বিদায়ী প্রজাতির স্বজন

৪০ লাখ থেকে শকুন নেমে এসেছে ১০ হাজারে। গরুকে নানা রোগে জীবনঘাতী ওষুধ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মরা গরুগুলো খেয়ে আকাশের সবচেয়ে বড় পাখিটিই এখন মাত্র শূন্য দশমিক এক ভাগ টিকে আছে। তাদের বাঁচাতে একাট্টা সারা বিশ্ব। আইইউসিএন বাংলাদেশে শকুন উদ্ধার দল, শকুনের নিরাপদ অঞ্চল ও শকুন সংরক্ষণ দল গড়েছে। তাদের সঙ্গে আছেন বন্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু। লিখেছেন রানা মিত্র

 

এখনো নীল নদের তীরে ‘এল কাব’ নামের প্রাচীন সভ্যতাটির ধ্বংসাবশেষ আছে। খ্রিস্টের জন্মের ১,২৯৫ থেকে ১,৫৫০ বছর আগে, গ্রিক দার্শনিক টলেমির আমল থেকে শুরু এই নগর রাষ্ট্রের প্রধান দেবী ছিলেন ‘নেহবেত’। তিনি সাদা ‘শকুন দেবী’ ছিলেন। শরীরের চেয়েও বড় ডানাওলা নারী, পারিষদ আছে। সেই সময়ের নাগরিকদের বিশ^াসে, নগর রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করেছেন। এখনো মিসরের পুরাণে তার নাম গল্প, কবিতায় ছড়িয়ে আছে। রোমানরা ৩ হাজার বছর আগে তাদের এই রাজধানী রোম কত বড় হবে, ঠিক করেছিলেন একটি শকুন কত দূর উড়তে পারে, তার ভিত্তিতে। গ্রিসে শকুন ‘বসন্তের প্রতীক’। শত শত বছর ধরে তাদের রোগ, মহামারি থেকে থেকে বাঁচিয়েছে বলে এই পাখিটিকে হাজারো বছর ধরে তাদের ভালোর সূচনা মনে করছেন। ইরানের বহু পুরনো পার্সিয়ান সভ্যতার নায়ক ‘শকুন’; তাদের রাজকীয় সেনাবাহিনীর প্রতীক। এখনো প্রাচীন এই ধর্মানুসারীরা তাদের কেউ মারা গেলে সমাধিস্থ করা অপবিত্র মনে করেন। তাদের ‘টাওয়ার অব সাইলেন্স’ বা মৌন স্তম্ভে মৃতদেহকে শকুনের খাবার হিসেবে রেখে আসেন।

শকুনের সেই দিন আর নেই। এই বিশে^র সবচেয়ে কম সময়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়া, হারিয়ে যেতে থাকা অল্প ক’টি প্রাণীর একটি ওরা। পুরো বিশ^ থেকে ৯৯.৯৯ ভাগ শকুন হারিয়ে গেছে। বেঁচে আছে মাত্র .০১ ভাগ শকুন। আগে যেখানে বিজ্ঞানীদের কাছে হিসাব ছিল, মোট ৪০ লাখ আছে; এখন বিশ্বের সব দেশ মিলে বেঁচে আছে মাত্র ১০ হাজার শকুন।

চমকে দেওয়া তথ্যটি বলছেন আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) নামের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্যপ্রাণী গবেষক সংস্থার বন্যপ্রাণী গবেষক ও সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সীমান্ত দীপু। আরও জানিয়েছেন, শকুন মরা বা মরতে চলেছে এমন গরু খেয়ে বাঁচে। গরু নানা রোগে ভুগে মরে। বিজ্ঞানের উন্নয়নের জোয়ারে ২০০৭ সালের আগেও দেশে দেশে গরুকে অ্যানথাক্স, খুরা রোগে ভুগলে কিটোপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, এমিক্লোফেনাক জাতীয় ওষুধ খাইয়ে মেরে ফেলা হতো। গরুকে এই জাতের ওষুধ খাইয়ে আবদ্ধ স্থানে নয়, খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হতো। অশুভের প্রতীক, তবে ‘প্রকৃতির ঝাড়ুদার’ শকুন তো আছেই, তাকে তো কেউ দেখতে পারে না; সে নিজের বাঁচার তাগিদে প্রাণীটি খেয়ে ফেলে। হিসেব বলে, এই জীবননাশী ওষুধ খেয়ে মরা গরু খাওয়া শকুন তিন মিনিটের মধ্যে মরে যায়। ফলে দ্রুত এভাবে দেশে দেশে ওদের নাশ হলো। ওষুধগুলো ওষুধ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে নানা দেশে ছড়াল। তারা মানুষকে সচেতন করলেন না, সরকারও অনেক জায়গায় দায় নিল না। এই অন্যায় কর্মের বলি হয়ে সারা দুনিয়া থেকেই প্রকৃতির বন্ধুরা হারিয়ে যেতে লাগল।

১৯৯২ সালে বিজ্ঞানীদের প্রথম খেয়াল হলো, শকুন কেন হারিয়ে যাচ্ছে? গবেষণা শুরু হলো। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিজ্ঞানীর মাধ্যমে গরুর ওপর প্রয়োগ করা এই ওষুধের কথা আমরা জানতে পারলাম। এতই ক্ষতিকর এই ওষুধ ডাইক্লোফেন যে, সামান্যতম মাত্রায়ও কোনো শকুনকে খাওয়ানো হলে সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবে। পাকিস্তানের মরে যাওয়া এক শকুনের নাড়িভুঁড়িতে বিজ্ঞানীরা এই মাত্রার ওষুধ পেয়েছেন। ফলে অসুস্থ, প্রায় মরে যাওয়া প্রাণীর ওপর শিকারির চোখ দিয়ে এগুতে থাকা, উড়ে বেড়ানো বিরাট পাখিটিকে বাঁচাতে তারা একসঙ্গে হলেন। ২০০৬ সালে ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে একই সময়ে সব পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হলো। আমাদের দেশও ২০১০ সালে পাশের দেশগুলোর পথে এলো, ওষুধটি নিষিদ্ধ করল। তবে তারপরও শকুনের মৃত্যুর হার কমছিল না। আবার বিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণী গবেষকরা মাঠে নামলেন। জানলেন, একই ধরনের কিটোপ্রোফেন গোপনে অন্য নামে বাজারে চলছে। ২০১৭ সালে সারা দুনিয়াই শকুনকে বাঁচাতে এই ওষুধ নিষিদ্ধ করেছে। জাতিসংঘের মাধ্যমে মেলোক্সিকাম নামের শকুন সহনীয় ওষুধ পশু বিশেষ করে গরুর রোগে ব্যবহার শুরু হলো। তাতে কাজ হলো বেশ। শকুনের মরণের হার কমতে লাগল। গরুও প্রাকৃতিকভাবে ওদের খাদ্য হলো। ততদিনে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর মতো তাদের এই প্রাচীন পাখি ও সম্পদকে বাঁচাতে নানা উদ্যোগ শুরু করল।

ভারতে ছয়টি শকুন প্রজননকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। তাতে ছয়শ শকুন ছানা জন্মেছে। তবে সেগুলো এখনো আকাশ দখলের জন্য উড়তে পারছে না। কারণ, গোপনে ওষুধ ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁক গলে ওই জাতের ওষুধ বাজারে ছাড়ছেন। তাদের পুরোপুরি নির্মূল করতে আরও কদিন লাগবে। আইন তাদের খুব খুঁজছে।

আমাদের অবস্থা? এই দেশে মাত্র আড়াইশ শকুন আছে, জেনেছেন সীমান্ত দীপু। তিনি ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের শকুন নিয়ে গবেষণা করছেন। তার কাছে জানা গেছে, এই দেশ এককালে শকুনের উর্বর ভূমি ছিল। কৃষি ব্যবস্থা এখনো এই দেশের মানুষের প্রধান জীবিকা। ফলে ‘হিমালয়ের গৃধিনী’ বা হিমালয় অঞ্চলের আশপাশে ও নেপালে বসবাস করা গৃধিনী নামে সাহিত্যে পরিচিত শকুনরা এখনো গড়ে ১০০টি খাবারের ও শীতকালে বেঁচে থাকার জন্য এই দেশে আসে। ওখানে প্রবল শীত নামে বলে তারা খেতে পায় না। হিমালয়ের গাছগাছালিতে ঘেরা বিরাট ফোকরে তারা ডিম রেখে আসে। ছানারা শীত, গ্রীষ্ম সব কালেই বাঁচা শেখে। মা-বাবা নিচের দিকে আমাদের নীলফামারী, পঞ্চগড়, দিনাজপুরের মতো তীব্র শীতপ্রধান এলাকায় খাবারের খোঁজে নামে। তবে খাবার এখন খুব কম পায়। তারপরও শত শত বছরের অভ্যাস তাদের যায় না বলে আসে। দুর্বল শরীরে ওরা ওড়ার শক্তি পায় না, পড়ে থাকে মাটিতে। শিশু-কিশোরের দলও তাদের পাথর ছুড়ে মারে। কখনো কোনো সদাশয়ের কাছ থেকে খবর পেয়ে বন বিভাগ ওদের বাঁচায়। পরিযায়ী এই পাখিকে বাঁচাতে ২০১৩ সালে আইইউসিএস বন বিভাগের সাহায্যে দিনাজপুরের সিংরা জাতীয় উদ্যান বা সংরক্ষিত বনে ‘ভালচার রেসকিউ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার (শকুন উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র)’ তৈরি করেছে। সেখানে তাদের ‘ভালচার রেসকিউ টিম (শকুন উদ্ধার দল)’ আছে। এই সেন্টারের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মরণাপন্ন ৫০টি শকুন উন্নত চিকিৎসায় আবার আকাশে ফিরে গেছে। তাদের গায়ে গবেষণা ও শকুনের জীবনপ্রণালী জানার জন্য কোড নম্বর লেখা হয়েছে। যাতে ওই শকুনদের আলোদা করা যায়। আকাশের রাজার পথ জানার জন্য কদিন আগে থেকে ওদের গায়ে জিপিএস ট্র্যাকার (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা বৈশ্বিক অবস্থান ব্যবস্থা তালাশকারী) সংযুক্ত করা শুরু হয়েছে। আইইউসিএনের গবেষকরা সারা বিশ্ব থেকে ওদের নজরে রাখছেন।

দীপু আইইউসিএসের হয়ে দেশের নানা জেলায় আগে যেখানে শকুনের আবাস ছিল, সেসব জায়গায় গেছেন। জেনেছেন, এখনো হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা নামের সুন্দরবনের পর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কেন্দ্রটিতে ওরা আছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কয়েক জায়গায়ও শকুনরা বেঁচে আছে। রেমা কালেঙ্গায় ঘুরে তিনি জানলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ এমনকি আদিবাসীরাও শকুন ভালোবাসেন না, বরং ঘৃণা করেন। তারা মনে করেন, এটি নোংরা খেয়ে বাঁচে, সাহিত্যেও একে রাখা হয়েছে বাজে প্রাণী হিসেবে; ফলে এটি অশুভ আত্মা। ওদের মরাই ভালো। রেমা-কালেঙ্গার মুন্ডা উপজাতির মানুষদের তারা শকুন সম্পর্কে জানানোর কাজ শুরু করলেন। ডেকে ডেকে বললেন, মারণঘাতী, জলাতঙ্কসহ অনেক রোগ শকুন থাকলে আপনাতেই কোনো প্রতিশোধক না দিয়ে কমানো যায়। মরা গরুকে মাটিচাপা না দিয়ে শকুনের হাতে তুলে দিলে শকুন বাঁচবে। অ্যানথ্রাক্স রোগে মরা গরুকে মাটিচাপা দেওয়া হলে রোগের জীবাণু শত বছর পরেও মাটিতে মিশে থাকে।

এই রোগাক্রান্ত গরুকে শকুনের হাতে তুলে দিলে আর রোগটি ছড়ায় না। কারণ শকুনের পাকস্থলীই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাকস্থলী। তারা যে কোনো রোগের জীবাণু আক্রান্ত প্রাণী খেয়ে বাঁচতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গেও কাজ করতে লাগলেন। ফলে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুন্দরবনের ভেতর, আশপাশ এবং রেমা-কালেঙ্গার ৪৭ হজার স্কয়ার কিলোমিটার বনভূমিকে ‘শকুনের অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করলেন। এই নিরাপদ এলাকায় শকুনের জন্য ক্ষতিকর কোনো ওষুধ কোনো প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করে তাকে শকুনের খাবার হিসেবে তুলে দেওয়া যাবে না, প্রাকৃতিক দূষণ বন্ধ করতে ওদের খাওয়ানোও যাবে না। তারা জায়গাটির নাম দিলেন ‘ভালচার সেইফ জোন (শকুনের নিরাপদ অঞ্চল)।’ সেখানে আইইউসিএন ‘ভালচার ফিডিং স্টেশন (শকুনের খাবার স্থান) তৈরি করল। বাঁশ দিয়ে ঘেরা, ওপরে ছাউনি আছে সুন্দর বাসস্থানটিতে মরা গরু জোগাড় করে, তাদের দেহে কোনো ক্ষতিকর ওষুধ আছে কি না পরীক্ষা করে শকুনদের খাওয়ানো শুরু হলো। কাজটির জন্য স্থানীয় আদিবাসী ও তরুণ পরিবেশকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। তারা ‘ভালচার কনজারভেশন টিম (শকুন সংরক্ষণ দল)’র সদস্য হলেন। তারা শকুন বাঁচানোর জন্য কাজ করছেন। শকুনের জন্য বাজার থেকে গরু কিনে সেটি জবাই করে সেই অংশ সেলাই করে ওদের খেতে দেওয়া হয়। কাটা অংশ থাকলে সেই প্রাণী হাজার বছরের পুরনো পাখি শকুন অভ্যাসবশত খায় না। নিরাপদ ঘোষণা করা এই বিশাল এলাকায় চাপালিশ, গর্জন, শিমুল, বনাক জাতের যে গাছগুলোতে তারা আবাস গড়ে তোলে, থাকে; শকুন সংরক্ষক দল সেই গাছগুলো খুঁজে বের করেছে। তাদের দলনেতা ছিলেন সীমান্ত দীপু। পুরো এলাকায় তারা এখন মাত্র ১৯২টি গাছ পেয়েছেন। সেই গাছগুলো শকুনের বেঁচে থাকার জন্য কোনোভাবেই কাটা যাবে না এলাকার সব মানুষকে বুঝিয়েছেন তারা। এই কাজে সাহায্য করেছেন আইইউসিএনের বন্যপ্রাণী গবেষকরা এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ।