২০১৭ সালে ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের ১ মাস পর খুন হয় ধর্ষক মাহবুব রহমান। ওই বছর ১৫ ডিসেম্বর রাতে আশুলিয়ার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় মাহবুবের লাশ। ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতেই ওই নারী তার স্বামীকে নিয়ে খুন করে মাহবুবকে। গত ১৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে তারা উল্লেখ করেছে, মাহবুব খুনের মাসখানেক আগে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে হামেদ আলীর বাড়িতে ধর্ষণের শিকার হয় ওই নারী পোশাক শ্রমিক। ধর্ষণের প্রতিশোধ নিতেই খুন করা হয় মাহবুবকে।
মাহবুবের স্ত্রী খাদিজার করা মামলার এজাহারে উল্লেখ হয়েছিল, তাস খেলা নিয়ে বাড়ির মালিক হামেদ আলী এবং প্রতিবেশী একাব্বর আলী, জাকিরুল ও নাজমুলের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। তারাই কৌশলে ডেকে নিয়ে মাহবুবকে হত্যা করে।
আশুলিয়া থানা-পুলিশ হত্যা মামলার কোনো কূলকিনারা করতে না পারায় গত বছর ৮ এপ্রিল মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে উন্মোচিত হলো হত্যারহস্য।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার ওই পোশাক শ্রমিক তার স্বামী শামীমকে (৩৬) নিয়ে ভাড়া থাকত হামেদ আলীর বাড়িতে। পাশের রুমেই থাকত মাহবুব ও তার স্ত্রী খাদিজা বেগম। ওই নারী শ্রমিকের স্বামীর অনুপস্থিতিতে মাহবুব মসলা বেটে দেওয়ার অনুরোধ করে নিজের রুমে ডেকে দুই সহযোগীকে নিয়ে দল বেঁধে ধর্ষণ করে। সংসার টিকিয়ে রাখতে প্রথমে সে ধর্ষণের ঘটনা স্বামীর কাছে প্রকাশ করতে পারেনি। কিছুদিন পর অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বামীকে সব খুলে বলে। সব জেনে নারী শ্রমিককে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় শামীম। তবে ধর্ষণের প্রতিশোধ হিসেবে ধর্ষক মাহবুবকে খুন করলে সংসার টিকিয়ে রাখবে বলে জানায় স্বামী শামীম। এরপর ওই নারী শ্রমিক ও তার স্বামী শামীম মিলে মাহবুবকে খুনের পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নারী পোশাক শ্রমিক কৌশলে মাহবুবকে আশুলিয়া থানার নিশ্চিন্তপুরে লাল পাহাড়ের মোড় নামে একটি জঙ্গল এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা শামীম এবং নারী পোশাক শ্রমিক দুজনেই মাহবুবকে হত্যা করে। এরপর তারা আশুলিয়া ছেড়ে পালিয়ে চলে যায় গাজীপুরে।
জবানবন্দিতে নারী পোশাক শ্রমিক বলে, ‘মাহবুবকে খুন করার মাসখানেক আগে কোনো এক শুক্রবার আমার স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার ঘরে ডাকে মসলা বেটে দেওয়ার জন্য। এ সময় ঘরের মধ্যে আরও দুজন ছিল। আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর তিনজন মিলে পালাক্রমে আমাকে ধর্ষণ করে। এ সময় কক্ষে উচ্চ স্বরে গান চালায় তারা যেন আমার চিৎকার কেউ শুনতে না পারে। আমার সংসার টিকিয়ে রাখতে বিষয়টি স্বামীকে বলিনি। ওই ঘটনার পর আরও তিনবার আমাকে ধর্ষণ করে।’ সে আরও বলে, ‘মাহবুবের নির্যাতন বেড়েই চলে। পরে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে সব খুলে বলি স্বামীকে। তখন সে আমাকে বলে মাহবুবকে খুন করতে হবে। না হলে সংসার করবে না আমার সঙ্গে। এরই মধ্যে মাহবুব আবারও আমাকে কুপ্রস্তাব দেয়। আমি মাহবুবকে কৌশলে জঙ্গলে ডেকে নিয়ে খুন করি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সালেহ ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি প্রথম থেকেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। তদন্ত করে দেখা গেছে মামলার বাদী মাহবুবের স্ত্রী ঘটনার সময় ভাড়া বাসার মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য। এ কাজে তাকে সহায়তা করে মামলার ওই সময়কার তদন্ত কর্মকর্তা।’
তিনি বলেন, ‘একটি ফোন কলের সূত্র ধরেই মূলত মামলার মূল আসামি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। মাহবুব খুন হওয়ার কিছু সময় আগেই ওই নম্বরে কথা বলে। এরপর আর কখনই নম্বরটি ব্যবহৃত হয়নি।’ উল্লেখ্য, পোশাক শ্রমিক মৃত মাহবুব কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর থানার হোকডাঙ্গা দালালপাড়া গ্রামের জাহিদ আলীর ছেলে। তার স্ত্রী খাদিজা বেগম ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় চারজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করলেও তদন্তকালে তাদের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় মামলাটি একটি ক্লুলেস মামলায় পরিণত হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে আসামিদের শনাক্ত করা হয়।