আফতাব আহমেদ বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক আক্ষেপের নাম। অমিত প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানের সম্মানে আঘাত লেগেছিল। তাই ২৯ বছর বয়সে অবসর নিয়ে কোচিংয়ে জড়ালেন। এবার প্রথমবার প্রধান কোচ হয়ে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জকে সুপার সিক্সে তুলেছেন। তাও পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে রেখে। ৩৩ বছরে এমন সাফল্য বাংলাদেশের কোনো কোচের নেই। এখন অনেক পরিণত আফতাব বোঝেন, হেলাফেলা করে দেশকে আরও কত কিছুই না দেওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন। ‘দেশ রূপান্তর’-এর এই সপ্তাহের সাক্ষাৎকারে আফতাব আহমেদের মুখোমুখি হয়েছিলেন মোহাম্মদ খাইরুল আমিন
প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন সাফল্যের কথা ভাবতে পেরেছিলেন শুরুর সময়?
এত ভালো হবে সত্যি বলতে আমি কল্পনাও করিনি। কারণ, খাতা-কলমে আপনি যদি হিসাব করেন তাহলে আবাহনী, শেখ জামাল, শাইনপুকুর, প্রাইম দোলেশ্বর, প্রাইম ব্যাংক ওরা কিন্তু খুব ভালো দল। চিন্তা করেছিলাম যতটা ভালো যাওয়া যায়।
আপনার দলটা তারকাবহুল না। কিন্তু কীভাবে এই সাফল্য তুলে আনা সম্ভব হলো বলে মনে করেন?
খেলোয়াড়দের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড় যে ব্যাপার দেখেছি এবং যেটি ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি তা হলো আমরা কারও ওপর নির্ভরশীল থাকব না। হিসাব করে দেখবেন, ১০ ম্যাচে আমাদের সাত থেকে আটজন ম্যান অব দ্য ম্যাচ আছে। একই খেলোয়াড় ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়নি। বিভিন্ন খেলোয়াড়ের ম্যাচের সেরা হওয়া মানে আমরা কারও ওপর নির্ভরশীল না। যার যেখানে দায়িত্ব সে সেটা পালন করছে। সবার যাতে ছোট ছোট অবদান থাকে তাই চেয়েছি।
ন্যাচারাল খেলায় আপনি কখনো সমঝোতা করেননি। প্রথম বল থেকে শট খেলতে চাইতেন। দলকে কি সেভাবে ন্যাচারাল খেলায় উজ্জীবিত করেন?
১০০ ভাগ। আমাদের পরিকল্পনাই ওটা। এমনকি আমাদের নতুন খেলোয়াড় নাঈম শেখ, ওকে বলাই আছে ‘তুমি তোমার ন্যাচারাল খেলাটা খেল। যদি ৩০-৪০ করো তারপর ভিন্ন পরিকল্পনা। শুরুটা তোমার মতো ইতিবাচকভাবেই করো।’ কারণ, মাঝে নাফীস, সৌরভের (মুমিনুল হক) মতো দায়িত্ব নিয়ে খেলার ব্যাটসম্যান আছে। তাই তরুণদের আমি সবসময় পজিটিভ ও ফ্রি খেলতে বলি।
২৯ বছরে অবসরে চলে গেছেন। এখন মোটে ৩৩ আপনি। কোন ভাবনা থেকে কোচিংয়ে এলেন?
প্রথমে ভেবেছিলাম ক্রিকেট যখন ছাড়ব তখন অন্যকিছু করার চেষ্টা করব। ক্রিকেট যখন প্রায় ছাড়ার পথে তখন অনেক কিছু চেষ্টা করেছি। সত্যি কথা। কিন্তু দেখলাম যেটা আমি জানি সেটাই আমার জন্য সবচেয়ে সহজ। আরও দুই-তিনটা জিনিস চেষ্টা করেছিলাম। আমার জন্য সহজ হয়নি। ব্যবসার দিকেও গিয়েছিলাম। সাফল্য পাইনি। আমার অনেক টাকা সেখানে লোকসান হয়েছে, (হাসি)। চিন্তা করে দেখলাম, ওখানে সময় দেওয়াই বৃথা। এরপর চট্টগ্রামে একটা একাডেমি করা শুরু করলাম। তখন ভাবলাম, এখানে সময় দিলে আমার জন্য ভালো।
যখন মাঠে নামতেন ‘আফতাব, আফতাব’ ধ্বনি উঠত। অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত তখন কতটা কঠিন ছিল?
তখন আমার অনুভব করার অনেক কিছুই ছিল না। এখন বয়স হয়েছে, অভিভাবক হয়েছি। এখন আমি অনুভব করছি, অনেক সিদ্ধান্ত একটু অন্যভাবে নিলে হয়তো আমার জন্য ভালো হতো।
বয়সভিত্তিক দল থেকে জাতীয় দল, সবসময় আপনি খ্যাতিতে ছিলেন। এরপর বাদ পড়লেন। লিগে কম টাকা পাচ্ছিলেন। এসব আপনার মধ্যে টানাপড়েন তৈরি করেছিল কি না?
অবশ্যই এটা আমার সম্মানে লেগেছিল খুব। আপনি যেটা বললেন বয়সভিত্তিক থেকে শুধু সেটাই না, ক্লাস সিক্সে যখন আমি ক্রিকেট শুরু করি তখন থেকেই পজিটিভ ব্যাট করতাম। সবাই খুব পছন্দ করত। ওই সময় থেকেই ড্রপ জিনিসটা কী ওটা কখনো বুঝিনি। টুয়েলভ ম্যান কী, অনুভব করিনি। ৮৫ ওয়ানডে খেলেছি আর তা টানা খেলে গেছি। কখনো ড্রপ পড়িনি। একটা পর্যায়ে গিয়ে যখন ড্রপ হতে লাগলাম তখন আমার মনে হলো, ‘না, আমার দিন মনে হয় শেষ হয়ে আসছে। আমি মনে হয় আর পারব না।’ পজিটিভ ছেলের মধ্যে নেগেটিভ ঢুকে গেল। আমি হয়তো আর পজিটিভ হতে পারিনি। এটা আমার ব্যর্থতা ছিল। হয়তো পজিটিভ হতে পারতাম একটু চিন্তা করলে। কিন্তু ওই সময় আমি পারিনি।
এটা প্রমাণিত, আফতাবের যে প্রতিভা তার পুরোটা বাংলাদেশ পায়নি। আফতাব যদি আরেকটু সিরিয়াস হতো...
সন্দেহ নেই। কোনো সন্দেহ নেই। এখন বিশেষ করে ইউটিউবে যখন কিছু ম্যাচ দেখি তখন এটা অনুভব করি। কেউ যদি মনে করে আমার প্রশংসা আমি নিজেই করছি আই ডোন্ট কেয়ার। একটা জিনিস সত্য, এখন যখন নিজের ব্যাটিং (ভিডিও) দেখি, তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি। যদি আমি আরেকটু চেষ্টা করতাম তাহলে আরও অনেক কিছু দিতে পারতাম।
জেসন গিলেস্পিকে কার্ডিফে সেই ছক্কা মেরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় কিংবা আরও কিছু ম্যাচের ব্যাটিং ভিডিও এখনো কিন্তু রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে...
সেটাই। বগুড়ায় (২০০৬) শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জেতার ম্যাচে স্ট্রেইট যে ছক্কাটা মারলাম। ওগুলো দেখলে ফিল করি, আলহামদুলিল্লাহ। কিছু হলেও সম্ভাবনা আমার ছিল। চাইলে আমি পারতাম। (হাসি) ২০০৭ বিশ্বকাপে (গায়ানা) আশরাফুলের সঙ্গে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিলাম। ভারতের বিপক্ষে ৬৭ (২০০৪, ঢাকা) করলাম। ওটা জিতলাম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কয়েকটা সিরিজ খেললাম। সিরিজ জয়ে ভূমিকা ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে (২০০৭) ৬২ (অপরাজিত) করলাম। আশরাফুল করল। যে ম্যাচ জিতে আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে গেলাম। ওগুলো দেখলে মনে হয় চাইলে আরও কিছু হয়তো করতে পারতাম। কিন্তু যেটা বললাম, ওই সময় বোঝার শক্তিটা একটু কম ছিল। নিজে যা বুঝতাম সেটাকে ১০০ ভাগ ঠিক মনে করতাম। এখন এসে বুঝছি, আমি শতভাগ ঠিক ছিলাম না ওই সময়।
আক্ষেপ কাজ করে?
না (দীর্ঘশ্বাস)। আক্ষেপ আর কি। ওগুলো অনেক আগের কথা। ওসব তো জীবনে আর ফিরে আসবে না।
২০০৮ সালে আইসিএলে চলে গেলেন। বড় টাকা হাতে ছিল বলে পরে ওই বয়সে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তটা সহজ হয়েছিল কি?
না। ওটা না। আপনারা খুব ভালো করে জানেন যে আমি কষ্ট কম করতে পছন্দ করতাম। আইসিএলে যাওয়ার মূল কারণ কিন্তু টাকা ছিল না। সে সময় আমার আঙুল ভেঙে গিয়েছিল। তখন এত কঠোর পরিশ্রম করছিলাম যে ক্রিকেটকে আমার ঘৃণা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আর পারছিলাম না। তখন আইসিএলের প্রস্তাব আসল। ভাবলাম, এক মাস খেলব আর এগারো মাস ঘুমাব। তখনকার চিন্তা এরকম ছিল। কিন্তু এখন যদি চিন্তা করতে বলেন, তাহলে অবশ্যই ওই সময়ের সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল।
এখন হলে তাহলে দেরি করে ঘুমাতেন না, সকালে বিছানা থেকে টেনে তুলতে হতো না ট্রেনিংয়ের জন্য?
না। অবশ্যই না। (হাসি)। এখন যদি হতো তাহলে ক্রিকেট খেলা অবশ্যই চালিয়ে যেতাম। খেলার চেয়ে কোচিংয়ের জীবনটা অনেক কঠিন। ক্রিকেট খেলে গেলে আমার জন্য জীবনটা অনেক সহজ হয়ে যেত। বেশি না, আর পাঁচটা বছর খেললে সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।