শেষ পর্যন্ত ঘটনাটা ঘটলই- জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে টেনেহিঁচড়ে ইকুয়েডর দূতাবাস থেকে বের করা হলো এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটা যে ঘটবে তা আগে থেকেই লক্ষণে বুঝা যাচ্ছিল।
এক কী দুই সপ্তাহ আগে, উইকিলিকস জানিয়েছিল এ গ্রেপ্তার হতে পারে, তবে ইকুয়েডরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি চেলসি ম্যানিঙকে আবার গ্রেপ্তার (গণমাধ্যমে এ বিষয়টি আসেইনি বলতে গেলে) এ খেলার একটি অংশ ছিল। ওই নারীকে কারাগারে নেয়া হয়েছে তার কাছ থেকে উইকিলিকস বিষয়ে তথ্য আদায় করতে, আর এসব তথ্য যখন যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসাঞ্জকে (যদি পায়) তাদের হাতে পাবে তখন তার বিচারের সময় কাজে লাগাবে।
এ ছাড়া মাসকয়েক আগে থেকেই আরো সূত্র আমাদের সামনে হাজির করা হয়, যখন খুব ঠাণ্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে চারিত্রিক দিক দিয়ে কাউকে খতম করে দেওয়ার জন্য প্রচার চালানো হচ্ছিল কোনো অপিরিচিত সূত্র থেকে, যা ছিল খুব নীচু মানসিকতার যে, ইকুয়েডর তার কাছ থেকে নিস্তার চায়, কারণ তার শরীর থেকে কটূ গন্ধ বের হচ্ছে এবং গায়ের পোশাক নোংরা।
অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে প্রথম হামলা চালানো হলো তার সাবেক বন্ধু এবং সহযোগীদের দিক থেকে যারা প্রকাশ্যে এসে ঘোষণা দিল যে, উইকিলিকস খুব ভালো কিন্তু এরপর এটি অ্যসাঞ্জের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান দ্বারা (তার হিলারিবোধী মানসিকতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজশের সন্দেহ) তাড়িত হতে থাক। এটা এরপর পর্যবসিত হতে থাকল ব্যক্তিগত চরিত্রহননের দিকে, বলা হতে থাকল সে বিকারগ্রস্ত এবং অহংকারী, ক্ষমতার কাঙাল।
অ্যাসাঞ্জ কি বিকারগ্রস্ত? যখন আপনি এমন একটি অ্যাপার্টমেন্টে বাস করবেন যার ওপর এবং নিচ হতে তদারকি করা হবে, আপনি গোপন সংস্থার লাগাতার পর্যবেক্ষণের শিকার হবেন, কে তখন তার মতো হবে না?
ক্ষমতার কাঙাল? তখনকার (বর্তমানে সাবেক) সিআইএ প্রধান বলেছিল তাকে গ্রেপ্তার আমাদের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তার মানে কি এই নয় যে সে কারু না কারুর জন্য একটা বড় হুমকি? একটা গোয়েন্দা সংস্থার সর্বোচ্চ ব্যক্তির আচরণে কি তাই মনে হয় না? যদিও উইকিলিকস নিজেও একটা গোয়েন্দা সংস্থা যা জনগণকে পর্দার আড়ালে সংঘটিত গোপন তথ্য সরবরাহ করে।
এবার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটার দিকে যাওয়া যাক, কেন এখন? আমার মনে হয় একটা নামই সবকিছু ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট হবে, ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা- এটি, অ্যাসাঞ্জ যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, যার জন্য সে লড়াই করেছিল, সরকারি সংস্থা এবং বড় বেসরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদানপ্রদানের বিরুদ্ধে, তাতে যুক্ত একটি নাম।
মনে করে দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়া প্রভাব বিস্তার করেছিল এমন অভিযোগ নিয়ে কী পরিমাণ মাতামাতি হয়েছিল- কিন্তু এখন দেখা গেল এটা রাশিয়ার হ্যাকাররা (অ্যাসাঞ্জের সহযোগিতায়) করেনি, যে তারা ট্রাম্পের পক্ষে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল।
তার মানে এই নয় যে রাশিয়া এবং তার মিত্ররা সাধু, তারা সম্ভবত একই কায়দায় একটা প্রভাব তৈরি করতে চেয়েছিল যা যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের সঙ্গে করে থাকে (শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একে বলা হয় সহযোগিতামূলক গণতন্ত্র)। তার মানে এর অর্থ দাঁড়ায় যে, সেই সবচেয়ে ভয়ংকর নেকড়ে যে গণতন্ত্রকে ক্ষতবিক্ষত করে আসছে সে এখানে হাজির, ক্রেমলিনে সে থাকে না- এবং এটাই অ্যাসাঞ্জ সবসময় দাবি করে আসছিল।
কিন্তু আসলে কোথায় থাকে সেই ভয়ংকর নেকড়ে? এই নিয়ন্ত্রণ এবং সুনিপুণভাবে নিজেদের পক্ষে পরিস্থিতিকে নিয়ে আসার কৌশল পুরোপুরিভাবে বুঝতে হলে অবশ্যই তাকাতে হবে বেসরকারি সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পেছনের সম্পর্কের দিকে (এ ক্ষেত্রে তাকাতে হবে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার দিকে), তাকাতে হবে কীভাবে গুগল অথবা ফেসবুকের মতো তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসবের মধ্যে ঢুকে পড়ছে।
চীনের দিকে তাকিয়ে আমাদের মর্মাহত হওয়ার কিছু নাই, বরং আমাদের দিকে তাকিয়ে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যারা আমরা সেই একই নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়ে বসে আছি আর বিশ্বসি করছি যে আমরা আমাদের প্রাপ্য সব স্বাধীনতা ভোগ করছি, এবং আমাদের গণমাধ্যম তা-ই দিয়ে যাচ্ছে যা আমরা পেতে চাইছি। চীনের মানুষ কিন্তু জানে যে তাদের সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
এ থেকে পুরো একটা দৃশ্য আমরা দেখতে পাব, যদি আমরা জৈবপ্রযুক্তির সঙ্গে (মানুষের মস্তিষ্ককে তারের সঙ্গে সংযুক্ত করা ইত্যাদি) এর একটা সংযোগ তৈরি করতে পারি, যা নতুন এমন সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি সম্পূণর্ ভীতিকর চিত্র হাজির করে যার সামনে সেই অতীতের বিশ শতকের ‘সর্বাত্মকতাবাদকে’ সেকেলে আর এলমেল মনে হবে।
নতুন সামরিক-জ্ঞানের সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা হচ্ছে সরাসরি এবং বোধগম্য চাপ তৈরির সময় আর এখন নেই, কারণ ব্যক্তি নিজেই এক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এবং নিজেকে মুক্ত ও স্বশাসিত ভেবে নিয়ে তার মধ্যে এমন এক মনোজগত তৈরি হয় যা কাঙিক্ষত নিয়ন্ত্রণের দিকেই তাকে পরিচালিত করে। আর এটা হলো উইকিলিকসের অন্যতম শিক্ষা যে, আমাদের পরাধীনতা তখন সবচেয়ে ভয়ংকর যখন আমরা তাকে স্বাধীনতার রূপেই যাপন করতে থাকি- আসলে যা থাকার কথা ছিল তথ্যের অবাধ প্রবাহের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি নিজের মতকে সবার সামনে হাজির করতে পারবে এবং ভার্চুয়াল সমাজের সামনে তার নিজের ইচ্ছামতো সেটা কি হচ্ছে?
আমাদের সমাজে সহনশীলতা এবং ইচ্ছার স্বাধীনতার রয়েছে এক ধ্রুপদী উচ্চমূল্য, এর ফলে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না এটাই ছিল বাস্তবতা। আর এটা বুঝা যেত একজন ব্যক্তির স্বাধীনভাবে থাকার মধ্য দিয়ে। এ সময়ে ওয়েবে নিয়ন্ত্রহীনভাবে চলাফেরা করার চেয়ে মুক্ত থাকার আর কোন অর্থ আছে? আর এভাবেই ‘গণতন্ত্রের গন্ধমাখা ফ্যাসিবাদ’ এখন বিরাজ করছে।
এসব কারণে ডিজিটাল নেটওয়ার্ককে রাষ্ট্রীয় শক্তি এবং বেসরকারি পুঁজির নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, এবং গণমানুষের বিতর্কের জন্য একে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
অ্যাসাঞ্জ ঠিকই ছিলেন বিস্ময়করভাবে উপেক্ষা করা তার ‘হোয়েন গুগল মেট উইকিলিকস’ বইয়ে, আমাদের জীবন এখন কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তা বুঝতে এবং এই নিয়ন্ত্রণকেই কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা হিসেবে হাজির করা হচ্ছে, আমাদের সেই ছায়া সম্পর্কের দিতে নজর দিতে বলা হয়েছে যা চলছে বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে আমাদেরই স্বার্থের রাষ্ট্রীয় সংস্থার।
অ্যাসাঞ্জ নিজেকে গণমানুষের একজন গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন, তিনি যারা ক্ষমতায় আছে তাদের জন্য গোয়েন্দাগিরি করছেন না, তিনি গোয়েন্দাগিরি করছেন তাদের ওপর যারা জনগণের জন্য ক্ষমতায় গিয়ে বসে আছে। যে কারণে তার কাজের সুফল আসবে আমাদের দিকে, মানুষের দিকে। আমাদের ক্ষোভ এবং নড়াচড়া তার চাওয়াকে বাস্তব করে তুলতে পারে। অনেকেই হয়ত পড়েছেন সোভিয়েতর গোপন বাহিনী কীভাবে তাদের বিশ্বাসঘাতকদে শাস্তি দিত (এর জন্য কয়েক দশক সময় লাগলেও) এবং যদি তারা শত্রুর হাতে আটক হতো তখন তাকে মুক্ত করতেও তারা ঝাপিঁয়ে পড়ত।
অ্যাসাঞ্জের পক্ষে কোনো রাষ্ট্র নেই, শুধু আমরাই আছি- সুতরাং সোভিয়েত বাহিনী যা করত তাই আমরা করব, তার জন্য আমরা যুদ্ধ করে যাব কত সময় লাগল সেটা কোনো ব্যাপার না।
উইকিলিকস একটা শুরুর নাম, আমাদের কাজটা হবে মাওবাদীদের মতো, এখন অসংখ্য উইকিলিকস ফুটাতে হবে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডট কো ডট ইউকে থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ সালাহ উদ্দিন শুভ্র