একসময় কোনো গৃহস্থ টিভি কিনলে গ্রামে গ্রামে হইচই পড়ে যেত। সেই দিন চলে গেছে অনেক আগেই। এখন টিভিহীন একটি বাড়ি খুঁজে পাওয়া দায়। কালের বিবর্তনে অন্যসব প্রযুক্তির মতো টিভি প্রযুক্তিতেও যোগ হয়েছে নিত্যনতুন অধ্যায়। চমকপ্রদ সব প্রযুক্তির ভিড়ে কোন টিভি ভালো হবে, সেটি অনেকেই শোরুমে গিয়ে বুঝে উঠতে পারেন না। আপনার এই দ্বিধা কাটাতে টিভির হালচাল নিয়ে লিখেছেন অমৃত মলঙ্গী
সামনে ক্রিকেট বিশ্বকাপ। একটি টিভি তাই আপনার খুব দরকার হতে পারে। কিন্তু সেটি কি শুধু এক মাসের জন্য? মোটেই না। কমপক্ষে দশ বছর কিংবা তারও বেশি সময় একটি টিভি আপনি ব্যবহার করতে চাইবেন। সেটি সম্ভব, যদি কিছু বিষয় আপনার জানা থাকে।
প্রাথমিকভাবে মাথায় রাখতে হবে
আপনার বাজেট নিতান্ত কম না হলে ৪-কে রেজ্যুলেশনের ডিজিটাল টিভি কিনুন। টিভির সঙ্গে যে কাগজপত্র দেওয়া থাকে সেটি পড়ে আপনি এই রেজ্যুলেশনের মাত্রা জানতে পারেন। ৮-কে রেজ্যুলেশনের টিভি এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। এগুলোর দাম এখনো অনেক বেশি।
১২০ হার্জের কম রিফ্রেশ রেটের টিভি কিনবেন না। ইমেজ শো করানোর জন্য একটি মনিটর সেকেন্ডে কতবার রিফ্রেশ করে, তার পরিমাপকে রিফ্রেশ রেট বলে। সব সময় এইচডিআর টিভি কেনার চেষ্টা করুন। এই প্রযুক্তির টিভিতে ভিডিও অনেক পরিষ্কার দেখা যায়। প্রচলিত এলইডি-এলসিডি টিভির থেকে ওএলইডি একটু বেশি দামের হলেও এগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো। আধুনিক প্রযুক্তির চিকন পর্দার টিভি কিনলে আলাদা সাউন্ডবার কেনার চেষ্টা করুন। চিকন পর্দার টিভিতে সাউন্ড মনের মতো পাওয়া যায় না।
এলসিডি, এলইডি নাকি ওএলইডি
প্রাথমিক ধারণার পর আপনাকে টিভি স্ক্রিন সম্পর্কে জানতে হবে। ভালো স্ক্রিন চিনতে ভুল করলে আপনার সব আয়োজন মাটি। এখনকার দিনে এলসিডি স্ক্রিনের জায়গা দখল করেছে ওএলইডি এবং কিউএলইডি বা প্লাজমা। স্ক্রিনের আরও একটি আধুনিক প্রযুক্তি আসছে। সেটি হলো মাইক্রো-এলইডি। তবে, ঠিক কবে নাগাদ এটি বাজারে পাওয়া যাবে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এলসিডির তুলনায় প্লাজমা টিভিতে স্বচ্ছ ও ঝকঝকে ছবি দেখা যায়। দ্রুতগতির খেলাধুলা উপভোগ করার জন্য প্লাজমা টিভি সবচেয়ে ভালো। তবে এই টেলিভিশনে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হয়। আর এলইডি টিভির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই টেলিভিশন বিদ্যুৎ খরচ সবচেয়ে কম করে।
ওএলইডি বা অরগানিক লাইট এমিটিং ডায়োড ডিসপ্লে প্রযুক্তি অনেকটাই নতুন প্রযুক্তি হিসেবে পরিচিত। মৌলিকভাবে এলসিডি টিভি থেকে এই প্রযুক্তি ভিন্ন। সবচেয়ে প্রাথমিক পার্থক্য হচ্ছে, এর প্রতিটি পিক্সেলই ভিন্নভাবে নিজস্ব আলো বের করে। অন্যদিকে এলসিডি টিভির আলো বের হয় এলইডি ব্যাকলাইট থেকে। এ পার্থক্যই ছবির মান নির্ধারিত করে।
স্ক্রিনের আকার
কত ইঞ্চি টিভি কিনবেন, সেটি নিয়েও অনেকে দ্বিধায় থাকেন। স্ক্রিনের সাইজ নির্ধারণ করতে হলে কত দূরত্বে বসে টিভি দেখবেন সেটি হিসাব করা দরকার। যদি টিভি দেখার দূরত্ব তিন থেকে পাঁচ ফুট হয়, তাহলে ৩২ ইঞ্চি পছন্দ করা যেতে পারে। চার থেকে ছয় ফুট হলে ৪০ ইঞ্চি। পাঁচ থেকে সাত ফুট হলে ৪৯ ইঞ্চি। ছয় থেকে আট ফুট হলে ৫৫ ইঞ্চি। আর আট থেকে দশ ফুট হলে ৬৫ ইঞ্চির পর্দা উপযোগী।
এইচডি নাকি ফুল এইচডি
আট ফুটের কম দূরত্ব থেকে টিভি দেখলে ফুল এইচডি ভালো। যদি বেশি দূর থেকে টিভি দেখেন তবে এইচডি টিভি নেওয়া উচিত।
এইচডি হচ্ছে ৭২০পি ইমেজ রেজ্যুলেশন, সেখানে ফুল এইচডি হচ্ছে ১০৮০পি। আর ৪-কে ইমেজ রেজ্যুলেশনকে বলা হয় আল্ট্রা এইচডি।
আপনি যত বেশি পিক্সেলের টিভি কিনবেন, ছবি তত ভালো। বাজেটের কারণে ৪-কে কিনতে না পারলে ফুল এইচডি কেনা ভালো।
স্মার্ট টিভি
মোবাইল যেমন স্মার্টফোন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, ঠিক তেমনি টিভির ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে। এখনকার দিনে তাই স্মার্ট টিভি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ।
স্মার্টফোনের মতো স্মার্ট টিভিতে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে বিভিন্ন অ্যাপ, অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা যায়। অধিকাংশ টিভিতে ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা যেমন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও এবং ইউটিউবের বিশেষ অ্যাপ থাকে।
টিভি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো স্মার্ট টিভিতে আলাদা আলাদা সফটওয়্যার ব্যবহার করে। স্মার্ট টিভির মধ্যে এখন বেশি জনপ্রিয় অ্যান্ড্রয়েড টিভি, স্যামসাং টাইজেন, এলজি ওয়েবওএস, শাওমির প্যাচওয়াল। এ ছাড়া সনি, ফিলিপিস, শার্প এবং টিসিএলের গুগল-ডেভেলপড অ্যান্ড্রয়েড টিভি পাওয়া যায়। অ্যাপ ব্যবহারের জন্য এই টিভিগুলো বেশ উপযোগী।
স্মার্ট টিভি কেনার আগে দেখতে হবে ওয়াই-ফাই সুবিধা আছে কি না। যে টিভি ওয়াই-ফাই রেডি, তাতে ইন্টারনেট চালাতে পৃথক ডংগল লাগবে। স্মার্ট টিভি কেনার আগে আরও দেখে নিতে হবে এতে ইউএসবি পোর্ট সুবিধা আছে কি না। ইউএসবি পোর্ট থাকলেই যে এক্সটার্নাল হার্ডড্রাইভ বা পেনড্রাইভ সমর্থন করবে এমন নয়। স্মার্ট টিভি কেনার আগে তা পোর্টেবল হার্ডডিস্ক বা কোন ধরনের ডিজিটাল ফরম্যাট সমর্থন করে, তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।
বাজারে এখন মানহীন টিভিতে সয়লাব, যা চোখের ক্ষতি করে। তাই কেনার আগে দেখতে হবে টিভিতে চোখের সুরক্ষাযুক্ত কাচ আছে কি না।
থ্রি-ডি টিভি কেমন
কয়েক বছর আগেও থ্রি-ডি টিভি ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। এটি বাজারে আসার আগে বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এর জনপ্রিয়তা ওইভাবে বাড়েনি। থ্রি-ডি কনটেন্ট সহজলভ্য নয়। এই টিভি দেখতে গেলে আলাদা চশমার ব্যবস্থা করতে হয়। অন্যথায় মাথাব্যথা কিংবা চোখের ক্ষতি হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এই টিভি এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
কোন ব্র্যান্ডের টিভি কিনবেন
বাংলাদেশের বাজারে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানির টিভি পাওয়া যায়। এর মধ্যে ওয়ালটন, স্যামসাং, ট্রান্সটেক, সনি, সিঙ্গার, প্যানাসনিক, এলজি, ইকো প্লাস, ভিশন, কনকা এবং মাইওয়ান বেশি জনপ্রিয়।
এখন কথা হচ্ছে, আসলেই আপনি কোন ব্র্যান্ডের টিভিটি বাড়িতে নেবেন?
এটি হচ্ছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে আরও কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। কোন টিভির বাজারদাম এ সময় কেমন চলছে, সেটি খোঁজ নিন। বিভিন্ন উৎসবের আগে কিংবা বিশ^কাপের মতো কোনো মেগা ইভেন্টের আগে প্রায় সব কোম্পানি দামে ভালো ছাড় দেয়। এগুলো আপনি তাদের ওয়েবসাইটে কিংবা পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে জেনে নিতে পারেন। তারপর দেখবেন কোন টিভির ওয়ারেন্টি কিংবা গ্যারান্টি শর্ত ভালো।
এগুলো দেখার পর শোরুমে গিয়ে টিভি চালিয়ে ছবি-শব্দ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ছবি ও শব্দ থেকে টিভি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে আপনি ভিডিও দেখার চেষ্টা করবেন।
অনেক সময় পাশ থেকে টেলিভিশন দেখলে তা ঘোলা দেখায় বা ছবি ও রং কিছুটা বদলে যায়। এটা হয় ভিউয়িং অ্যাঙ্গেলের কারণেই। এ ক্ষেত্রে ভিউয়িং অ্যাঙ্গেল কম হলে পাশ থেকে দেখার কারণে ছবির রং বদলে যায়। আর ভিউয়িং অ্যাঙ্গেল বেশি হলে আপনি যতই পাশ থেকে দেখুন না কেন, ছবির রঙের কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই টেলিভিশন সেট কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে এর ভিউয়িং অ্যাঙ্গেল পরীক্ষা করে নিন।
ভালো টিভির পর্দায় সাদা রঙে কোনো সবুজ আভা থাকে না। কালো রংটি বেশ পোক্ত দেখায়। ছবি কতটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে সেটি খেয়াল করুন।
শব্দ কত ক্লিয়ার সেটি বোঝার চেষ্টা করুন। বেজ কত গভীর সেটি অনুধাবন করুন। ভোকাল ওপেন এবং পরিষ্কার কি না, সেটি শুনুন। বক্সের ভেতর থেকে শব্দ বের হচ্ছে; নাকে নাকে যাচ্ছে কিংবা চিকন আসছে, এমন হলে সেটি বাদ দিন।