ঝুলে আছে অনুদানের ২৫ সিনেমা

বাংলাদেশ সরকার মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অনুদানের প্রথা চালু করে। যদিও মাঝখানে বিভিন্ন কারণে অনুদান প্রদান করা বন্ধ ছিল। এরপর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে নিয়মিতভাবেই চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। শুরুর দিকে ছবি প্রতি ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হলেও ২০১০ সাল থেকে বাড়িয়ে ৩৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়াও অনুদানপ্রাপ্ত পরিচালকরা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) থেকে ১০ লাখ টাকা সমপরিমাণের কারিগরি সহযোগিতা পেয়ে থাকেন।

তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নয় বছরে প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মুক্তি পেয়েছে মাত্র ২০টি ছবি। বাকি ৩০টির মধ্যে অধিকাংশ ছবি মুক্তির বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ বিষয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের অনুদান পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই সঠিক সময়ের মধ্যে নির্মাণ হয় না। অনুদানের অর্থে নির্মিত ছবিগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার শর্ত থাকলেও পরিচালকরা ব্যর্থ হচ্ছেন।’

এই যখন চিত্র তখন স্বাভাবিকভাবেই অনুদানপ্রাপ্ত পরিচালকদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও কাজের পরিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে অনুদানের টাকা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে তথ্য মন্ত্রণালয়, যথাসময়ে ছবি নির্মাণে আর কিছু করছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মন্ত্রণালয়ের আইন অনুযায়ী, অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র অনুদানের প্রথম চেকপ্রাপ্তির ৯ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে। তবে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুরোধ সাপেক্ষে পরিচালক ওই সময় কিছুটা বৃদ্ধি করতে পারেন। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেক নির্মাতা ছবি নির্মাণে বছরের পর বছর পার করছেন। মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে তারা এ ধরনের কাজ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে নির্মাতাদের কোনো ধরনের জবাবদিহি করতে হয় না। এছাড়া এমন অনেক ছবি আছে যার শ্যুটিং সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। আর এ ধরনের ছবির তালিকা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যে ছবিগুলো এখনো মুক্তি পাচ্ছে না সে সব পরিচালকের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম কিংবা তথ্য মন্ত্রণালয়ের আইন তোয়াক্কা না করার অভিযোগ উঠেছে।

২০০৭-০৮ অর্থবছরে অনুদান দেওয়া হয় ‘নমুনা’ নামের একটি চলচ্চিত্রকে। যেটি পরিচালনা করেছেন এনামুল করিম নির্ঝর। ছবিটি এখনো মুক্তি পায়নি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের অনুদান পাওয়া জুনায়েদ হালিমের ‘স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের গল্প’ সিনেমাটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় এখনো মুক্তি পায়নি। এছাড়া ২০১০-১১ অর্থবছরে ফারুক হোসেনের ‘কাকতাড়ুয়া’ ও মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেনের ‘ধোঁকা’ চলচ্চিত্রগুলোরও একই অবস্থা।

এদিকে ২০১১-১২ অর্থবছরে মারুফ হাসান আরমানের ‘নেকড়ে অরণ্যে’, প্রশান্ত অধিকারীর ‘হাডসনের বন্দুক’, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর ‘একা একা’, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ক্যাথরিন মাসুদের ‘কাগজের ফুল’, নারগিস আক্তারের ‘যৈবতী কন্যার মন’, টোকন ঠাকুরের ‘কাঁটা’, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মুশফিকুর রহমান গুলজারের ‘লাল সবুজের সুর’, ড্যানি সিডাকের ‘কাঁসার থালায় রূপালি চাঁদ’ ও জানেসার ওসমানের ‘পঞ্চসঙ্গী’ ছবিগুলোও অন্ধকারে রয়েছে। অনুদানের অর্থে নির্মিত এসব ছবি কবে আলোর মুখ দেখবে, কিংবা আদৌ দেখবে কি-না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে নারগিস আক্তার ও ড্যানি সিডাকের সঙ্গে ফোনে  যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তবে ‘নমুনা’ সিনেমার পরিচালক এনামূল কবির নির্ঝর বলেন, ‘আমার ছবিটির কাজ শেষ করে ২০০৯ সালে সেন্সর বোর্ডে জমা দিয়েছিলাম। এরপর আমাকে ছবিটির বেশকিছু দৃশ্য পুনরায় চিত্রগ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সে জন্য অনেক টাকা দরকার। যে কাজটি এখন আমার জন্য করা সম্ভবপর নয়। যখন আমাকে অনুদান দিয়েছিল তখন তো আমার চিত্রনাট্য দেখেই দিয়েছিল। এজন্য ছবিটি এখনো ওই অবস্থাতেই আছে। আমি আশাবাদী, দেখা যাক কী হয়।’