ইস্যুর ভিড়ে কমছে মনোযোগ

২০ ফেব্রুয়ারি, ১১ মার্চ, ১৯ মার্চ, ২৮ মার্চ ও ১০ এপ্রিল। চলতি বছরের এই পাঁচটি তারিখের কথা বললে আপনি কী কী মনে করতে পারেন? নাহ, কিছু মনে পড়ছে না? আচ্ছা আরেকটু বেশি তথ্য দেওয়া যাক। দেখি এবার কতটুকু মনে করতে পারেন।

চকবাজারের চুড়িহাট্টার (২০ ফেব্রুয়ারি) কথা মনে আছে? ওই যে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল। ডাকসু (১১ মার্চ) নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডের কথা মনে আছে? আবরার (১৯ মার্চ) নামটি কতটুকুই বা মনে পড়বে, ওই যে সড়কে যার প্রাণ গিয়েছিল। কিংবা বনানীর (২৮ মার্চ) আগুনের কথা? আর নুসরাত নামের এক প্রতিবাদী মেয়ের কথা? এই তো ১০ এপ্রিল যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। আচ্ছা, এগুলো তো এখন মনে পড়ল। এবার গত বছরের দিকে নজর দেওয়া যাক।

একরামুল হকের কথা মনে আছে? ২৬ মে রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যিনি নিহত হয়েছিলেন। তার মেয়ের সেই ফোনালাপ? এসবের মতো শিক্ষার্থীদের সেই সড়ক আন্দোলনের কথাও হয়তো প্রায় ভুলে গেছেন। হয়তো ভুলে গেছেন মে মাসের ১১ তারিখের কথা। যেদিন লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে মহাকাশে যায় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১।

স্মৃতির পাতা ঘেঁটে ঘেঁটে আপনাকে এভাবে পেছনে নিয়ে যাওয়ায় একটু একটু করে আপনার এখন সব মনে পড়ছে। আপনার মনে পড়ছে সেইসব ফেইসবুক স্ট্যাটাসের কথা, প্রত্যেকটি ঘটনার পর, যা দিয়ে ইন্টারনেটে আপনি ঝড় তুলেছিলেন। কিন্তু এখন আর সেভাবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন না। শুধু আপনি নন, ইন্টারনেট যুগের অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটি হচ্ছে। কিন্তু কেন? এমনটি কি আপনা-আপনি হচ্ছে? মোটেই না।

টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ডেনমার্কের গবেষকরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা পর্যন্ত করেছেন। তারা বলছেন, প্রযুক্তির যুগে হাজারো তথ্যের সমাহার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে। আপনাকে দিনকে দিন ‘হতাশ’ মানুষে পরিণত করছে!

গবেষকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, অনলাইন সার্চ, বই-মুভি বিক্রি এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় তারা দেখেছেন, অনলাইনের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর মানুষের সামগ্রিক মনোযোগ বছরে বছরে কমে যাচ্ছে।

মানুষ এখন কোনো ইস্যু পেলেই দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার একইভাবে দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষকদের বরাত দিয়ে ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টাজুড়ে ব্রেকিং নিউজের যে প্রচলন চলছে, তাতে মানুষের মনোজগতে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব পড়ছে।

গবেষকরা ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টুইটার থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া গুগল থেকে ১০০ বছর আগের বই বিক্রির তথ্য নেন। মুভির জন্য বিক্রি হওয়া ৪০ বছরের টিকিটের তথ্যও ব্যবহার করা হয় এ গবেষণায়। একই সঙ্গে ২৫ বছর ধরে শীর্ষস্থানীয় জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন আর্টিকেলের তথ্যও ব্যবহার করা হয়।

এগুলোর পাশাপাশি গুগল ট্রেন্ড এবং উইকিপিডিয়া থেকে মানুষের আগ্রহের বিষয়গুলোর ওপর নজর দেওয়া হয়।

গবেষকরা টুইটারে বিশ^জুড়ে ৫০টি ঘটনার হ্যাশট্যাগ বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, ২০১৩ সালে শীর্ষে থাকা ৫০টি হ্যাশট্যাগ স্থায়ী হচ্ছে ১৭ দশমিক ৫ ঘণ্টার মতো। ২০১৬ সালে মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ায় এগুলো ১১ দশমিক ৯ ঘণ্টা ধরে শীর্ষ থাকছে।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের গবেষক ফিলিপ লরেনের মতে, তথ্যের পরিমাণ বিপুল। যা আমাদের মনোযোগ নিঃশেষ করে দিচ্ছে। নতুন কিছু জানার তাগিদে প্রতিনিয়ত আমরা এক টপিক থেকে আরেক টপিকে ঝাঁপ দিচ্ছি।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২৫ শতাংশ টিনএজারের মনোযোগে দারুণ ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে প্রযুক্তির যুগে তথ্যের এই ছড়াছড়ি। এই কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের বন্ধু-বান্ধবের নাম-ঠিকানাও ভুলে যায়। অন্যদিকে, ৭ শতাংশ মানুষ নিজের জন্মদিনও যথাসময়ে মনে করতে পারেন না!