেহাই দিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে সহানুভূতি হলো অন্যের পৃথিবীতে প্রবেশ করার শক্তি। মনের অবস্থা যথাসময়ে বুঝতে পারলে যেকোনো উপায়ে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। তাকে যে বুঝতে পেরেছি তাও বোঝানো যায়। আর যখন আমরা অন্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারব তখন স্বাভাবিকভাবেই সে আমাদের কথা শোনার জন্য এবং আমাদের গ্রহণ করার জন্য বেশি আগ্রহী হবে ও প্রস্তুত থাকবে। সহানুভূতি ও অনুভূতির প্রতিফলন আরোগ্যের এমন একটি উপাদান যা আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং মানুষকে কোণঠাসা অবস্থা ও আত্মনিমগ্নতা থেকে মুক্তি দেয়। যেসব লোক অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অহমিকা দেখায় এবং অন্যের মতামত ও চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দেয় না, তারা খুব কমই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তারা সামাজিক জীবনে সফল না। তারা অন্যদের বিশাল পৃথিবী সম্পর্কে অনবহিত। এ ধরনের লোকেরা এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মাঝে কারও সঙ্গেই আন্তরিক হতে পারে না কিংবা আন্তরিকতা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারে না।
কুরআনে কারিমের সুরা আল ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের অন্তরে এই স্নেহ প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দলাদলি করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন সে কথা স্মরণ রেখো। তোমরা পরস্পরের কী রকম শত্রু ছিলে। তিনি তোমাদের হৃদয়গুলোতে স্নেহ-মায়া-মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। ফলে তার অনুগ্রহ ও নিয়ামতের বরকতে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো।
এই আয়াত অনুযায়ী পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর এবং ইমানের আলোকে মানুষের মাঝে পারস্পরিক সহানুভূতি সৃষ্টির পর মানুষের মাঝ থেকে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা দূর হয়ে যায়। জাহেলি সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং ফেতনা-ফ্যাসাদের ভয়াবহ আগুন নিভে গিয়ে সবাই একাত্ম ও ঐক্যের ডোরে আবদ্ধ হয়। তাদের মাঝে স্নেহ, মায়া-মমতার বন্ধন তৈরি হয়। সহানুভূতিশীল সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যেটা ইসলামের একান্ত চাওয়া।
লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলাম বিষয়ক লেখক