বহুল আলোচিত ২০০ মেডিকেল অফিসার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। পরীক্ষা হওয়ার এক মাস ২০ দিন পর গত রবিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ এই লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পরদিন গতকাল সোমবার সকাল থেকেই লিখিত পরীক্ষায় নানা অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকে। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) অনুত্তীর্ণ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়মের
অভিযোগ এনে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন ও বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা উপাচার্যের পদত্যাগ ও ফল বাতিলের দাবিতে স্লোগান দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের বিভিন্ন দেয়ালে ‘ছেলের জন্য সাজানো নিয়োগ, লজ্জা, ভিসি লজ্জা, ভিসির পদত্যাগ চাই! অর্থের বিনিময়ে এই নিয়োগ মানি না, মানব না, প্রশ্ন ফাঁসের এ নিয়োগ কাদের জন্য, আমাদের সংগ্রাম চলছে, চলবে ইত্যাদি স্লোগান লেখা পোস্টার সাটান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাস ও ভিসির কার্যালয়ের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দুপুরের দিকে ক্যাম্পাসে গেলে দেখা যায় বিশ^বিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেয়াল থেকে পোস্টার তুলছেন। ভিসির কার্যালয়ের গেট ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। গেটের সামনে পুলিশ ও বিশ^বিদ্যালয় নিরাপত্তাকর্মীরা বসে আছেন। ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের আগেই উত্তীর্ণ ও অনুত্তীর্ণদের নাম ও রোল নম্বর, এমনকি কে কত নম্বর পেয়েছে সে তথ্য গত কয়েক দিন ধরেই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়–য়া দেশ রূপান্তরের কাছে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মেশিনে খাতা কাটা হয়েছে। কম্পিউটারে মেধার ভিত্তিতে রেজাল্ট হয়েছে। সমস্ত নিয়ম মেনে পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি। দুর্নীতি হয়নি। বিশ^বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের ছেলেমেয়েরাও উত্তীর্ণ হননি। চান্স না পেয়ে ক্ষোভ থেকে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।
নিজের ছেলের উত্তীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ও (সুব্রত বড়–য়া) মেধার জোরেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এখানে বাবা হিসেবে আমি কোনো প্রভাব খাটাইনি। ও এখানে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেছে। খুবই ভালো রেজাল্ট।
এই পরীক্ষার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কনসার্নÑ উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি জানেন। তিনি কনসার্ন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী সব হয়েছে। উনি চেয়েছেন মেধাবীরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ পাক। সেভাবেই হয়েছে।
স্বাচিপের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. আবদুুল আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাইনি দলীয়ভাবে নিয়োগ হোক এখানে। কোনো চাপও দিইনি বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনকে। যারা মেধাবী তারা সুযোগ পেয়েছেন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের বোঝাচ্ছি। ওরা যেন কোনো অপ্রীতিকর কিছু না করে।’
স্বাচিপের কেন্দ্রীয় ও বিশ^বিদ্যালয় শাখার একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উত্তীর্ণদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন স্বাচিপের তালিকাভুক্ত পরীক্ষার্থী। স্বাচিপের এই গ্রুপের সঙ্গে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের ভালো সম্পর্ক। উত্তীর্ণদের মধ্যে বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়–য়ার ছেলে সুদীপ বড়–য়াসহ তিন আত্মীয় এবং উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমানের দুই আত্মীয় রয়েছেন। বাকিরা স্বাচিপের এক পক্ষের তালিকাভুক্ত। এ ছাড়া স্বাচিপের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে এবার আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দেওয়া তালিকার পরীক্ষার্থীরাও উত্তীর্ণ হয়েছেন। এর ফলে স্বাচিপের নেতাদের মন খারাপ।
অবশ্য গতকাল বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন স্বাচিপের কেন্দ্রীয় নেতাদের ভবিষ্যতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই স্বাচিপের থেকে চিকিৎসক নিয়োগের আশ^াস দিয়েছেন বলে স্বাচিপের এক কেন্দ্রীয় নেতা জানান। তিনি বলেন, বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্য বলেছেন, ভবিষ্যতে স্বাচিপের ছেলেমেয়েরা নিয়োগ পাবেন।
বিশ^বিদ্যালয়ের এক প্রভাবশালী স্বাচিপ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২২ মার্চ লিখিত পরীক্ষা হয়। এর তিন দিন আগে প্রশ্নপত্র খোলা হয়েছিল। ওই সময় স্বাচিপের এক নেতা ও বিশ^বিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এই নেতা আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার পর সেদিন বিকেলেই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা। কিন্তু তা না করে এক মাস ২০ দিন পর ফল প্রকাশ করা হলো। এসব বিষয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
‘এমনকি ফল প্রকাশের এক সপ্তাহ আগে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাচিপের এক কেন্দ্রীয় নেতাসহ চারজনের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন’Ñ জানিয়ে স্বাচিপের এক নেতা বলেন, ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল স্বাচিপের যোগ্য চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু তা না করে স্বাচিপের বাইরের চিকিৎসকদের উত্তীর্ণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ বিএমএ ও স্বাচিপ নেতারা গতকাল দুই কার্যালয়েই তালা মেরে দিয়েছেন। তারা সেখানে সংগঠনের কোনো নেতাকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না।
স্বাচিপ নেতারা জানান, এখানে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। বর্তমান দফায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কিছু চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছেন। তাই ২০১৬ সাল থেকে চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিল স্বাচিপ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীরা তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসক নিয়োগে অনুরোধ জানায়। এমনকি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সে সময় তাকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ^বিদ্যালয়ের পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুই সপ্তাহের মধ্যে ২০০ মেডিকেল অফিসার নিয়োগের ঘোষণা দেন তিনি। ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এ সময় স্বাচিপের চার গ্রুপ এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা মিলে মোট ১ হাজার ৮০০ জনের নাম দেন প্রশাসনের কাছে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ২০টি মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পরীক্ষা ছাড়াই তাদের নিয়োগ দিতে উপাচার্যেও ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এমনকি তারা এ কথাও বলেন যে, পরীক্ষা হলেও তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বরের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সে সময় কয়েক দফা উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন ছাত্রলীগ ও স্বাচিপ নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। পরে গত ২২ মার্চ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের দুটি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুত্তীর্ণরা দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, এমনিতেই পরীক্ষা কয়েক দফা পেছানো হয়েছে। তারপর বহু প্রতীক্ষিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় গত ২২ মার্চ। সেই পরীক্ষায়ও হয়েছে নানা অনিয়ম। পরীক্ষার হলে কেউ কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বিষয়টি হল পরিদর্শকদের জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনটি কক্ষে মেডিক্যাল অফিসারদের প্রশ্নপত্রে ডেন্টাল সার্জনদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া পরীক্ষার ফল কবে প্রকাশ করা হবে সে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত না করলেও পরীক্ষায় কারা পাস করেছে এবং কত নম্বর পেয়েছে, সেগুলো সবার মুখে মুখে শোনা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরীক্ষার্থী জানান, ফল প্রকাশের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদস্থ কয়েকজন ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এদের মধ্যে একজনের পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর ৯২। একই পশ্নে মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টাল সার্জনদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সে বিষয়েও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানা যায়নি।
ফল প্রকাশ : লিখিত পরীক্ষায় ৮ হাজার ৫৫৭ জন চিকিৎসক অংশ নেন। পরীক্ষায় ১ পদের জন্য ৪ জনকে পাস করানো হয়। ৭১৯ জন মেডিকেল অফিসার ও ডেন্টালের ৮১ জন মিলে মোট ৮২০ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে ৫০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে মৌখিক পরীক্ষার তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।