বাংলাদেশকে আমি এবারের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখি। কিন্তু পথটা তো খুব কঠিন। জিততে হবে ম্যাচ। ম্যাচের পর ম্যাচ। এ জয়ের ধারা ধরে রেখে লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে ম্যাচ জয়ের নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলা পালন না করে তো উপায় নেই।
সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা এবারের বিশ্বকাপে পালন করবে বলে মনে হচ্ছে উইকেট। উইকেট খুবই ভালো থাকবে যা দেখলাম। তাই এটা হবে রানের খেলা। বোলারদের খুব ভালো বল করতে হবে। ধরুন, প্রথম ১০ ওভার, শেষ ১৫ ওভার কিংবা শেষ ১০ ওভার ওই সময়ে যদি মেইন লাইনে বলা করা যায় বিশেষ করে তখন দরকার হবে ব্লকহোলে বল করাটা। ওই ১০ আর শুরুর ১০ ওভারে ভালো বল করতে পারে তাহলে প্রতিপক্ষকে ২৮০-২৯০-এর মধ্যে বেঁধে রাখা সম্ভব। আর এমনটা করতে না পারলে রান হয়ে যাবে ৩৫০-৪০০।
কারণ যে উইকেট আর প্রত্যেক দলের ওপেনাররা যেমন শক্তিশালী। বেশিরভাগ দলের ওপেনারা কিন্তু খুব ভালো শট খেলতে পারে। ইংল্যান্ডে দেখেন, ইন্ডিয়ায় দেখেন, আরও বিভিন্ন দলে দেখেন। ওপেনাররা একটা দারুণ শুরু করে দেবে। তাই আমাদের ব্লকহোলে বোলিং করাটা জানতে হবে, ডিফেন্স করা জানতে হবে। আর তা না হলে আমরা সমস্যায় পড়ব।
আরেকটা জিনিস যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ওপরের দিকের ব্যাটসম্যানদের রান করতে হবে। বিশেষ করে প্রথম চার ব্যাটসম্যানের মধ্যে অন্তত দুজনকে বড় ইনিংস খেলতে হবে। নইলে দল ভুগবে।
এখন যে উইকেটে খেলা দেখছি তা হয়তো সামনে বদলাবে। আরও ফ্লাট হবে। রান হবে আরও। এসব উইকেটে আমাদের ওপেনাররা যদি ফ্লপ করে তাহলে সামলে নেওয়া সত্যি কঠিন হবে। প্রথম তিনজন যদি ফ্লপও করে তাহলে চার-পাঁচকে দায়িত্ব নিয়ে অনেক বড় ইনিংস খেলে দিতে হবে। প্রথম তিনজন যে ফ্লপ করল সামলে নিতে বা শুধরে নিতে খেলায় থাকতে চার-পাঁচকে কাজটা করে দিতে হবে।
এর আরেকটা কারণ বলি। ছয়, সাত বা আট নম্বরে যারা ব্যাট করবে তাদের জন্য যদি বেশি ওভার থেকে যায় তাহলে তাদের পক্ষে কিন্তু অতটা ক্যারি করা সম্ভব হবে না। শঙ্কা থাকবে। স্ট্রাইক রেট কমতে থাকবে। ওখানে হয়তো সাব্বির খেলবে, সাইফউদ্দিন খেলবে। ওদের বেশি ওভার খেলতে হলে সমস্যা। ওদের যদি ১০ ওভার দেন তাহলে ওরা স্ট্রাইক রোটেট করবে, হাতে দুই উইকেট থাকবে হয়তো কিন্তু রান আসবে। সোজা কথা, তিন-চারজন ব্যাটসম্যান যদি রান না করতে পারে তাহলে ভুগতেই হবে।
এই বিশ্বকাপ বোলারদের বিশ্বকাপ হবে এক হিসেবে। যাদের বোলিং শক্তি বেশি ভালো হবে তাদের শিরোপা জেতার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। তাই বোলারদের সমীহ করে খেলার পাশাপাশি ম্যাচ জিততে বাংলাদেশকে শুধু নয়, সবাইকে একটা বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশের কথাই বলি। সাকিব আল হাসান এখন অনেক বেশি স্ট্রাইক রোটেট করে খেলে। এই বিষয়টা খেলাটা এবারের বিশ্বকাপে হবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণও বলা যায়। এখানে যদি আপনি চিন্তা করেন ১০০ বলে ৮০ করবেন কিংবা ১০০ বলে ৯০ করবেন তাহলে কী হবে? শেষ পর্যন্ত যদি ২৮০-২৯০ টার্গেট করেন, তাহলেও প্রতিপক্ষ তা সহজে করে ফেলবে। এখানে জিততে হলে আপনাকে কমপক্ষে ৩০০-এর বেশি করতে হবে। হয়তো ৫টি উইকেট ফেলে দিলেন। এরপর ওদের চার্জ করে খেললে হয়তো উইকেট পড়ার সুযোগ থাকবে।
তারপরও একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখবেন যে ব্যাপারটা কেমন। সেদিন ইংল্যান্ড-পাকিস্তান খেলায় পাকিস্তান ৩৪০ রান করল। কিন্তু ইংলিশরা যখন মাঠ ছাড়ছে তখন তাদের কী রিল্যাক্স দেখাল। যেন ওই রান তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। ওদের ভাব দেখে আমার মনে হয়েছিল, ওরা ম্যাচটা জিতেই গেছে। ঠিকই তারা বেশ সহজে ম্যাচটা জিতে বের হয়ে গেছে। কারণ ওরা জানে এসব ৩৫০ নিরাপদ না।
ইংলিশ সামারে বিশ্বকাপ। এই সময়ে খটখটে ওয়েদার থাকে। উইকেট খুব ভালো থাকে। ব্যাটসম্যানদের জন্য শট খেলা খুব সহজ হয়ে যায়। বিশেষ করে যারা স্ট্রোক খেলতে পছন্দ করে তাদের জন্য লোভনীয়। এমন না যে গিয়ে খুব স্ট্রাগল করতে হবে। হয়তো পাঁচ-ছয়টি বল দেখে খেললেন। এরপর চাইলেই আপনি সব শট খেলতে পারবেন।
বোলারদের প্রসঙ্গে আরেকবার আসি। আমার বিশ্বাস ওরা যদি ২৬০-২৮০-তে প্রতিপক্ষকে আটকে দিতে পারে তাহলে আমাদের খুব ভালো সুযোগ থাকবে জেতার। কারণ প্রতিপক্ষ তখন মানসিকভাবে পিছিয়ে থাকবে। ওরা জানবে ওদের হারার সম্ভাবনা অন্তত ৭০ শতাংশ। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অ্যাডভান্টেজ থাকবে। বোলাররা খুব ভালো করতে পারলেই এটা সম্ভব। কিন্তু নরমাল লেন্থে বোলিং করে আপনি কাউকে ১৮০-এর মতো স্কোরে আটকাতে পারবেন না। আপনাকে ব্লকহোলে বোলিং করা জানতে হবে, ওয়াইডিশ ইয়র্কার, ইয়র্কার মারতে হবে। সেøায়ার বাউন্সার মারতে হবে, সেøায়ার দিতে হবে। আমাদের বোলাররা যদি এই কাজগুলো করতে পারে তাহলে অন্যদের ২৮০-২৯০-এর মধ্যে রাখা সম্ভব। স্টক বোলিং করে ওদের এই অবস্থায় আটকাতে পারবেন না।
বাংলাদেশের ৩০০-এর বেশি রান তাড়া করে জেতার তেমন অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সেই পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে টপ অর্ডার থেকে আপনার একটা সেঞ্চুরি অবশ্যই দরকার হবে। একজন ওপেনারকে বড় ইনিংস খেলতে হবে কম বলে।
কে চ্যাম্পিয়ন হবে? কারা সেমিফাইনালে খেলবে? আমি অবশ্যই বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে দেখতে চাই। আমার মন থেকে চাই। দ্বিতীয়ত, ইংল্যান্ডকে দেখতে চাই। তৃতীয়ত, আমি ভারতকে দেখতে চাই। আরেকটা... আসরে চতুর্থ দলটা যে কে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। বলা খুব কঠিন। কে যে হয়।
শেষ কথা, সেমিফাইনালে খেলতে হলে বাংলাদেশকে অন্তত ছয়-সাতটি ম্যাচ জিততে হবে। আমি বিশ্বাস করছি। চলুন এই বিশ্বাসটা প্রবলভাবে ছড়িয়ে দিই আমাদের প্রিয় ‘বাংলাদেশ’ দলে।