কার্ডিফে পা রাখলেই বাংলাদেশের মানসিক শক্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ক্রিকেট তো মনস্তাত্ত্বিক খেলা। সোফিয়া গার্ডেন টাইগারদের পয়মন্ত ভেন্যু বলে কথা। আর এই দল এখন বিশ্বকাপের ‘আন্ডারডগ’ নয়, নয় ‘জায়ান্ট কিলার’ও। বিশ্বের সব সেরা শক্তির সঙ্গে সেরা লড়াই দেওয়ার যোগ্য। বিশ্বকাপেও তাদের নিয়ে বিরাট প্রত্যাশা।
সেই কার্ডিফেই আজ ২০১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার্ম-আপ ম্যাচে পকিস্তানের মুখোমুখি। দু’বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারাতে পারলে মূল বিশ্বকাপ শুরু করার শক্তিটা বাড়বে বই কমবে কি?
একটা পরিসংখ্যান। পাকিস্তান দল গেল ১১ ম্যাচের প্রতিটিতে হেরেছে। এমনকি আফগানিস্তানের বিপক্ষেও হেরে গেল। ওদিকে বাংলাদেশ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসে পা রেখেছে আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজে দেশের প্রথম শিরোপাটা জিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ফাইনালসহ ওখানে তিনবার হারিয়েছে। মূল একাদশ শুধু নয়, রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়রাও ফর্মে। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। নিশ্চিয়ই মনে আছে ২০১৫ বিশ্বকাপে এই পাকিস্তানকে কিন্তু তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করেছিল টাইগাররা।
ম্যাচটা বিশ্বকাপে পাকিস্তানের জন্য ওয়ার্ম-আপের। কিন্তু সাবেক চ্যাম্পিয়নদের এবারের বিশ্বকাপ শুরু করার আগে আহত প্রাণীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া উপায় কি? তাদের দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ মিকি আর্থারেরও দুশ্চিন্তার শেষ নেই। বিশেষ করে দেশটির পুরনো সমস্যা বাজে ফিল্ডিং নিয়ে ঘাম ছুটে যাচ্ছে তার।
কিন্তু বাংলাদেশ দলটিতে দেখুন। বিগ ফাইভ বা অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, সম্প্রতি বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডের সিংহাসনে আবার বসা সাকিব আল হাসান, ম্যাচউইনার তামিম ইকবাল, পরিস্থিতি বুঝে প্রতিপক্ষের হাত থেকে ম্যাচ ছিনিয়ে আনতে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম এবং লেট অর্ডারে মাহমুদউল্লাহর আতঙ্ক-জাগানিয়া দায়িত্ববোধ ও ফিনিশিং দিয়ে ফেরার কীর্তি কথা সবার জানা।
এই বছরের গোড়ার দিকে নিউজিল্যান্ডে বাজেভাবে হার এবং শেষে ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে ভয়াবহ হামলার দুঃস্বপ্ন তাদের অনেকটা ভুলিয়েছে আয়ারল্যান্ড। সৌম্য সরকার ওপরে মারার লাইসেন্স পেয়ে শিহরন জাগানো ব্যাট করছেন। আপাত ধারাবাহিক বাঁহাতি ওপেনার টানা তিন ফিফটি করেছেন শেষটায়। সাব্বির রহমান এখনো অনেক সুযোগ পাননি। লিটন এক সুযোগেই ৭৬। মোসাদ্দেক হোসেন তো ২৭ বলে অপরাজিত ৫২ রানের ইনিংসে বৃষ্টিবিঘিœত ফাইনালে উইন্ডিজকে সেদিন খুন করে ফেললেন। অমরত্ব পেয়ে গেলেন বাংলাদেশের প্রথম ট্রফি জয়ে। কিন্তু একাদশে থাকতে অপেক্ষা তার।
বোলিং একটু সমস্যা বটে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। ইমাম উল হক, ফখর জামানদের মতো ওপেনাররা অবলীলায় সেঞ্চুরি করছেন মনোহর ব্যাটিংয়ে। বাবর আজম, আসিফ আলিদের মতো আরও আছে ভাণ্ডারে। চমক লাগিয়ে ওয়াহাব রিয়াজকে ফিরিয়ে এনে ব্যাটিংয়ের গভীরতাও বাড়িয়েছে। আর পাকিস্তান সত্যিকারের পেস আক্রমণের দেশ। সেখানে শাদাব খান স্পিনার হয়ে হুমকি হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের দুর্বলতা যখন পেসে তখন তারা ওটাকেই কাজে লাগাবে নিশ্চিন্তভাবে।
কিন্তু একটা দল হেরে চলছে। আরেকটা দল ক্লিনিক্যাল পারফরম্যান্সে একের পর এক জয়ে দারুণ যূথবদ্ধ। যেকেউ আসতে পারে একাদশে।
শঙ্কা যদিও বোলিংয়ে। সেরা দলগুলোর মতো পেস আক্রমণ নেই। কাঁধের ইনজুরি কিছুটা সারল বলে মাহমুদউল্লাহকে অফ স্পিনে ভাবা হচ্ছে হঠাৎ। সাকিব আর মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিন এখন পর্যন্ত কাজে লাগছে। ভরসায় তারা। মাশরাফীর নেতৃত্বে পেস অ্যাটাক। মোস্তাফিজুর রহমান আইরিশ মাটিতে ৬ উইকেট পেলেও খরচ সামলাতে পারছেন না খুব। ভ্যারিয়েশনেও দুর্বলতা থাকছে। ইনজুরিপ্রবণ বলে সমস্যাটা। রুবেল হোসেন হতে পারেন কাজের। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে একাদশ তাতে রুবেলের মতো আয়ারল্যান্ডের ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েও বসে থাকার কথা আবু জায়েদ রাহীর।
থাকলেন মোহাম্মদ সাইফদ্দিন। ডেথ ওভারে ভালো করছেন। রুবেলও করতেন। কিন্তু ব্যাটিংয়ের কথা ভেবে সাইফ।
জুনিয়র ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিকতার অতীত অভাব আর বোলিংয়ের এই ঘাটতি মাঠে পোষানো গেলে এই বাংলাদেশ দল চ্যাম্পিয়নের মতোই বলে সবাই মানেন।
কিন্তু পাকিস্তান? বিশ্বকাপের ঠিক আগে হারের ডজন কেইবা পূরণ করতে চায়! বাংলাদেশের বিপক্ষে জিততে তাদের তো জান লড়িয়ে দেওয়ার কথা। মাঠের বাইরের এক ধরনের শত্রুতার কথাও তো ইহজীবনে ভুলবার কথা নয় দুই দেশের কারও।
বাংলাদেশ দল এখন একাধিক পারফরমারের ওপর নির্ভর করতে পারছে। সামনে সব ভালো হোক এমনই ভাবে, তাই তো সমর্থকদের চাওয়া। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালিস্ট। আট ও চারের পরের ধাপ কোনটা? দুই তো?
সে পরের কথা। আপাতত না হয় পয়মন্ত এই কার্ডিফে আরেকটি পাকিস্তান-বধ হয়ে যাক না।
একটি সতর্কতা :
ওহ, কার্ডিফে কিন্তু রান হয় বেশ। সেদিন ওয়ার্ম-আপে দক্ষিণ আফ্রিকা নির্ধারিত ৫০ ওভারে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৭ উইকেটে ৩৩৮ রান করেছিল। ২৫১ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল লঙ্কানরা।