মাহমুদুল হাসানের স্বপ্ন মিশে আছে এই স্কুলে। সম্ভাবনা নামের একটি পথের শিশু স্কুলের শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন অনেক আগে।শখের সেই কাজ তার এখন নৈতিক দায়িত্ব হয়েছে। তাদের দোয়েল স্কুলে আছে ১১০ জন ছাত্রছাত্রী। স্কুলটি ঘুরে তার জবানে লিখেছেন আসিফ আল আজাদ
তখন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (ডাব্লিুইউবি) ব্যাচেলর অব ইংলিশে তৃতীয় বর্ষে পড়ি। ঢাকায় ধানমন্ডিতে বন্ধুদের সঙ্গে থাকি। গ্রামের ছেলে তো, ধানমন্ডি লেকের গাছ, পুকুর ও নীরব পরিবেশের সঙ্গ পেতে পেতে সেই পথ ধরে এগিয়ে চলি। পরে বাসে উঠে চলে যাই ধানমন্ডির ৮/এ’র ক্যাম্পাসে। লেকে দেখি, দুপুর-বিকেলে পথের শিশুদের পড়ান কয়েকটি ছেলে। আগ্রহ হলো, জানলাম, তারা আমার সিনিয়র; রবীন্দ্র সরোবরের মুক্ত মঞ্চের সিঁড়িতে শিশু-কিশোরদের পড়ান। ওদেরও খুব লেখাপড়ার খেয়াল। তাই পরিচিত হতে সময় লাগল না। আরিফ ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হলো। কম-বেশি ঘনিষ্ঠতা হলো। একদিন ইচ্ছের কথা জানিয়ে দিলাম, আপনাদের সঙ্গে শিশুদের পড়াব। তিনি রাজি। তাদের এই সংগঠনের নাম ‘সম্ভাবনা’। ধীরে ধীরে ছাত্রদের মতো নিয়মিত হয়ে গেলাম। বেশ দূরে দূরে থাকেন বলে, শিক্ষকরা নিয়মিত আসতে পারেন না। ফলে ২০১৩ সালে আমিই হয়ে গেলাম নিয়মিত শিক্ষক। তবে শিক্ষকের অভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেল। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। কতদিন কত অসুবিধা সয়ে ক্লাস করিয়েছি; মনে পড়ে গেল। পথশিশুদের পথের ভুবন আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ওদেরও আছে স্বপ্ন। লেখাপড়া করার সাধ। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য ২০১৪ সালে শুরু করলাম আমাদের ‘দোয়েল স্কুল’। জাতীয় পাখি এটি; শিশুরা বড় হয়ে সমাজের মূল স্রোতে মিশে যাবে বলে স্কুলের এই নামটি দেওয়া। শুরু হলো ধানমন্ডির সেই আগের জায়গায়। খুব সাহায্য করলেন আশফাক জামান ও তানভীর ইসলাম। ১৬-১৭টি শিশু-কিশোর পড়ালেখা করছে এই দৃশ্যটি লেকে ঘুরতে আসা তরুণ-বৃদ্ধদেরও খুব ভালো লাগত। তারা কোনো কোনো সময় জন্মদিনের কেক নিয়ে এসে ওদের সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। তবে ছাত্রছাত্রীদের কোনো ঠিকানা নেই। আশপাশের এলাকার নিম্নবিত্ত পরিবারের ওরা। তাদের মুখেই লেখাপড়ার গল্প ছড়াল। রায়ের বাজার বস্তির শিশুরা আমাদের বেশিরভাগ ছাত্র হলো; মেয়েরা সকাল থেকে লেকে ফুল বিক্রি করতে আসে; ছেলেরা পানির বোতল বিক্রি করে, কেউ ভিক্ষা করে; সারা দিন ঘুরেফিরে বিকেলে চলে যায়; আমরা ক্লাস শেষে তাদের বিকেলে বাড়ি যাবার আগে পড়াই। আস্তে আস্তে দোয়েল বড় হলো; আমরা খাবার দেওয়া শুরু করলাম; তাদের চিকিৎসার জন্য মেডিকেল ক্যাম্পও করেছি। ঈদের সময় নিজেরা, বন্ধুরা মিলে নতুন পোশাক দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। রবীন্দ্র সরোবর থেকে চলে এলাম রায়ের বাজারের ব্যাচেলর পয়েন্টে। অনেকগুলো ভাসমান পরিবার বাস করে সেই এলাকায়। আমাদেরও বন্ধু বেড়েছে। আমাদের ওয়ার্ল্ড, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের বন্ধুরা সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
পথচলতি মানুষ আমাদের এই শিক্ষা কার্যক্রম দেখে উৎসাহিত হয়ে খাতা-পেন্সিল-বই; ভদ্রমহিলারা খাবার; কেউ নগদ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। আমরা সাহায্য নিতে কার্পণ্য করিনি। নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে তো খুব বেশি এগুতে পারি না। বাড়ি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তো আমাদের মতো ছাত্রদের দেওয়া হয় না। তাতে স্কুলের ছাত্রদের পাশাপাশি তাদের মা, খালা, বোনদের অক্ষর শেখাই। একপাশে ছোটদের ক্লাস হয়, অন্যদিকে বড়দের। ২০১৫ সাল থেকে পুরো দুটি বছর সেখানে ছিলাম। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আমাদের শিক্ষক হয়েছেন। স্কুল পাঠের পাশাপাশি কন্যাসন্তানের বিয়ের কুফল, জরুরি রোগ প্রতিরোধসহ নানাকিছু শেখানোর চেষ্টা করি। কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয় বা পরিচিত কর্মজীবী বড় আপু এসে তার জীবনের গল্প বলে মা-বোনদের উদ্দীপ্ত করেন। সমাজকে ভালোর দিকে নিয়ে আসতে চান। তাদের সচেতন করতে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। সেটি মাঝেমধ্যে পাঠ হতো ‘মিথ্যা কথা বলব না/অসৎ পথে চলব না।/বন্ধুকে আর মারব না/পড়ার সময় খেলব না।/কাউকে গালি দেব না/গাড়িতে ঢিল ছুড়ব না।’ কবিতাটি ওদের জীবনের অংশ বলে খুব পছন্দ করে ফেলেছিল। খুব সুন্দরভাবে, দুলে দুলে ছোট্ট বন্ধুরা কবিতাটি বারবার পড়ত। তাদের চোখমুখ কী যে উজ্জ্বল!
এই মানুষদের পথে নয়, স্কুলের পরিবেশে পড়াতে হবে ভেবে আশপাশের স্কুলে বিকেলে পড়ানোর জায়গা খুঁজতে গেলাম। কিন্তু ছাত্র বলে নিয়মিত পয়সা দিতে পারব কি না স্কুলগুলোর কর্তৃপক্ষের সেই ভয়ে স্কুল পেলাম না। এক-দেড় মাস ঘুরে জায়গা হলো না। শেষে খুঁজতে খুঁজতে ২০১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি জেড এইচ শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পাশে একটি ঘর ভাড়া পেলাম। পাশের বস্তির বড় ছেলেমেয়েরাও স্কুলে যায় না দেখলাম। বস্তি থেকে স্কুলে অনেক ছাত্রছাত্রী আসবে ভেবে খুব উদ্যমে কাজ শুরু করলাম। মাসে ভাড়া গুনতে হবে আড়াই হাজার। ছোট্ট ঘরে পুরনো-নতুন মিলিয়ে ৪০-৫০ জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে শুরু হলো। তিন মাস নতুন পরিবেশে তাদের মানাতে খুব কষ্ট হয়েছে। আস্তে আস্তে তারা স্কুল ভালোবেসে ফেলল। পুরো বছর দোয়েল স্কুল চলেছে। তবে দোতলার সরু সিঁড়ি বেয়ে স্কুলের ঘরে হয় বলে শিশুরা পড়ে যেতে পারে বলে মেডিকেলের পাশে হাজারীবাগের বৌবাজারে চার ঘর নিয়ে নতুন করে স্কুল শুরু করতে হলো। ছাত্রছাত্রী, সাহায্যও বেড়েছে। উদ্বোধন করলেন আমার কর্মস্থল চ্যারিটি রাইটের এদেশীয় প্রতিনিধি আশফাক জামান। আগের শিক্ষকরা বিশ^বিদ্যালয়ের পড়া ফেলে নিয়মিত সময় দিতে পারেন না বলে পাঁচজন শিক্ষক আছেন। তারা মাসে ১৫শ টাকা করে সম্মানী নেন। ১৬ হাজার টাকা স্কুল ভাড়া দিতে হয়। বেঞ্চ আছে। সব মিলিয়ে মাসে ২৬ হাজার খরচ। প্রতিদিন দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস হয়। দুই মাসে একবার অভিভাবক সভা হয়। ছাত্রছাত্রীদের স্কুলব্যাগ আছে। রুমগুলোর ভেতরে পাখি, ফুলের ছবি, কার্টুন এঁকে মানবিক পরিবেশ দিয়েছি। এখন মোট ১১০ জন ছাত্রছাত্রী আছে। প্রায় সবাই পড়তে আসে। তাদের মেডিকেল ক্যাম্প হয়। গেল কুরবানিতে তাদের পরিবারগুলোকে নিয়ে আমরা গরু কুরবানি দিয়ে ঈদ করেছি। ফিনল্যান্ডের তানভীর হেদায়েত ভাই টাকা দিয়েছেন। এতিম শিশুদের জন্য আমি নিজে মাসে পাঁচ কেজি করে চাল দিতে চেষ্টা করছি, যাতে তারা খেয়ে বাঁচতে পারে।
ঢাকার বারিধারার প্লে-পেন স্কুলের শিক্ষক নাজনীন ইসলাম আর্থিক সাহায্য করেন। আঞ্জুমান আরা তন্নি অনুষ্ঠানে, উপলক্ষে শিশুদের খাওয়ান। যুক্তরাষ্ট্রে বাস করা হাশেম রেজা ভাই ওদের খাতা-কলম কিনে দিয়েছেন। নাজনীন ইসলাম, সালমা ইসলাম, ডা. সাদেকা ইসলাম ও আঞ্জুমান আরা আন্টি মাসে ১৫শ টাকা করে দেন। তাতে চার শিশুর পড়ার খরচ চলে। এই শিশুরাও মেধাবী। রাব্বির বাবা কাগজ কুড়ান। তার ছেলে যেসব খাতায় এঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সে ছবিগুলো দেখে হুবহু আঁকতে পারে। নিজে চাকরি করে যে টাকা পাই, অর্র্ধেক স্কুলে দিই। স্কুলকে এসএসসি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। এখন শিশু থেকে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়।
আমরা মা-বাবাকে ছেলেমেয়েদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর তাগিদ দিই। তাদের পড়ার খোঁজ নিতে অনুরোধ করি। আমরা সবগুলো জাতীয় দিবস পালন করি। আমাদের ছবি আঁকা, খেলার ক্লাস হয়। জাতীয় শোক দিবস ও সেটির তাৎপর্য তুলে ধরি। আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মোরগ লড়াই, হাঁড়িভাঙা, ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। নৈতিক শিক্ষার ক্লাস হয়। নাচ, কবিতা শেখানো হয়।
আমাদের প্রোগ্রেস রিপোর্ট আছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে মেয়েরাই বেশি পড়তে আসে। স্কুলে সবাই নিয়মিত আসছে কি না, আমরা সেই খোঁজ রাখি। আমাদের বড় ভাই, আপুরা মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে সাহায্য করেন। সুমাইয়া মৌ আপু রোগীদের ওষুধ সরবরাহ করেন। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পোশাক দেয় ‘সামাজিক জীব’। ফেইসবুকে ইভেন্টের আগে প্রচারণার মাধ্যমে সহযোগিতা পাই। নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবীই আমাদের প্রাণ। এই মার্চে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সোশ্যাল সার্ভিস ক্লাব দোয়েল স্কুলের ১শ ছাত্রছাত্রীকে খাতা, বই, কলম দিয়েছে। তাতে ওরা সবাই খুব খুশি। ওদের স্বপ্ন তৈরি হচ্ছে।
আমাদের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী খাদিজার গল্পটি বলি। সে রিকশাচালকের মেয়ে। বাবা রোগে প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। মা অন্যের বাড়ির গৃহকর্মী। তিনবেলা ভালোভাবে খেতে না পারলেও এই মেয়েটি বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র জাহিদ দাদির কাছে থাকে। সে বড় হয়ে পাইলট হয়ে পুরো বিশ্ব ঘুরবে। এই স্কুলকে সাহায্য করতে চাইলে আমাকে ০১৬১২ ৪০২৭৭৯ নম্বরে ফোন করতে পারেন। ফেইসবুকে আমাদের
পাবেন www.facebook.com দোয়েল-স্কুল’ নামে।