আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ট্রফি জেতাটা অবশ্যই আমাদের দলকে বাড়তি একটা আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এর আগে নিউজিল্যান্ডে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারিনি। ওখানে যেভাবে খেলেছিলাম সেই প্রসঙ্গে এমনকি আয়ারল্যান্ডে প্র্যাকটিস ম্যাচের কথাও বলতে হয়। ওই খেলাটা আমাদের ভালো হয়নি। হেরে গিয়েছিলাম ওদের দ্বিতীয় সারির দলের কাছে। এর ফলে একটা ভয় নিশ্চয়ই কাজ করছিল যে এরপর আমরা সিরিজে কেমন করব।
তো ট্রাইনেশনে প্রতিটি ম্যাচে আমরা খুব চমৎকার খেললাম। সব ম্যাচেই বোলাররা বিশেষ করে শেষ ১০ ওভারে দারুণ করেছে। ফাইনাল ম্যাচও যদি দেখি তাহলে শেষে ৩.৫ ওভারের কারণে আমরা ম্যাচটা জিততে পেরেছি। সহজভাবে। ওই ৩.৫ ওভারে আমরা ২১ রান দিয়ে ১টি উইকেট পেয়েছিলাম।
এই কারণে আমার মনে হয় শুধু আমাদের দল নয়, এই বিশ্বকাপে যাদের বোলিং ভালো হবে তারাই আসলে চ্যাম্পিয়ন হবে। ওখানে সবাই রান করে। প্রতিটি দল কিন্তু ৩০০ প্লাস রান করবে। যে ধরনের উইকেট, যে ধরনের আউটফিল্ড, তারপর গ্রাউন্ডের কথা বলতে হবে। ইংল্যান্ডের মাঠ কিন্তু অত বড় না।
তারপর আসুন নিয়মের দিকে। ১১ ওভার থেকে ৪০ ওভার পর্যন্ত চারজন ফিল্ডার নিতে পারবেন বাইরে। এই সিস্টেমে কিন্তু রান করাটা সহজ। আমার কাছে মনে হয় উইকেট ব্যাট করার জন্য খুব সহজ হবে। বোলারদের প্রতিটি ম্যাচে পরীক্ষা দিতে হবে।
আমাদের জন্য বিশ্বকাপ? আমারও স্বপ্ন, সবার স্বপ্ন, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নÑ আমাদের দল এবার সেমিফাইনালে বা ফাইনালে খেলবে। কিন্তু আমার মনে হয় ফরম্যাট, যেটা আসলে ’৯২-এর মতো, সেটার কারণে আমাদের জন্য বিশ্বকাপটা একটু কঠিন হয়ে যাবে। এটা বাস্তব সত্য। মানতেই হবে।
কারণ এখন পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ ২০১৫। সেখানে আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছি। কিন্তু ওখানে শেষ আটে খেললেও আমরা ম্যাচ জিতেছিলাম তিনটি। এর মধ্যে দুটি ছিল আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। ওরা বেশ দুর্বল দল ছিল। আমরা তাদের হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের দিকে এগিয়েছিলাম। ইংল্যান্ড একটা বড় দল ছিল। শক্তিশালী সেই দলকে হারিয়ে আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছিলাম।
এবারের বিশ্বকাপে কিন্তু দুর্বল দল নেই। একমাত্র আফগানিস্তানকে আমরা কিছুটা দুর্বল দল মনে করছি। কিন্তু তাদের বোলিং আমাদের চেয়ে ভালো। ওদের ব্যাটিং হয়তো অত ভালো না। ওরা আয়ারল্যান্ডে প্রথম ম্যাচ হারার পর দ্বিতীয় ম্যাচে ৩০০-এর বেশি রান করেছিল।
হ্যাঁ, অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে আমরা খেলেছি। বড় দলগুলোর সঙ্গে ভালো রেজাল্ট হয়েছে। অসাধারণ ফর্মে আছি। শ্রীলঙ্কাকে আমরা নিয়মিত হারাচ্ছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাচ্ছি টানা। এসব অভিজ্ঞতা ভালো। কিন্তু বিশ্বকাপ যখন শুরু হবে তখন ব্যাপারটা ভিন্ন। এটা একেবারে ভিন্ন ধরনের খেলার আসর। এটা বিরাট মঞ্চ। বড় দলগুলো এমন মঞ্চে অনেক ভালো করে, ভালো খেলে, লড়ে। তাদের ওই কনফিডেন্সটা থাকে।
আমাদের প্রসঙ্গ এলে আমার বিশ্বাস এটাই আমাদের সেরা টিম। এই মুহূর্তে ওরাই দেশের সেরা খেলোয়াড় ছিল। এবং সবাই ফর্মে আছে। কিন্তু রেজাল্ট ওয়াইজ ভাবলে আমার কাছে মনে হয় আমাদের জন্য ছয়টি ম্যাচ জেতা একটু কঠিন, বেশ কঠিন হয়ে যাবে।
একটু পেছনে ফিরে দেখি। ২০০৭ বিশ্বকাপে আমরা দুটি দলকে হারিয়েছিলাম। একটা ভারত, অন্যটা দক্ষিণ আফ্রিকা। তারা শীর্ষ দল ছিল, বড় দল ছিল। এবারও যদি আমরা সেটা করতে পারি মানে অন্তত তিন থেকে চারটি দলের বিপক্ষে জিততে পারি তাহলে আমার মতে এটা হবে আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন।
বাংলাদেশের সিনিয়ররা ধারাবাহিক। কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে জুনিয়রদের অধারাবাহিকতা। কিন্তু দেখুন, ২০১৫ বিশ্বকাপে আমাদের ভালো করার পেছনে সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমানের বড় ভূমিকা ছিল। ওরা ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলেছিল। অল্প সময় খেলেছিল, কিন্তু কার্যকর। ৩০, ৪০, ৫০ করেছিল। খুব প্রভাব ছিল ওই ইনিংসগুলোর। হাই স্ট্রাইকরেটে খেলেছিল। তো এবারের টুর্নামেন্টে আমি তাদের কাছে এমনটাই আশা করব।
তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ ওরা ওদের অভিজ্ঞতা থেকে খেলবে। সৌম্যদের অভিজ্ঞতা সিনিয়রদের চেয়ে একটু কম হলেও ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাই ওরা ২০১৫ বিশ্বকাপে যেমন ভয়ভীতিহীন ক্রিকেট খেলেছিল সেটাই আমি ওদের কাছে চাইব। বল টু বল, হাই স্ট্রাইকরেটে খেলবে। আয়ারল্যান্ড সিরিজে সৌম্য খুব ধারাবাহিক ছিল, এটা যেন ধরে রাখতে পারে বিশ্বকাপে। চমৎকার ব্যাট করছে, ফর্মে আছে।
মোসাদ্দেক অসাধারণ খেলেছে। যে ১৫ জনকে নেওয়া হয়েছে শুধু সাব্বিরকে বাদ দিয়ে ট্রাইনেশনে সবাই কিন্তু পারফর্ম করেছে। সাব্বির তেমন সুযোগ পায়নি। যে সুযোগ পেয়েছে তাতে পারফর্ম করতে পারেনি। আনলাকি বলব। মনে রাখতে হবে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে একটা সেঞ্চুরি করেছিল। আমার আশা, ১৫ জনের সবাই ফর্মে আছে এবং তারা যেন বিশ্বকাপে সেটা ধরে রেখে পারফর্ম করতে পারে। এটাই জরুরি।
আমাদের দলে এখন যারা রিজার্ভ বেঞ্চে বসে আছে তারা কিন্তু পারফর্ম করেই বসে আছে। এটা আমাদের জন্য পজিটিভ দিক। যারা সুযোগ পাবে শুরুতে তারা যদি পারফর্ম করতে না পারে তাহলে বাইরে যারা আছে তারা একাদশে এসে মানিয়ে নিতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।
এখানে বোলিং নিয়ে একটা কথা বলা দরকার। মূল টুর্নামেন্টে মাশরাফীর টিম বোলিং শক্তিটা বাড়ানো উচিত। আমরা সবাই জানি এখানে রান প্রচুর হবে। ৩৫০-এর মতো। তো ইংল্যান্ডে যে ম্যাচে আমরা ২০-৩০ রান কম দিতে পারব, মানে সবাই জানে ৩৫০-এর জায়গায় যদি ২২০-২৩০-এ আটকাতে পারি তখনই কিন্তু আমরা ম্যাচ জিততে পারব। ৩৫০-এর জায়গায় ৩৭০ দিয়ে দিলে আমাদের জেতার সম্ভাবনা কমে যাবে।
এখন তো টিম সিলেকশনটা টাফ। প্রথম তিনটি ম্যাচে হয়তো আয়ারল্যান্ডে যে টিম খেলেছে সেটাই খেলবে। আমি মনে করি রুবেল হোসেনকে একাদশে রাখা। নিয়মিত খেলানো উচিত। কারণ আমাদের দলে ওই একমাত্র প্রতিপক্ষকে গতিতে ভয় ধরাতে পারে। মোস্তাফিজ তার পুরো ছন্দে এখনো আসতে পারছে না। সময় লাগবে হয়তো। শুরুতে ভালো বল করছে। সাকিবও ভালো বল করছে। এই মুহূর্তে আসলে সেরা দলই খেলাবে।
আমরা কার সঙ্গে খেলছি? প্রথম ম্যাচে আমাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। ওদের বিরুদ্ধে পেস আক্রমণ বেশি ব্যবহার না করে স্পিনকে বেশি ব্যবহার করলেই তা ভালো হবে বলে মনে করি। কারণ আমাদের যে পেস অ্যাটাক তা দিয়ে ওদের সামলানো কঠিন হবে। স্পিন দিয়েই ওদের সামলানো উচিত হবে।
অনেকে বলেন, বাংলাদেশের বোলিং অ্যাটাক ২৬০-২৮০-এর মধ্যে প্রতিপক্ষকে আটকে ম্যাচ জেতার একটা ধারা তৈরি করেছে। ইংল্যান্ডে কী হবে? ঠিক জানা নেই। তবে এটাও হতে পারে। ইংল্যান্ডের আবহাওয়া একটু অন্যরকম। চেঞ্জ হতে থাকে। টস জিতে যদি ব্যাট করি আর আকাশ মেঘলা থাকে, উইকেটে সহায়তা থাকে তখন সুইং কাজে লাগে। হয়তো আমাদের ১৪৫-১৫০ গতির এক্সপ্রেস বোলার নেই। মোস্তাফিজ বলেন, মাশরাফী বলেন ওরা কিন্তু অভিজ্ঞ ও পারফরমার। হোম কন্ডিশনে হয়তো ভালো। জিতছি। চার বছর ধরে আমরা কিন্তু ভালো করছি।
এটা বলতে পারেন যে, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আমরা সেমিফাইনালে খেলেছি। পেসাররা ওখানে ভালো করতে পারেনি। কথা হলো, ট্রু উইকেটে আমাদের এখনো অনেক কিছু শিখতে হবে। এটা সত্যি কথা। পাটা উইকেটে সেøায়ার, বাউন্সার, ভেরিয়েশন, ইয়র্কার, সুইং করানো বা রিভার্স সুইং এগুলো শিখতে হবে আমাদের। না হলে ওইসব জায়গায় টিকে লড়াই করা কঠিন।
বোলাররা হয়তো মার খাবেন কখনো। ভেঙেও পড়তে পারেন। ভয়ংকর সব ব্যাটসম্যান থাকবে সামনে। কিন্তু আমাদের মাশরাফী আছে, ম্যানেজার হিসেবে খালেদ মাহমুদ সুজন আছেন। কোচ স্টিভ রোডসকে নেওয়া হয়েছেই ইংল্যান্ডের কন্ডিশন তিনি বোঝেন বলে। তাই খারাপ সময়ে সবাই যেন একসঙ্গে থাকে। খারাপ হতেই পারে। সেখান থেকে ফিরে আসতে হবে। মাশরাফী ১৮ বছর ধরে ইন্টারন্যাশনালে খেলছে, সফল ক্যাপ্টেন। বোলারদের হতাশার সময় তাদের নিয়ে কাজ করতে হবে।
অবশ্যই আমি স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ ফাইনালে খেলবে। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে আমরা এই ধরনের পরিস্থিতিতে কখনই পড়িনি। বড় বড় শক্তিমান দুর্ধর্ষ দলের সঙ্গে খেলতে হবে। একটা এমন বড় টুর্নামেন্টে পাঁচ-ছয়টি ম্যাচ জেতা। প্রত্যেকের সঙ্গে খেলা। দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। ফাইনালে খেলতে পারলে তো আলহামদুলিল্লাহ। ভেরি গুড। কিন্তু এই আসরে তিন থেকে চারটি ম্যাচ জিততে পারলেও আমি মনে করি আগের সব বিশ্বকাপের চেয়ে এই বিশ্বকাপের অর্জন আমাদের জন্য গর্বের হবে।
বিশ্বকাপ তো তারকার জন্ম দেয়। মুশফিক তো ধারাবাহিক সবসময়। তামিম চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অসাধারণ খেলেছে। সাকিবের কথা তো বলতেই হয়। আমাদের সব খেলোয়াড়ই স্টার। এই বিরাট টুর্নামেন্টে দেশকে আরও ওপরে তুলে নিয়ে আরও মহাতারকা হওয়ার সুযোগ সবার আছে। মাহমুদউল্লাহ তো শেষ বিশ্বকাপে দুটি সেঞ্চুরি করেছে।
সেমিফাইনালে কাদের দেখা যেতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব কঠিন হয়তো। কিন্তু আমার মনে হয় ইংল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশ আসতে পারে। তিনটি দলের ব্যাপারে আমার মনে হয় ওদের খুব বেশি সুযোগ। চার নম্বর পজিশনের জন্য সবাই লড়াই করবে। নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা। নিউজিল্যান্ড বরাবর কিন্তু এমন টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলে থাকে। ওদের বোলিং ইউনিট খুব চমৎকার। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর ভারতের বোলিং সত্যিকার অর্থেই দুর্দান্ত। ইংল্যান্ড খুব ভালো ক্রিকেট খেলছে। গত বিশ্বকাপের পর থেকে। চার নম্বর পজিশনে আসলে সবার সম্ভাবনা আছে। আমার মনে হয় নিউজিল্যান্ডে একটু এগিয়ে থাকবে।
বাংলাদেশকে যদি ৩৫০ বা তার বেশি রান তাড়া করতে হয়? সম্ভাবনা খুব আছে। আয়ারল্যান্ডে আমরা ৪৩ ওভারে ২৯৪ করেছি। জিতেছি। তার মানে ওই হিসেবে ৩৫০ রান করার মতো ব্যাট করেছি। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের বোলিং আর ইংল্যান্ডের বোলিং এবং যাদের সঙ্গে খেলা তাদের বোলিং আক্রমণ কিন্তু ভিন্ন হবে। একেবারে অন্যরকম। এসব কারণেই বলছি আমাদের জন্য এবারের ওয়ার্ল্ড কাপটা অনেক চ্যালেঞ্জের হবে। আমাদের তো ৩৫০ বা এমন রান করার বা তাড়া করার অভিজ্ঞতা নেই। অভ্যস্তই। এই কারণে বলছি ছয়-সাতটি ম্যাচ জেতা আমাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাবে। সেজন্যই তিন থেকে চারটি ম্যাচ জিততে পারলেও আমাদের জন্য এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পাওয়া হবে।