স্বাধীনতা পুরস্কার ২০১৯ লাভ করেছেন ড. হাসিনা খান। পাট গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তার গবেষণা জীবন ও আমাদের গবেষণা পরিস্থিতি সবই জানলেন রিয়াজ হাসান। ছবি তুলেছেন জামিল চৌধুরী
১৯৭৪ সালে চিকিৎসা, প্রকৌশলবিদ্যা ছেড়ে কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন (বায়োকেমিস্ট্রি) বিভাগে ভর্তি হয়েছেন?
আমাদের সময়েও এই সময়ের বিজ্ঞানের বেশির ভাগ ভালো ছাত্রছাত্রী চিকিৎসাবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যায় পড়ালেখা করতে চাইত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ, রসায়নবিদ্যাও তখনো খুব ভালো বিষয় ছিল। তবে বড় ভাই আমার প্রাণরসায়নে পড়ার মূল অনুপ্রেরণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে এলেন। এক বন্ধু প্রাণরসায়নবিদ হয়েছেন, তিনি সেই দেশে ভালো মানের গবেষণা করেছেন বলে তাকে নিয়ে অনেকবার গল্প করেছেন। বড় ভাইদের কাছে আগে থেকে বিজ্ঞানের অনেক গল্প শুনেছি; ডিএনএ (ডিয়োস্কিরাইবোনিউক্লিক এসিড) নিয়ে নানা ধরনের গবেষণাকর্ম সেই দেশে শুরু হয়েছে; ফলে ডিএনএ গবেষণায় অবদান রাখব বলে প্রাণরসায়নে ভর্তি হলাম। আমাদের বাসায় অনেক বিজ্ঞানের মানুষ। ভাইয়েরা সবাই বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত।
পিএইচডি তো মলিকুলার বায়োলজিতে?
মলিকুলার বায়োলজির (আণবিক জীববিদ্যা) জন্ম সত্তর দশকের গোড়ায়। বিজ্ঞানের এই শাখা জিন গবেষণা করে। আণবিক জীববিদ্যা বা জিনবিদ্যার ছাত্রী হিসেবে জানি মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য জিননির্ভর। ফলে নতুন ও আকর্ষণীয় এ বিষয়ে উচ্চতর গবেষণার আগ্রহ ছিল। গবেষণার জন্য ব্রিটেনই প্রথম পছন্দ। তবে সেখানেও এ ধরনের গবেষণা বেশ খরচের। ভালো ছাত্রী হিসেবে ‘কমনওয়েলথ স্কলারশিপ’ পেয়েছিলাম। তাতেও খরচে কুলাল না। আলাদাভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়, এমন এক গবেষণাগার (রিসার্চ ল্যাবরেটরি) নির্বাচন করেছি। তারা কৃষি নিয়ে কাজ করেন। আমার গবেষণার বিষয় তাই। জমিতে খাদ্য হিসেবে নাইট্রোজেন দিতে হয়। ব্যাকটেরিয়া কীভাবে নাইট্রোজেনকে উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে, কীভাবে তা তৈরি করে, ব্যাকটেরিয়ার জিনগুলোই বা কী জানতে গবেষণা করেছি। জেনেছি মটরশুঁটি, ডাল ইত্যাদি ফসলের শেকড়ে গুটি আছে, তাতে ব্যাকটেরিয়া বাস করে। তারা জমির উর্বরতা প্রাকৃতিকভাবেই বাড়ায়। প্রকৃতিতে থাকা নাইট্রোজেনকে জমির গ্রহণ উপযোগী করে। অন্য গাছগুলোতেও আমরা জেনেটিক উপায়ে নাইট্রোজেন গ্রহণের মতো উপযোগী পদ্ধতি তৈরি করতে পারলে সেগুলোও এই ফসলগুলোর মতো প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন নিতে পারবে সে গবেষণা করেছি। তখন এভাবে অনেক কাজও হয়েছে। তবে এত জিন তো গাছে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়, প্রকৃতি গ্রহণও করে না। ফলে গবেষণা পদ্ধতিটি আমাদের দেশে খুব কার্যকর করা যায়নি।
মাকসুদুল আলমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা?
পাটের আণবিক জীববিদ্যা নিয়ে গবেষণা করি। শুরুতে পাটের ডিএন (কোষের ভেতরে থাকা জৈব রাসায়নিক অণু) জানতে পারাই লক্ষ্য ছিল। তখন আমরা মানুষের ডিএনএর গঠন জেনেছি। ফলে গবেষণায় পাট এলো। প্রবাসী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম সাহেব তখন পেঁপের ডিএনএ গবেষণা করছেন। আমার পাট নিয়ে কাজ করার মূল কারণ, তখন ভারত জিনোম ফ্রিকোয়েন্সিতে সক্ষমতা লাভ করেছে। তারাও পাটের প্রচুর আবাদ করে। তারা পাটের ডিএনএ আবিষ্কার করে পেটেন্ট করলে আমরা সেই সুযোগ হারাব বলে এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, মানুষের গর্বের বস্তু পাটের ডিএনএ রহস্য আবিষ্কারের জন্য কাজ করতে শুরু করেছিলাম। আগে থেকে তার অভিজ্ঞতা ছিল বলে দুই পক্ষ ২০০৮ সালে গবেষণাটি নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম, ২০১০ সালে একত্রে কাজ শুরু করলাম। পরে তো পাটের জিনতত্ত্ব আবিষ্কার করলাম।
গবেষণার এখন বিষয়?
গাছের ওপর নির্ভরশীল অণুজীব আছে। মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে বলিÑ আমাদের পেটে কোটি কোটি জীবাণু আছে। আমরা তো জীবাণুর কথা শুনলেই ভয় পাই; এগুলো কিন্তু উপকারী; নানাভাবে শরীর, মনকে প্রভাবিত করে। সুস্থ থাকা না থাকা তাদের ওপর নির্ভর করে। তেমন করে প্রতিটি প্রজাতির গাছেরই নিজস্ব অণুজীব আছে। শেকড়ে এক ধরনের, পাতায় অন্য ধরনের। আগে ভাবতাম এই জাতের গাছের ওই বৈশিষ্ট্য, ওই গাছটি ওই রোগের প্রতিষেধক। কিন্তু এখন আমার গবেষণায় জানছি, অনেক ক্ষেত্রে গাছের সঙ্গে যে অণুজীবগুলো বাস করে তাদেরও সেই গাছের মতো একই বৈশিষ্ট্য থাকে। গাছের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে থাকায় তারাও বৈশিষ্ট্যগুলো বহন করে। এ বিষয়ে কাজ করছি। পাটের ঔষধি গুণ আছে। পাটে কিছু জীবাণু পেয়েছি, যেগুলো ক্যানসার প্রতিরোধক। টেক্সল নামের ক্যানসার প্রতিরোধক বহুমূল্যের ওষুধের উপকরণের সঙ্গে এগুলোর অনেক মিল। শরীরের ক্ষতিকারক জীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। কিন্তু, পাটের ব্যাকটেরিয়াগুলো নতুন অনেক অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতেও তাদের অবদান রাখার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছি। আমার দেশকে এই গবেষণার ফলাফল দেওয়ার বিরাট সম্ভাবনা আছে।
আমাদের গবেষণার সুযোগ কেমন?
এ মুহূর্তে সুযোগ বেশি। গবেষণা খাতে সরকারি বরাদ্দও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আগে আমার অভিযোগ ছিল বরাদ্দের আবেদন করলে প্রায় সবাইকে বরাদ্দ দেওয়া হতো। যদিও টাকার পরিমাণ খুব কম। কেউ ২০ লাখ টাকার আবেদন করলে দুই লাখ পেতেন। তবে এখন আমার উপলব্ধি হয়েছে, অল্প অল্প করে সব গবেষককে বরাদ্দ দেওয়ায় সবার মধ্যেই গবেষণায় আগ্রহ জন্মেছে, এ দেশে গবেষণা কাঠামো তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গবেষণার পরিবেশ হয়েছে।
অন্য দেশগুলোর চেয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় পিছিয়ে কেন?
ভারতে গবেষণায় যেমন আর্থিক বরাদ্দ আছে, আমাদের সেভাবে নেই। পাশাপাশি অনেক নীতি, কৌশলের ব্যাপারও আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা অনেক রাসায়নিক উপাদান সরাসরি কিনতে পারি না, এজেন্টের মাধ্যমে কিনতে হয়। বিমানবন্দরে সময়মতো ছাড়াতে না পারলে সেগুলো নষ্ট হয়। আমদানিকারকরা এই পণ্যগুলোর মূল্যমান, গুরুত্ব, দেশের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় সেসব জানেন না। এভাবে কাজ করতে আমাদের বিপদে পড়তে হয়। গবেষণার নীতিমালার উন্নতি, এ খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের পিছিয়ে থাকার আরও কারণ নিজের উদাহরণ দিয়ে বলি রবি থেকে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল, পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়নে চলে যায়। এসব কাজের অবসরে গবেষণা করি। বাধ্য হয়ে গবেষণার জন্য শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি। আমার গবেষণাগুলো তো অনেক সময় নিয়ে করতে হয়। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষক শিক্ষকদের ক্লাস কম থাকে, তাদের টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে। আমাদের সেই সুযোগই নেই। তাই শিক্ষক ও গবেষকদের এখানে ভালোভাবে গবেষণা করা কঠিন। এ কারণেও অনেক অধ্যাপক গবেষণায় অনাগ্রহী। আগ্রহ থাকলেও সহযোগিতার অভাবে তারা মনমতো গবেষণা করতে পারেন না। এসব কারণে, গবেষকের অভাবে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার পর্যায়ে এখনো বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারেনি। তবে উন্নতি অনেক হয়েছে।
বিএএসের ফেলোর জীবন?
বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসে প্রথম থেকেই অ্যাসোসিয়েট সেক্রেটারি (সহযোগী সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সংগঠনে থাকায় আমি ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হয়েছি। খুব অল্প এই বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানকে দিলেও, তারা আমাকে অনেক দিয়েছেন।
আপনার সফলতায় অবদান?
অনেকেরই আছে। তবে পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিয়ের আগে মেয়ে বলে বাবা এম এ খালেক ও মা খোদেজা খাতুন কোনো দিন আলাদা চোখে দেখেননি। বড় ছেলেদের মতোই এই ছোট মেয়েটিকে সব সময় লেখাপড়ায় উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন আমি চিকিৎসক হই। সেদিকে না যাওয়ায় মন খারাপ করেছিলেন। পরে তো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। প্রবল দেশপ্রেমী এই মানুষটি এক ছেলেকে পাট নিয়ে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় পাঠিয়েছেন। পরে তাকে বলেছিলাম, আমি ভালো করব এবং পাট নিয়ে গবেষণা করব। করেছি, করছিও। বিয়ের পরে স্বামীর সহযোগিতা না থাকলে কখনো এত দূর আসতে পারতাম না। তবে তাদের অনেক বঞ্চিতও করেছি। তাদের আমার আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল। এভাবে পড়ে থেকে কাজ করতে সবাইকে মানা করছি। আমার একটিই সন্তান। কাজ আমাকে আর সন্তান নিতে দেয়নি। সেই অভাব বোধ করি। সৌভাগ্য যে, শাশুড়ি ও ননদরা খুব সাহায্য করেছেন। আমার মেয়ে তাদের কাছেই বড় হয়েছে। সে জন্য গবেষণাগারে আমি বেশি সময় দিতে পেরেছি। একজন পুরুষ যত সহজে পরিবার থেকে আলাদা থাকতে পারেন, নারীরা পারেন না। তখন পুরুষদের বিরুদ্ধে তত অভিযোগ না উঠলেও নারীদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ওঠে। এমন কথাও শুনতে হয়েছে আমি অসামাজিক।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
এখন অবসর খুব কম। যাও পাই, সংসারের কাজ করতে হয়। চাকরি শেষে পরিবারকে সময় দেব। মেয়েটি অভিযোগ করে, ‘মা, তুমি আমাকে খুব সময় দাওনি। অন্তত তোমার নাতিকে একটু দাও।’ নাতিকে সময় দেওয়ার খুব ইচ্ছা হয়। এ বছর অবসরে যাব। ভবিষ্যতে কী করব এখন জানি না, তবে আশা আছে যেহেতু এই আণবিক জীববিদ্যা গবেষণাগারটি পরম যত্নে তৈরি করেছি; মাঝে মাঝে আসব, বসব। এক সহকর্মী এই গবেষণাগারে যুক্ত হয়েছেন। আমার পর তিনি এটি পরিচালনা করবেন। তার প্রয়োজনে পরামর্শ, সাহায্য করব। গবেষণায় এখানে মূল কাজ লেখা। লিখে আন্তর্জাতিক জার্নালে জমা দেওয়া, সেসব অবসরে করতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আশা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার স্বপ্নের শেষ নেই। ছাত্র হয়ে এসেছি, পেশাজীবনও শেষ করছি। অনেক বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আশা করি এই বিশ্ববিদ্যালয় কাটিয়ে উঠবে। এই দেশ ও জাতিকে আলোর পথ দেখাবে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এই ক্যাম্পাসে যারা পড়তে আসেন, তারা সেরা ও মেধাবী। কিন্তু আমার এই গবেষণাগারে তো অন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেও গবেষণার জন্য গবেষকরা আসেন। যারা ‘কিছু করবই’ এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে আসেন, তারাই ভালো করেন বলে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন সেটি কোনো বিষয় হয় না।
ছাত্রছাত্রীদের জন্য পরামর্শ?
এখন খুব প্রচলিত মেধাই হলো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। একসময় প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তিতে দেশগুলোকে ধনী বা গরিব ধরা হতো; এখন মানবসম্পদের ভিত্তিতে তাদের বিচার করা হয়। মেধাই মানবসম্পদ বা মানব উন্নয়নের মূল। মেধা মানেই বিজ্ঞানের আলোকে সেটির ব্যবহার। আমাদের বিজ্ঞান বেশি পড়তে হবে। সেটি যেকোনো শাখার হতে পারে। কারণ সবগুলোই পরস্পরের সঙ্গে মিলেছে। তাই বিজ্ঞানের সব বিষয়ই পড়ার আগ্রহ এই প্রজন্মের থাকা প্রয়োজন।
অনেক স্বীকৃতির মধ্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের অনুভূতি?
আমার কাছে এই সম্মাননার চেয়ে গর্বের আর কিছু নেই, হতেও পারে না। সারা জীবন কাজ করেছি, কোনো দিন ভাবিনি যে এত বড় পুরস্কার পাব। আমার কাজ যে মূল্যায়িত হয়েছে এটি তার প্রমাণ। একটি ভালো স্বীকৃতির প্রয়োজন, মাঝে মাঝে মনেও হয়েছে; কিন্তু স্বীকৃতি পাব ভেবে কখনো কাজ করিনি। কিন্তু পেয়েছি। তাই খুব ভালো লাগছে। এটি আমার জীবনের অন্যতম পাওয়া।
(৯ এপ্রিল ২০১৯, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়)