মধু মাসের মধু ফল পাকা লিচু কেনাবেচা জমে উঠেছে। দূর-দূরান্তের পাইকার আর ব্যাপারীদের আনাগোনায় এখন সরগরম পাবনার লিচু বাগানগুলো। অনুকূল আবহাওয়ায় হয়েছে ভালো ফলন, মিলছে ভালো দামও।
কৃষি বিভাগ বলছে, এবারের উৎপাদন ছাড়াবে সকল অতীত রেকর্ড। তবে, ঈদের ছুটিতে মহাসড়কে পণ্য পরিবহন বন্ধের ঘোষণায়, দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত কয়েক দশক ধরে পাবনার ঈশ্বরদী ও সদর উপজেলায় অসংখ্য বাণিজ্যিক বাগানের সমষ্টিতে গড়ে উঠেছে লিচুর সাম্রাজ্য। গুণগত মান আর স্বাদে বাজারে পাবনার লিচুর আলাদা কদর থাকায়, অনেকেই ভালোবেসে এ জেলাকে বলেন লিচুর রাজধানী।
মৌসুমী এ ফলটির ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সাফল্যে লিচুর চাষ ছড়িয়ে পড়েছে জেলার সবকটি উপজেলায়। বেড়েছে চাষের পরিসর। গত মৌসুমে চার হাজার নিরানব্বই হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হলেও এ বছর যোগ হয়েছে আরো দুইশ হেক্টর। অনূকুল আবহাওয়ায় ভালো ফলনে খুশি কৃষক, বাগান মালিকরা।
রমজানে চাহিদা কিছুটা কম হলেও বেচাকেনার বাজারদরে অখুশি নন তারা। গাছ থেকে লিচু নামানো, তা ঝাঁকাবোঝাই করে পাঠানোতেই এখন বাগান মালিকদের সকল ব্যস্ততা।
চট্টগ্রাম থেকে পাবনার তিনগাছা বাবুর বাগানে লিচু কিনতে আসা ব্যবসায়ী বাদল হোসেন জানান, গত আট বছর ধরে তিনি পাবনা থেকে লিচু কিনে ব্যবসা করেন।
তবে, চলতি বছরের মতো ভালো ফলন তিনি দেখেননি।
রমজানেও বেচাকেনা খুব খারাপ হয়নি। রমজানের পর বাজার ধরতে পারলে আরো লাভবান হবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে, দেশি জাতের লিচুর পর এখন বাজারে আসতে শুরু করেছে বোম্বাই, চায়না থ্রি, মোজাফফরি ও হাড়িয়া লিচু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনে এবার লিচুর রাজ্য দিনাজপুরকেও ছাড়িয়ে যাবে পাবনা। প্রতি হেক্টরে ১২ মেট্রিক টন হিসেবে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পঞ্চাশ হাজার মেট্রিক টন। বাজার দরে যার মূল্য কমপক্ষে সাতশ কোটি টাকা।
পাবনা টেবুনিয়া বীজ উৎপাদন কেন্দ্রের উপপরিচালক কে জে এম আব্দুল আওয়াল বলেন, কৃষি প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং কৃষকদের সচেতন পরিচর্যার কারণে লিচুর উৎপাদন বেড়েছে। এখন কৃষক লিচু চাষে কেবল প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল থাকেন না, প্রযুক্তিগত জ্ঞানও প্রয়োগ করেন।
এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক বছরে ভালো লাভ হওয়ায় পাবনায় লিচু বাগান ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। আগামীতে জেলায় লিচুর উৎপাদন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
তবে, ঈদের আগে ও পরে ছয়দিন পণ্য পরিবহন বন্ধ এবং ধর্মঘটের ঘোষণায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় গাছ থেকে নামানোর অপেক্ষায় থাকা বিপুল পরিমাণ লিচু, তাদের খুশির ঈদে বয়ে এনেছে শঙ্কা। ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে, পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখলেও, বিকল্প ব্যবস্থায় লিচু পরিবহনের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর এলাকার লিচু ব্যবসায়ী উজ্জল হোসেন জানান, বিভিন্ন ব্যাংক ও সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আমি তিনটি বাগানে তিনশটি লিচু গাছ কিনেছি। বাজার ভালো হলেও এখনো বিনিয়োগের টাকা ওঠেনি। এখন পাকা ফল ঈদে ছয় দিন গাড়ি বন্ধ থাকলে আমার পথে বসার উপক্রম হবে।
এমনই দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন সদর উপজেলার আবু তালেব, জাহেদ আলী, বাচ্চু মোল্লাসহ এ অঞ্চলের সকল বাগান মালিক, পাইকার ও ব্যবসায়ীরা।
পচনশীল পণ্যটি পরিবহনে সরকারের বিশেষ অনুমোদন চান তারা।
এ ব্যাপারে পাবনার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শাফিউল ইসলাম জানান, লিচু ব্যবসায়ীদের সমস্যাটি পাবনা জেলা প্রশাসন খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। আশা করছি বিশেষ ব্যবস্থায় লিচু পরিবহনে সিদ্ধান্ত আসবে।