দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়েও যে কারণে কানহাইয়ার ভরাডুবি

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে পুরো দেশের নজর ছিল বিহারের বেগুসরাই আসনের দিকে। কারণ এখানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী কানহাইয়া কুমারকে দেশটির রাজনীতিতে নতুন চমক হিসাবে দেখা হচ্ছিল।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ছাত্রকে মোকাবিলা করতে ক্ষমতাসীন বিজেপি নাওয়াদা থেকে জোর করে নিয়ে আসে ঝানু রাজনীতিবিদ গিরিরাজ সিংকে। যদিও গিরিরাজ বেগুসরাইয়ে নির্বাচন করতে রাজি ছিলেন না, এমনকি শুরুর দিকে নির্বাচনী প্রচারণায়ও নামতে চাননি। কানহাইয়ার সামনে পরাজয়ের আশঙ্কা ছিল তার নিজের মধ্যেও। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। গিরিরাজের সামনে কানহাইয়ারই ভরাডুবি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৪ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে গিরিরাজের কাছে হেরেছেন কানহাইয়া। গোটা দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানেও উঠে গেরুয়া ঝান্ডা। তুমুল সম্ভাবনা দেখিয়ে কানহাইয়ার কেন এ হার?

ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল-আরজেডি প্রার্থী তানভীর হাসান পেয়েছেন ১ লাখ ৯৩ হাজার ভোট, কানহাইয়া কুমার পেয়েছেন ২ লাখ ৬১ হাজার ভোট। আর বিজয়ী গিরিরাজ পেয়েছেন ৬ লাখ ৬৮ হাজার ভোট।

২০১৪ সালেও এ আসনে বিজেপি জিতে। সেবার বিজেপি প্রার্থী ভোলা সিং ৬০ হাজারের ভোটের ব্যবধানে জিতলেও এবারের প্রার্থী গিরিরাজ জিতেছে ৪ লাখেরও বেশি ব্যবধানে। বিহারের আসনটিতে বিজেপির এ বিশাল উত্থানের পেছনের কারণ কি? দেশে-বিদেশে আলোড়ন তুলে কেনই বা মুখ থুবড়ে পড়লো কানহাইয়ার জনপ্রিয়তা?

ভারতীয়সহ আন্তর্জাতিক একাধিক সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আগেরবারেও এ আসনে জেতায় সেখানে রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী ছিল বিজেপি। ক্ষমতাসীন দল হিসাবে প্রশাসনিক প্রভাবও কাজে লাগাতে পেরেছে তারা। যা কানহাইরার ছিল না। এ ছাড়া বিজেপির মতো পেশি শক্তি ও অর্থ ছিটানোর সঙ্গেও পেরে উঠেননি সিপিআইয়ের এ তরুণ নেতা।

হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষী তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল কানহাইয়ার। তরুণদের কাছে টানলেও অন্যান্য বড় ভোটগুলো কাছে টানতে পারেননি তিনি। মূলত আরজেডি প্রার্থী তানভীর হাসানের কারণে বিজেপি বিরোধী ভোট ব্যাংকগুলো ভাগ হয়ে গেছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গিরিরাজের ধারে কাছেও নেই তানভীর এবং কানহাইয়া। দুইজনের ভোট যোগ করলেও জিতে যাচ্ছেন গিরিরাজ।

অথচ কানহাইয়ার বিপরীতে ভরাডুবির আশঙ্কায় নির্বাচনেই আসতে চাননি গিরিরাজ। সেখানে এমন পরিস্থিতি নিশ্চয় পুরাই স্বপ্নময় মনে হতে পারে গিরিরাজের জন্য। কানহাইয়াকে মোকাবিলা করতে নাওয়াদা থেকে অভিজ্ঞ এ রাজনীতিবিদকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা দারুণ ফল দিয়েছে বিজেপিকে।

আসনটিতে বিজেপি বিরোধী ‘সেক্যুলার ভোটব্যাংক’ সিপিআই এবং আরজেডির মধ্যে ভাগ হয়ে পড়ে। আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদের ছেলে তেজস্বী যাদবও চাননি বিহারে সিপিআইয়ের উত্থান হোক। বিজেপিকে মোকাবিলা করতে তিনি কানহাইয়াকে সামনে রাখতে পছন্দ করেননি। কানহাইয়ার জনপ্রিয়তাকেও তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই গেরুয়া শিবিরকে হারাতে কানহাইয়ার সঙ্গে হাত মেলাতে চাননি তিনি।    

কানহাইয়ার নির্বাচনী প্রচারণা দলের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানাচ্ছে, আরজেডি প্রার্থী তানভীরের কারণেই কানহাইয়ার জেতার ‘১১০ ভাগ’ সম্ভাবনাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পুরো দেশের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যও এখানে উঠে এসেছে।

বেগুসরাইয়ে অন্যতম ভোট ব্যাংক ছিল প্রভাবশালী সম্প্রদায় ভূমিহারদের। এদের টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। অন্যান্য নিচুজাতের হিন্দু গোষ্ঠীদের ভোটও পেয়েছে তারা। অন্যদিকে দলিত মুসলিমদের ভোট ভাগ হয়ে গেছে তানভীর এবং কানহাইয়ার মধ্যে।

তবে বিজেপির বিপুল পরিমাণ ভোটের জন্য ইভিএম কারচুপিকেই দুষছে কানহাইয়া শিবির। যদিও বিজেপি দাবি করেছে, এ আসনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণেই এমন সফলতা পেয়েছে তারা।

বেগুসরাইয়ের বিধানসভার বিজেপি নেতা রাজনিশ সিং বলেন, “বেগুসরাইয়ের মানুষ হিন্দু-মুসলিমদের বিভাজনে বিশ্বাস করে না। তারা বিজেপির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখেছে। ফলে জনগণের রায় উন্নয়নের পক্ষেই গেছে।”  

(হাফিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অবলম্বনে)