নবযুগে ভারতের আইন

অরুন্ধতী কাতজু ও ড. মেনকা গোস্বামী ভারতের সুপ্রিম কোর্টে অপরাধ, সমকামিতা, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি ও মানুষের অধিকারের মামলায় লড়ছেন। এই দুই তরুণ আইনজীবীর মাধ্যমে অনেক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আদালত। তাদের নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ

অরুন্ধতী কাতজু

অরুন্ধতী কাতজুর জন্ম ভারতের এলাহাবাদে, ১৯৮২ সালের ১৯ আগস্ট। মা ও বাবা গীতা-বিবেক কাতজু। নয়াদিল্লির এয়ারফোর্স বাল ভারতী স্কুল থেকে তিনি সিনিয়র স্কুল পাস। ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির ব্যাঙ্গালুরু ক্যাম্পাসে বিএ এলএলবি (অনার্স)। ভারতীয় বারে ২০০৫ সালে তালিকাভুক্ত হন, সিনিয়র অ্যাডভোকেট সিদ্ধার্থ লুথরার চেম্বারে যোগ দেন। সেখানে অপরাধীর আত্মরক্ষা বিষয়ক আইনজীবী হিসেবে পাঁচ বছর আইন অনুশীলন করেন। আইনকে ভালোর জন্য ব্যবহারের পক্ষের মানুষ হিসেবে তখন ২জি স্পেকট্রাক বিবারি বা (ঘুষ) মামলা, জেসিকা লাল খুনের মামলা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ক্যাশ ফর কোশ্চেনস এক্সপোজে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০৭ সালে দিল্লির জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কমিটির অন্যতম অভিযোগ দায়েরকারী ছিলেন। ২০১১ সালে নয়াদিল্লিতে নিজের চেম্বার শুরু করেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্টে তার অনুশীলনের ক্ষেত্রগুলো অপরাধী, সুশীল সমাজ, সাংবিধানিক আইন ও সালিশ-নিষ্পত্তি। ১১ বছর ভারতের আদালতে আইন পেশার অনুশীলনের পর ২০১৭ সালে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে এলএলএম প্রোগ্রামে তালিকাভুক্ত হন। সেখানে তিনি মানবাধিকার গবেষক, জেমস কেন্ট স্কলার ছিলেন এবং পাবলিক ইন্টারেস্ট অনারারি হিসেবে কাজ করেছেন। ফিনকেলস্টেইন ফেলো হিসেবে ভারতের অপরাধ ও সংবিধানের আইনের ওপর ডক্টরাল রিসার্চ করেন। দেশে ফিরে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তিনি ভারতের প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে নানাভাবে কাজ করেন।

উল্লেখযোগ্য মামলা

২০১৬ সালের বিখ্যাত নভজিৎ সিং জোহার ভার্সেস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার প্রধান আবেদনের খসড়াটি তার করা। অসংবিধানিক বলে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ‘সেকশন ৩৭৭’ তুলে নিতে আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মামলা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি তিনি এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বায়োসেকচুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার) অধিকার আদায়ের মামলাগুলো দায়ের করেছেন। সেগুলোর অন্যতম সুরেশ কুমার কৌশাল ভার্সেস নাজ ফাউন্ডেশন।

২০১৩ সালের এ মামলার মাধ্যমে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট যৌনাচরণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে রায় দেন। মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে উপস্থাপনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের হয়ে তিনি লড়েছেন। দিল্লির আদালতে শিবানী ভাট বনাম জিএনসিটি (গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি অব দিল্লি) অ্যান্ড আদার্স মামলারও তিনি আইনজীবী। এই মামলায় তিনি শিবানী ভাটের পক্ষে আদালেতে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯ বছরের নারী থেকে পুরুষ হওয়া এই রূপান্তরিত মানুষটিকে প্রতারণার উদ্দেশ্যে তার মা-বাবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন।

পরে তিনি ভাটের পক্ষে তাকে হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া এবং তার যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যাবার অধিকারের পক্ষে আদেশ দেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন দাখিল করেন। সেই আলোচিত মামলায় আদালত শিবানী ভাটের পক্ষে আদেশ দান করেন এবং বলেন, তার ভ্রমণের প্রমাণাদিগুলো অবশ্যই তার মা-বাবাকে ফেরত দিতে হবে যাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের জন্য যেতে পারেন। আদালত দৃঢ়ভাবে তার সংকল্প, ভ্রমণ ও শিক্ষার অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এভাবে বাণিজ্যিকভাবে আইন পেশার অনুশীলনের পাশাপাশি কাতজু তিন বছরে দিল্লি হাইকোর্ট লিগ্যাল সার্ভিসেস কমিটির কাছে প্রায় ১শ গরিব মক্কেলের অপরাধ বিষয়ে আবেদন ও তাদের হয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তাদের মামলাগুলো ছিলÑ ধর্ষণ, খুন, শিশু যৌন নির্যাতন, মাদকের অভিযোগ ইত্যাদি।

অপরাধ বিষয়ে আইনজীবী হিসেবে তার অসামান্য দক্ষতার কারণে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চুরি, পণ দিতে না পারায় বধূ হত্যা ও খুনের অনেক মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট তাকে অ্যামিকাস কিউরি বা আদালতের বন্ধু হিসেবে হিসেবে নিয়োগ করেছে। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে আইন পেশার অনুশীলনের জন্য যান।

ড. মেনকা গোস্বামী

তার জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৭ নভেম্বর। ৪৪ বছরের এই বিখ্যাত  আইনজীবীর বাবা মোহন গোস্বামী। ভারত সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক পরামর্শক। মা মীরা গোস্বামী। মেনকার প্রাথমিক লেখাপড়ার শুরু হায়দ্রাবাদ পাবলিক স্কুলে। এরপর নয়াদিল্লির সর্দার প্যাটেল বিদ্যালয় থেকে হাই স্কুল পাস করেন। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল স্কুল অব ল’ থেকে ১৯৯৭ সালে বিএ, এলএলবি অনার্স।

বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে রোডেস স্কলারশিপের অধীনে বিসিএল (ব্যাচেলর অব সিভিল ল’) পড়ার জন্য ২০০০ সালে চলে যান। ২০০১ সালে হার্ভার্ড ল’ স্কুল থেকে গ্যামন ফেলোশিপে এলএলএম ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কনস্টিটিউশনালিজম ইন ইন্ডিয়া পাকিস্তান অ্যান্ড নেপাল (সংবিধানের অনুগামী ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের সরকার ব্যবস্থা) থিসিসের ওপর পিএইচডি লাভ করেন।  

পেশা

১৯৯৭ সালে বারে যোগদানের মাধ্যমে মেনকা আইন পেশা শুরু করেন। তখন তিনি ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল অশোক দেশাইয়ের সঙ্গে কাজ করতেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে তার যোগদানের মাধ্যমে হোয়াইট কালার ডিফেন্স (সরকার ও ব্যবসায়ীদের করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অহিংস অপরাধ), সাংবিধানিক আইন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন এবং উঁচু শ্রেণির সালিশ-নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আরও ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়। তিনি ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগালের পক্ষে ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়ান। আলোচিত সেই মামলাটি ছিল সুরেশ কুমার কৌশল ভার্সেস নাজ ফাউন্ডেশন। এই মামলায় তার সঙ্গে অরুন্ধতীও ছিলেন।  

আমলাতন্ত্র সংস্কার মামলা

আলোচিত এ মামলাটি ছিল টি এস আর সুব্রামানিয়াম অ্যান্ড আদার্স ভার্সেস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব সুব্রামানিয়াম ও ৮০ জন উচ্চপদস্থ অবসর নেওয়া আমলা ভারতের আমলাতন্ত্রের অনেকগুলো সংস্কারে উদগ্রীব ছিলেন। তাদের দায়ের করা মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত দানের পাশাপশি এই নির্দেশও জারি করেন যে, সরকারের সদস্যদের মৌখিক নির্দেশ পালন করার জন্য ভারতের আমলারা বাধ্য নন, তারা অবশ্যই লিখিত নির্দেশের ওপর আস্থা রাখবেন। এই মামলায় আরও নির্দেশ জারি করা হয়, সিনিয়র আমলাদের মাধ্যমে সিভিল সার্ভিস বোর্ড তৈরি করতে হবে। সেটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় থেকে রাজ্য সরকার পর্যন্ত কাজের ভিত্তিতে বদলির বিষয়গুলো অবশ্যই দেখতে হবে।

শিক্ষার অধিকারের মামলা

এই আলোচিত মামলায় তিনি ছিলেন মধ্যস্থতাকারী। আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের পক্ষে ছিলেন। মামলাটির নাম ছিল ‘সোসাইটি ফর আনএইডেড প্রাইভেট স্কুলস ইন রাজস্থান ভার্সেস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’। তাতে যেসব শিশু কোনো ধরনের সাহায্য পায় না, পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, তেমন শিশুদের এই ধরনের স্কুলের ২৫ ভাগ রাখতে হবে। তাছাড়াও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর, কর্মজীবী শিশুদের লেখাপড়া করার ব্যবস্থা সরকারকে করে দিতে হবে বলে আদালত নির্দেশ জারি করেন।

সালওহা জুডহ্যাম মামলা

এই মামলায় তিনি ছিলেন আইনজীবীদের দলের একজন সদস্য। তারা স্টেট আমর্ড পুলিশ ফোর্সেসের কর্মকর্তাদের আদিবাসী যুবকদের মাওবাদী বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার রীতি খর্ব করে আইন চালু করেন। আদালত তখন নিদের্শ দেন বাধ্য হয়ে অস্ত্র হাতে নেওয়া এই যুবকদের অবশ্যই নিরস্ত্র করতে হবে, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

আগস্ট ওয়েস্টল্যান্ড ভিভিআইপি কপার স্কাম্প

অগুস্তা ওয়েস্টল্যান্ড দুর্নীতি মামলাটিতে মধ্যস্বত্বভোগী এবং ভারতীয় অফিসাররা হেলিকপ্টার কেনার সময় অবৈধ অর্থ নিয়েছিলেন। ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান মার্শাল এসপি তিয়াগির পক্ষে ওকালতি করেন মেনকা। এরপরই সিবিআইয়ের একটি বিশেষ আদালতে যান এই বিমান কর্মকর্তা। তার সঙ্গে অরুন্ধতি কাতজুও এই মামলায় আইনজীবী ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর জামিনের জন্য আদালতে লড়ে জয় পেয়েছিলেন মেনকা। ২০১৮ সালে তার বিপক্ষে চার্জশিট ফাইল করা হয়েছে। মামলাটি এখন অমীমাংসিত।

আদালতের বন্ধু

২০১২ সালের আলোচিত সেই মামলাটি ছিল ভারতের মণিপুর অঙ্গরাজ্যে বিচারবহির্ভূতভাবে ১৫২৮ জনকে হত্যার মামলা। তাতে তিনি অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন। আইনজীবীদের সঙ্গে প্রস্তাব করেন, এই হত্যাকান্ডের শিকার মানুষদের মৃত্যুর তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্ত দল তৈরি করা হোক। ২০১৬ সালে তার ও আবেদনকারীদের যুুক্তিতে সম্মত হয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই বেঞ্চ আদেশ দেয় স্টেট আর্মড পুলিশ ফোর্সেসের এই অতিরিক্ত ক্ষমতার ব্যবহার ব্যাপকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে তদন্ত করতে হবে।

২০১৭ সালে এই হত্যাকান্ডের বিচারে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠনের জন্য আদালত নির্দেশ দেন। তারা দ্রুত চার্জশিটের ফাইল জমা দানেরও নির্দেশ দেন। মামলাটি এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।   

সম্মান ও সম্মাননা 

এই বছরের জানুয়ারিতে প্রথম ভারতীয় হিসেবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির রোডেস হাউসে তার প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে।