জেনেভা ক্যাম্পে অম্লমধুর খানাদানা

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির সময় মরু প্রদেশ রাজস্থানের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কয়েকশ মাইল পুবের শহর ঢাকায় চলে আসেন বাসিরণ বেগমের বাবা আবদুল গণি। জাতিতে মাড়োয়ারি আবদুল গণি বিয়ে করেন পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের মেয়ে মমতাজ বেগমকে। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের কিছু আগে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি স্থায়ী হন মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসা অভিবাসীদের সঙ্গে মিশে পরে তার পরিচয় পাল্টে হয়ে যায় বিহারী। জেনেভা ক্যাম্পের একটি ঘরে বসে বাসিরণ তার বাবার সঙ্গে পার করা ছোটবেলার রোজার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দেশ রূপান্তরকে এ সব তথ্য জানান। তার বাবা রাজস্থানের বিখ্যাত সব খাবার তৈরি করতেন। সেগুলো দিয়ে পরিবারের সবাই একসঙ্গে ইফতার করতেন। তালিকায় ছিল রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী সব খাবার ভাবড়া, শেও, আমিত্তি, লাচ্চি, শরবত ও বিভিন্ন পদের রাজস্থানী কাবাব।

বাসিরণ বলেন, ‘সে সময় আব্বার রোজগার ভালোই ছিল। মা বাঙালি ছিলেন বলে রাজস্থানী খাবার বানাতে পারতেন না। রোজার সময় বাড়ির রান্নার দায়িত্ব ছিল বাবার হাতে। দিনভর রান্না শেষে ইফতারের জন্য বসতেন, বড় একটা গামলায় নানা পদের খাবার এক সাথে কইর‌্যা মাখান দিয়া দিতেন। আজান না দেওন পর্যন্ত সবাই গামলা ঘিইর‌্যা বইস্যা দোয়া কালাম পড়তাম আমরা। আজান দিলেই কি যে আনন্দ হইত! আব্বায় নাই এখন দিনও পাল্টাইছে। অভাবের সংসারে দৈনিক খরচ চালানোই দায়। তাই ইফতারও হয় বাজার থেকে কেনা ছোলা, জিলাপি, পিঁয়াজু ও মুড়ি দিয়ে।’

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে প্রায় ৪০ হাজার লোকের বসবাস। ৮ ফুট দৈর্ঘ্যরে প্রতিটি ঘরের ওপর সামর্থ্য অনুযায়ী দোতলা-তিনতলা করেছেন অনেকে। প্রতি তলায় একটি করে ঘর। পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী যা ভীষণ অপ্রতুল। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও গ্যাস সংযোগ নেই। ঘিঞ্জি এই মহল্লায় পানির সংকট খুবই তীব্র। কোনো কারণে পানির সরবরাহ লাইনে একবার সমস্যা দেখা দিলে সেটা ঠিক করতে ভীষণ বেগ পেতে হয় ওয়াসাকে। এ ছাড়া দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবসহ নানা সমস্যায় জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের রমজান মাস এখন আগের মতো আর সুখকর নয়।

সত্তরোর্ধ পীর মোহাম্মদ বলেন, ‘আগে মানুষ কম আছিল, শান্তিও আছিল। এখন মানুষ বাইড়্যা শান্তি উধাও হইয়া গেছে। অভাব এখন বড় সমস্যা। তাই রোজার মাস বলে আলাদা খাবারের আয়োজন করা কঠিন।’

এই ক্যাম্পেরই আরেক বাসিন্দা সনি বেগম বলেন, ‘আমগো খানদান ম্যালা বড়, তয় এই দ্যাশে আর সেইটা নাই। এই দ্যাশে জন্ম হইলেও সরকার আমগোরে আলাদা কইরা রাখছে। তাই দ্যাশ আগাইলেও আমাগো জীবনের উন্নতি হয় নাই।’

তবে ব্যতিক্রমও আছে এখানে। কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিক্ষা-দীক্ষায় জেনেভা ক্যাম্পের নারীরা এখন অনেক এগিয়ে। এখানকার বেশির ভাগ মেয়ে স্কুল-কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ পড়াশোনা শেষে উচ্চপদে চাকরিও করছেন। রোজা এলে ইফতারি হিসেবে তারা বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত সব খাবার তৈরি করেন।

এ রকমই এক তরুণী ফাতিমা সানা শেখ দেশ রূপান্তরকে জানান, তার দাদাবাড়ি ভারতের উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত আগ্রা অঞ্চলে। দাদির কাছ থেকে বুটের হালুয়া, মাসকাটের হালুয়া, ডিমের হালুয়া, বাদামের হালুয়া, কাবাব, টিকিয়া, দোপেঁয়াজা, দইবড়া, নিমকপাড়া ও নানরুটিসহ অনেক কিছু বানানো শিখেছেন। রোজা ছাড়াও যেকোনো উৎসবে এসব খাবার তৈরি করেন তিনি।

ফাতিমা বলেন, ‘ক্যাম্পের সবাই এখন বাঙালি খাবারে অভ্যস্ত। তবে বিশেষ দিনগুলোতে যার যার অঞ্চলের বিখ্যাত সব খাবার তৈরি করেন। ক্যাম্পের মানুষের সামর্থ্য কম হলেও খাবারের ব্যাপারে তারা রুচিশীল।’

ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা অনার্স পড়–য়া জিনাত খান বলেন, ‘ইফতারে চেষ্টা থাকে জাতিগত ঐতিহ্যবাহী খাবারের দিকে। কখনো তেহারি আবার কখনো বিরিয়ানি তৈরি করেন অনেকেই।’

বিহারী ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, এখানকার ইফতারের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে এক গামলায় ইফতার করা। বিশেষ কোনো কাজে আটকা না পড়লে পুরুষরাও বাড়ির বাইরে ইফতার করেন না। সামর্থ্য যেমনই হোক না কেন, খাবার কিনে ঘরে চলে আসেন সবাই। তারপর বড় গামলায় সব খাবার একসঙ্গে করে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে বসে পড়েন ইফতারে। এটা বিহারী ক্যাম্পের ঐতিহ্যের অংশ বলে জানান তারা।