আমাদের লোকগানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে; বাউলরা শহরের চাপে নিঃশেষ হতে চলেছেন। রশিদ উদ্দিন বয়াতি, উকিল মুনশি, বারী সিদ্দিকী, কুদ্দুস বয়াতিসহ অনেক লোকগায়কের গানগুলোকে আলোয় তুলে আনছে ‘শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচি’। তারা প্রায় হারিয়ে যাওয়া গানও করছেন। মেলা করেছেন নেত্রকোনায়। গান নিয়ে গিয়েছেন ভারতে। যাত্রার প্রবীণ অভিনেতা, বাউল গায়কদের সম্মান জানাচ্ছেন। তাদের নিয়ে লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন কে এম সাখাওয়াত হোসেন
শুরুটি হলো বৈশাখী মেলায়। ১৯৯১ সালে নেত্রকোনা শহরের দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা করলেন তারা। মোবারক হোসেন, আবদুর রাজ্জাক, কামরুল হাসান, অস্ট্রেলিয়ার বাঙালি সুভাষ, শাহীন আক্তার চৌধুরী, বারী সিদ্দিকী, আবদুল আজিজ কালা ও লিটন ধরগুপ্ত পারফর্ম করলেন। ‘গফুর বাদশা-বানেসা পরী’, ‘রূপবান’ পালা হলো। বেদেনীর গান ছিল। দর্শকরা খুব খুশি। উৎসাহিত হয়ে জিয়াউর রহমান খোকন ও আ ফ ম রফিকুল ইসলাম আপেল লোকগানের দল করলেন ‘লোকগীতি গোষ্ঠী’। গায়ক বাউল বিধান সরকার, আবদুল হেকিম বয়াতি, মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ খাঁ। দলটি দত্ত বিদ্যালয়ের মাঠে শহরের প্রথম পৌষমেলা করল। সমন্বয়কারী লোকগীতি গোষ্ঠীর সভাপতি আপেল। সাত দিনের মেলায় ‘জারি’, ‘সারি’, ‘ভাটিয়ালি’, ‘অড়ি’, ‘তামসা’ গান তাদের শিল্পীরা গাইলেন। যাত্রা, রাধা-কৃষ্ণের মাথুরা, কিস্সা পালা করলেন অন্যরা। বারহাট্টা থানার ধীতপুর গ্রাম; অন্যান্য বিভাগের গ্রামের পালাকারদের তারা আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন। শেষদিন বিখ্যাত লোক গায়িকা নীনা হামিদের স্বামী এম এ হামিদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী ও স্বাধীন বাংলা বেতারের কন্ঠযোদ্ধা মলয় কুমারগাঙ্গুলি ছিলেন। তারা গেয়েছেন। পৌষমেলার সুনাম তাদের প্রতি বছর মেলা আয়োজনের দিকে এগিয়ে দিল। তাতে এ দেশের লোকজ ভুবনের সব শাখা নিয়ে কাজ করতে তারা এগিয়ে গেলেন। পরের বছর খোকনের নেতৃত্বে আবার পৌষমেলা হলো সেই একই স্কুল মাঠে। পরিমল রায় মেলা কমিটির আহ্বায়ক, আপেল যুগ্ম আহ্বায়ক। সেটিও সফল। দত্ত বিদ্যালয়ের মার্কেটে আপেলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কংস ট্রেডার্স তাদের গানের দলের অফিস হলো।
পরের মেলাটি তারা আরও বড় পরিসরে করতে আগ্রহী হলেন। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাহায্য নিলেন। আগের মেলাগুলোতে স্থানীয় ও ঢাকার দাতাদের কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছেন। এবার শিল্পকলার সাহায্যে ১৫ দিনের মেলা হলো। পুরো দেশে পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে গেল। বাইরেও গেল। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ডসহ আরেকটি দেশের লোকসংস্কৃতিবিদরা এলেন। লোকগীতি গোষ্ঠীর সুনামও অনেক বাড়ল। আরও কয়েক বছর মেলাটি ভালোভাবে হলো। পরে রাজনীতি ঢুকল। লোকগানের দলের শিল্পী, সংগঠকরা হতাশ হলেন। তারা নিজেদের গোছাতে সংগঠন দাঁড় করালেন। দলের নামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে লাগলেন।
১৯৯৫ সালে ঢাকায় জাতিসংঘের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে গাইলেন, প্রশংসা পেলেন। সে বছরের শেষ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অনুষ্ঠানে গাইলেন। খুব সাড়া পেলেন। এই ভালোবাসাগুলোই তাদের আরও ভালোভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্রেরণা জোগাল। মাটি ও মানুষের আরও গান করতে তারা সংগঠনের নাম বদলে রাখলেন ‘শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচি’। তারা বাউল ও লোকগান করেন, অন্যদের শেখান, পরিবেশন করেন। শুরুতে দু-চারজন শিল্পী ছাত্র পেয়েছেন। দমেননি। পরে অন্য শিল্পীরা লোকগান শিখেছেন। ভিন্ন পেশার মানুষরাও শিখেছেন। বাউল, লোকগানের গায়কদের আখড়া সংগঠনে প্রতি সন্ধ্যায় ১৫ থেকে ২০ শিল্পী অফিসে আসতেন। শহরের মহুয়া মিলনায়তনের দুটি নোংরা ঘর পরিষ্কার করে তারা ব্যবহার করেন। তামসা, বাউলগান শেখেন। যন্ত্রগায়ক বা দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে আসা বাঁশি, একতারা, দোতারা ও বেহালা। শিকড় সভাপতি রফিকুল ইসলাম আপেলের আফসোস হয়Ñ তখন ভালোভাবে শিল্পীদের গড়ে তোলার সুযোগ ছিল না। শুরুতে গানের শুদ্ধ সুর, উচ্চারণ শিখিয়েছেন।
শিকড়ের অফিসে তখন নবীন বারী সিদ্দিকী, কুদ্দুস বয়াতি নিয়মিত গাইতেন। বাউলদের বেশির ভাগই লেখাপড়া করতে পারেননি, ভালো গাইলেও গানের তাল, লয়, উচ্চারণ ভালো জানেন না। শিকড় তাদের অক্ষরজ্ঞান দিল। গানটি শেখা ও ভালো করে পরিবেশন করা জানাল। এই চেষ্টা গোপাল দত্তের খুব ভালো লেগেছিল। তিনি বারী সিদ্দিকীর গুরু। অফিসে এসে শিকড়ের কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে ডেকে বলতেন, ‘তুই গান ধর।’ নিজের লেখা গান এভাবেই তাদের শেখালেন। দুস্থ শিল্পীকে শিকড়ের সভাপতি রফিকুল ইসলামের বাসায় রাখতে হয়েছে, কয়েকজনের রাতের ঠিকানা ছিল অফিস ঘর। সন্ধ্যা থেকে সব শ্রেণির গানপাগল শিকড় অফিসে আসতেন। বয়স্করা নবীনদের শেখাতেন, অন্যরা শুনতেন। এভাবেই শিকড় গজাল।
১৯৯৬ সালের ১১ জুন চৌধুরী মঈনের তত্ত্বাবধানে সার্ক নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সদস্য নেপালের সংসদ সদস্যরা অফিস ঘুরলেন। তাদের সম্মানে লোকগান হলো। শিকড়ের শিল্পীদের তারা খুব প্রশংসা করলেন। ভারতের পশ্চিম বাংলার কলকাতা থেকে অতিথি প্রদীপ চক্রবর্তী আত্মীয়তার সূত্রে এলেন, সঙ্গে স্ত্রী। নেত্রকোনার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মুক্তার উদ্দিনের জীবন নিয়ে স্থানীয় পালাকারের তৈরি কিস্সা পালা (মুক্তা’র পালা) শুনলেন। ভদ্রমহিলা পালাটি দেখে কেঁদেছেন। পরে তার স্বামী তাদের কলকাতায় গান পরিবেশনের জন্য বারাসতের বাণীপুর মেলায় আমন্ত্রণ জানালেন। ১৯৯৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দলনেতা আপেল, সভাপতি খোকনের নেতৃত্বে ২৭ জনের শিকড় দল গেল। বিরাট আয়োজন, এক কিলোমিটার চওড়া মাঠ। পরদিন তাদের সম্মানে মেলায় বাংলাদেশ দিবস ছিল। প্রথম দিন মুক্তা’র পালা, পরদিন লোকসাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে গান করলেন। ৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় আব্বাস উদ্দীন স্মরণসভায় গেলেন, আদিবাসী অনুষ্ঠানও ছিল। সল্টলেকের ডরমিটরিতে ছিলেন।
কর্মশালায় নেত্রকোনার বিখ্যাত বাউল সুনীল কর্মকার, অন্ধ বাউল সিরাজ উদ্দিন পাঠান, আবদুল হাকিম, মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ খাঁ, আবদুল মজিদ তালুকদারের ছেলে আবুল বাশার ভারতের নবীন ও আগ্রহী শিল্পীদের গান শিখিয়েছেন, বাউলগান করেছেন। রতন, জহুরুল আলম স্বপন, সন্তোষ সরকারসহ পুরো দল নেত্রকোনার গাডু (ঘাটের গান নেত্রকোনা অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা হলো গাডু), বাউল, কিস্সা পালা করেছে। কুদ্দুস বয়াতি মুক্তা, বেদেনীর পালা করেছেন। শিশির মঞ্চে তাদের অনুষ্ঠানের দিন আনন্দবাজারে ছাপা হয়েছিল ‘আজকের অনুষ্ঠান : ময়মনসিংহ অঞ্চলের গীতিকা নেত্রকোনার পরিবেশনা।’ আজকালেও খবরটি ছিল। কলকাতার বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোকরাই অনুষ্ঠানটি দেখেছেন। পরে তাদের সল্টলেকে সাত দিনের কর্মশালা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের লোকজ সম্পদের বিষয়ভিত্তিক পরিবেশনার পর রবীন্দ্র ভারতী, বিশ্ব ভারতী, শান্তিনিকেতনসহ কলকাতা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের পর গানগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে, বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর করতে হয়েছে। শিশির মঞ্চের জনসমুদ্রে তারা গান, পালা করেছেন। পরদিন আজকাল লিখেছে ‘বাংলাদেশ থেকে এসেছিল একদল মানুষ।’ মানুষ মানে বাঙালি ও লোকজ সংস্কৃতির উপাদানের বাহক। পাঁচ দিন কলকাতা জয় করে তারা শিকড়ে ফিরলেন। সে বছরের অক্টোবরে কলকাতার আব্বাস উদ্দীন স্মরণ সমিতি আমন্ত্রণ জানাল। ২৭ অক্টোবর সমিতির রবীন্দ্র সদনে অনুষ্ঠান। শিকড়ের ছয়জনে দল কুদ্দুস বয়াতি, আবুল বাসার, নারায়ণ ভৌমিক, রতন, হযরত আলী ও টুটুল গেলেন। বাণীপুরের শিকড় বন্ধু দীলিপদা ও সত্যেন্দ্রদা অনুষ্ঠানে ছিলেন। কুদ্দুস বয়াতির ‘জল ভর সুন্দরী কন্যা/জলে দিছি ডুব’, ‘হাসি মুখে কও না কথা/শুনার নাই কেউ’ পালা গান খুব দর্শক প্রশংসা পেল।
এ বছরের ২৭ মার্চ শিকড় বাউল জেলা নেত্রকোনার শহরের মোক্তারপাড়া মাঠের মুক্তমঞ্চে জেলার প্রথম লোকশিল্পী সমাবেশ, লোক উৎসব করেছে। উৎসবে জেলা ও জেলার বাইরের অসংখ্য বাউল, ভক্তরা এসেছেন। লোকসংস্কৃতিকে বাঁচানো ও নতুনদের কাছে তুলে ধরতেই এ আয়োজন বলে জানালেন সভাপতি আপেল। উদ্বোধন করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মো. আশরাফ আলী খান খসরু এবং প্রধান অতিথি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হাবিবা রহমান খান শেফালী, জেলা প্রশাসক মঈন-উল ইসলাম, পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী, পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম খান, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মতিয়র রহমান খান ও শিকড় সম্পাদক জিয়াউর রহমান খোকন। উৎসবে বাউল সিরাজ উদ্দিন খান পাঠান, সুনীল কর্মকার ও যাত্রাশিল্পী আবদুল রাশিদ নাগর আলীকে শিকড় সম্মাননা দিয়েছে। আয়োজনে বাউল উকিল মুনশি, বারী সিদ্দিকীসহ অনেকের গান পরিবেশিত হয়েছে। সুনীল কর্মকার, সিরাজ উদ্দিন খান পাঠান, আবদুস সালামরাও গেয়েছেন।
এত উদ্যোগ ও সাফল্যে ভরা সংগঠনটি মানুষের দানে চলে। নিজস্ব সৃজনশীলতার জন্য শিকড় যখনই অনুষ্ঠান, সাহায্যের জন্য গিয়েছে, কেউ ফেরাননি। শিকড়ের শিল্পীরা কেউ কোনো অনুষ্ঠানে গাওয়ার জন্য পয়সা নেননি, নিজের খরচে এসে গেয়ে গেছেন। তাদের সবার চাওয়া আমাদের লোকশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবেন। যাত্রার মতো সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে; যাত্রার তো পরিবেশই নেই। যাত্রাকে পরিশোধিত করে তুলতে তারা যাত্রাপালা করছেন।
রাধা-কৃষ্ণের লীলা নিয়ে গাওয়া গাডু গান অপব্যাখ্যায় প্রায় হারিয়েছে। তথ্যনির্ভর, বিষয়ভিত্তিক মালজোরাও হারিয়ে যাচ্ছে। এ গানকে তুলে ধরতে তারা সারা রাত, কয়েক দিনের মালজোড়ার বাহাস (তর্ক) করেছেন। বিচারক ছিলেন। এখন আর তেমন বাউল বিচারক বেঁচে নেই। তার পরও তারা গানগুলোকে বাঁচাতে চেষ্টা করছেন। বিখ্যাত বাউল মমতাজ বেগমও তাদের আসরে গেয়েছেন। তারা সাত দিনের তৃণমূল কর্মসূচি করেছেন ‘নিজের ঢাক নিজে পেটাও, পাড়া-পড়শিকে জানান দাও’ স্লোগানে। তৃণমূল সংস্কৃতিকে তুলে আনতে বারহাট্টার বড়ইতলায় মেলা করেছেন। তাতে ঘোড়দৌড়, মোরগ লড়াই, দাঁড়িয়াবান্ধা ও হাডুডু ছিল; সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
২০০৬ সাল থেকে শিকড় নিজস্ব ভবনে গেল। সেটির ঠিকানা হলো শিকড় ভবন, মোক্তারপাড়া নেত্রকোনা। সেখানে তাদের স্কুল আছে শিকড় সংগীত বিদ্যালয়। আগে রিকশা, ঠেলাগাড়ির চালক, কৃষক, কাঠমিস্ত্রিরা প্রচুর ভর্তি হতেন। এখন তারা বিদেশি চ্যানেল দেখেন। নির্দিষ্ট পেশা ও স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এখন ছাত্র হন। নৃত্যে ২৫, সংগীতে ৬০ জন পড়ছেন। শিক্ষকরা সম্মানী নেন, শিকড়ের অন্য কোনো সদস্য টাকা নেন না। ২০০ টাকা এক মাসের বেতন। গানে অর্ধেক বিনা পয়সায় শেখে; কেউ ১০, ৫০ টাকাও মাসে দেয়। তারা কাউকেই ফেরান না। তাতে গান শেখানোর পদ্ধতির পর লোকসংগীত, নেত্রকোনা ও দেশের বাউলগান শেখানো হয়। রেডিওতে তালিকাভুক্ত নন বলে শিকড়ের শিল্পীরা বিখ্যাত বাউলদের গান গাইতে পারেন না। রশিদ উদ্দিন বয়াতি, উকিল মুনশি, জালাল খাঁ, তালিকাভুক্ত ছিলেন না। তবে তাদের বাদে আর কারও গান জানেন না বলে অনেক দরবারের পর শিল্পীদের নামসহ গাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন বাউলরা।