সাদা-কালোর আলোচনাটা সহজে দূর হবে না

দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংয়ের স্তম্ভ কাসিগো রাবাদা। গত বছর বিশে^র দ্বিতীয় সেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পেয়েছেন আইসিসি থেকে। এই বিশ্বকাপেও তার দিকে থাকছে বাড়তি নজর। মাঠে তার রগচটা চেহারাটা চোখ এড়ায় না কারোই। গতির ঝড় তোলার পাশাপাশি আবেগের অতিমাত্রায় বহিঃপ্রকাশে আলোচিত এই ফাস্ট বোলারের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে ইএসপিএন-ক্রিকইনফো। ক্রিকেট এবং ক্রিকেটের বাইরের অনেক কিছুই এসেছে তার জবানিতে

ফিটনেস নিয়ে আপনি কতটা সচেতন?

রাবাদা : আমি ছোটবেলা থেকেই খুব দুরন্ত ছিলাম। স্কুলে রাগবি, অ্যাথলেটিকস খেলেছি। তারও আগে আরও ছোটবেলায় আমি যখন আমার দাদির কাছে থাকতাম তখন সকাল ৭টায় উঠে বিকেল ৫টায় বাড়ি ফিরতাম। সারাদিন ছোটাছুটি করেই কাটত। এসব কারণে আমার ফিটনেস সবসময়ই খুব ভালো ছিল। এখনো আছে। তাই বলে আমি কিন্তু খুব বেশি সচেতন নই, নিয়ম মেনে চলার মতো ছেলেও নই আমি। জিম করি নিয়মিত। তবে আমি জীবনটা উপভোগ করতে ভালোবাসি, আর দশটা তরুণ যেভাবে চায়। আমি ম্যাকডোনাল্ডস ভালোবাসি। পছন্দ করি মিষ্টি খেতে। জাঙ্ক ফুড নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। মাঝেমধ্যে বিয়ার খেতেও ভালোবাসি।

আপনার সতীর্থ ডেল স্টেইন তো দৌড়েই নিজের ফিটনেস ধরে রাখে?

রাবাদা : আমি কিন্তু ঠিক সে রকম নই। ডেল তার স্ট্যামিনা বাড়িয়ে নেয় প্রচুর রানিং করে। আমি ঠিক উল্টো। আমার মনে হয় আমি যখন বোলিং করি তখনই আমার প্রচুর ব্যায়াম হয়ে যায়। আলাদা করে রানিংয়ের দরকার কী?

দ্বিতীয় স্পেল এবং শেষ দিকেও আপনাকে ঠিক প্রথম স্পেলের মতোই ভয়ংকর হয়ে উঠতে দেখা যায়। কারণটা কী?

রাবাদা : আসলে আমার কাছে প্রতিটি স্পেল একই রকম। হয়তো আমার এনার্জি লেভেলটা অন্যরকম। তা ছাড়া পরিস্থিতিও আমাকে ওরকম করে তুলেছে। আমি আসলে কখনোই ব্যাটসম্যানকে খুব সহজে খেলতে দিতে চাই না। আমি চাই তারা আমার বলে কষ্ট করে রান করুক।

আপনাকে ঠিক যেমনটা দেখা গিয়েছিল গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজে?

রাবাদা : আসলে ওই সিরিজে অনেক বেশি আবেগের উপস্থিতি ছিল। ওই সিরিজে প্রতিটি পরতে ছিল উত্তেজনা। আবেগ তো ছিলই। তা ছাড়া দ্বিতীয় টেস্টে সমানে চলছিল সেøজিং। সে সময় নিজেকে প্রমাণ করার তাড়না ছিল অনেক বেশি। যখন আপনি আবেগ নিয়ে খেলবেন আপনি ভয়ংকর রূপ নেবেন। যখন আমরা নিজেদের দেশে খেলি তখন আমরা নিরপেক্ষ থাকতে পারিনি। হয়ে পড়ি ভয়ংকর। আমরা সব কিছু জিতে নিতে চাই।

ফাস্ট বোলিংয়ের সংজ্ঞা কী আপনার কাছে?

রাবাদা : ফাস্ট বোলিং অনেকটা শিল্পের মতো। এখানে গতি আছে, শক্তি আছে, আছে পৌরুষত্ব। বিশে^র সেরা ফাস্ট বোলারদের অনেকেই অনেক ভালো অ্যাথলেট। ফাস্ট বোলিং হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের জন্য হুমকি। তাদের কাজকে কঠিন করে তোলা এবং একটি দলের মানসিকতা নির্ধারণ করে দেয় ফাস্ট বোলিং।

আপনার টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ভারতের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে যখন আপনার বয়স ২০ বছর। আপনারা ৩ ম্যাচ সিরিজটা হেরেছিলেন ৩-০তে। কেমন অনুভূতি ছিল তখন?

রাবাদা : এটা দুঃসহ একটা অভিজ্ঞতা ছিল আমার এবং আমার দলের। সেবার আমরা লম্বা একটা সফরে গিয়েছিলাম। আমরা টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতি, ওয়ানডে সিরিজও জিতি। কিন্তু টেস্ট সিরিজে এমন সব উইকেটে খেলা হয়েছিল যেগুলোতে ভালো করার কোনোই সুযোগ ছিল না। একজন ফাস্ট বোলার হিসেবে সেখানে কোনো বাউন্স ছিল না, ছিল না কোনো গতি। সেখানে খানিকটা রিভার্স করতে চেয়েছিলাম। নিজের সেরাটাই দিতে চেয়েছিলাম।

আপনার গতিটা অনেক বেশি কার্যকর হয় ছোট ঘরানার ক্রিকেটে। আপনিও কি মানেন এটা আপনার প্রধান অস্ত্র?

রাবাদা : গতিটা সবসময়ই আমার বাড়তি সুবিধা। কারণ গতিময় বল ব্যাটসম্যানদের কম সময় দেয় ভাবতে। তারপরও গতিময় বলে ব্যাটসম্যানরা সফল হয় পাওয়ার প্লের সময়। আপনাকে গতির সঙ্গে সঙ্গে সঠিক জায়গায় বল করাও জানতে হবে।

২০১৮ সালের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারটা ভারতের বিরাট কোহলির কাছে হারালেন। টেস্টে সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারটাও কোহলি আপনাকে হারিয়ে জিতে নিলেন। তারপরও আপনি ছিলেন সে বছরের দ্বিতীয় সেরা। কেমন লেগেছে?

রাবাদা : এটা অনেক বড় সম্মানের ছিল। কোহলি সন্দেহাতীতভাবেই সেরার স্বীকৃতির দাবিদার। সে সত্যিই দুর্দান্ত। গত পাঁচ বছর ধরে ভারতের ক্রিকেটের স্তম্ভ সে। এমন একজনকে পেছনে ফেলা সত্যিই কঠিন। আসলে আমি কখনোই কোনো কিছু পাওয়ার জন্য খেলি না। তবে এ রকম একটা পুরস্কার আপনাকে আরও বেশি উজ্জীবিত করবে। আমি সত্যিই বিশে^র সেরা ক্রিকেটারদের পুরস্কার নিয়ে ভাবতে এবং কথা বলতে ভালোবাসি, গর্ববোধ করি।

মাঠে মাঝেমধ্যেই আপনাকে আবেগের অতিমাত্রায় প্রকাশ ঘটাতে দেখা যায়। কেন?

রাবাদা : আমি সাধারণত মাঠে চুপচাপ থাকতেই পছন্দ করি। তবে যখন প্রয়োজন হয় তখন আমি আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাই। যখন আমি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করি, তখন আমাকে আবেগতাড়িত হয়ে খেলতে দেখবেন মাঠে। এটা আমি উপভোগও করি কখনো কখনো। আবেগটা ক্রোধের মাধ্যমে প্রকাশ ঘটানোর ফলেই হয়তো কিছু ডিমেরিট পয়েন্ট জুটেছে আমার কপালে। তা না হলে একজন ফাস্ট বোলার কেন হব আমি।

মাঠে আপনার ক্ষুব্ধ আচার-ব্যবহারের জন্য সম্প্রতি বেশ কিছু ডিমেরিট পয়েন্ট পেয়েছেন। এসব কি আপনাকে শুধরাতে সহায়তা করবে?

রাবাদা : আমি জানি না। আসলে ডিমেরিট পয়েন্টগুলো আমি পেয়েছি খুব ছোটখাটো কারণে। এটা উইকেট পাওয়ার পর আমার আবেগের একটু বাড়তি বহিঃপ্রকাশের জন্য হয়েছে। আমি এটাকে খুব খারাপ চোখে দেখি না। আপনি যখন অনেক কষ্টে একটা উইকেট নেবেন তখন আপনার উদ্যাপনটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের হতেই পারে কখনো কখনো। সেটাই হয়েছে আমার ক্ষেত্রে।

তার মানে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রকদের কাছে কি আপনি আবেগের বহিঃপ্রকাশকে ক্রিকেটেরই অংশ হিসেবে সংযুক্ত করতে বলবেন?

রাবাদা : এটা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। ডিমেরিট পয়েন্ট প্রথাটা প্রবর্তন করা হয়েছে ক্রিকেটীয় আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু আমরা তো এখানে কেউ মারামারি করছি না। আমি মনে করি ডিমেরিট পয়েন্ট প্রবর্তনের ফলে লড়াকু মনোভাবটা কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কমে যাচ্ছে খেলাটি থেকে।

বর্ণবৈষম্য থেকে ক্রিকেটে ফেরার এ সপ্তাহেই দক্ষিণ আফ্রিকার বয়স ২৫ পূর্ণ হবে। আপনিও অতি সম্প্রতি ২৪-এ পা রাখবেন। একজন তরুণ দক্ষিণ আফ্রিকান, একজন সফল ক্রীড়াবিদ হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?

রাবাদা : দেশের নাগরিক হিসেবে আমার অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ। তবে এটা কখনো কখনো আপনাকে বিভ্রান্তও করবে। আপনাদের অনেক খেলোয়াড় আছে যাদের কোটার মধ্য দিয়ে খেলতে আসতে হয়। আর আমার দেশের রাজনীতিতে এখনো সাদা-কালো মনোভাবটা বিদ্যমান। যেটা অতি সহজে দূর হবে না। তবে ধীরে ধীরে মানুষ এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আশা করছি এটা এক সময় থাকবেই না। আমার ভাইয়ের বয়স এখন ১৫, আশা করছি তাদের প্রজন্মে এই বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই হবে না। সাদা-কালোর আলোচনাটা আপনি চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারবেন না। একজন কালো খেলোয়াড় হিসেবে আমিও অনেক কিছুই মোকাবিলা করেছি। সাদা বাচ্চাদের সঙ্গে সঙ্গেই আমি বড় হয়েছি। তাই আমিও জানি অতীতে কালোদের সঙ্গে কী হয়েছে। আমি অবশ্য আমার রং নিয়ে গর্বিত। তবে আমি মনে করি এটা নিয়ে বিভেদটা বন্ধ হোক। আপনি দেখবেন পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে। আমাকে, লুঙ্গি এনগিদির মতো প্লেয়ারদের সুযোগ পাওয়াটাই পরিবর্তন বোঝায়। তবে আমি চাই এই পরিবর্তনের ছোঁয়াটা লাগুক একেবারে তৃণমূলে। পেশাদার পর্যায়ে বাছাইটা হোক মেধার ভিত্তিতে। আমি মনে করি পরিবর্তন তখনই হবে যখন ভেদাভেদ ভুলে সবাই সুযোগ পাবে। খেলোয়াড়রা যত বেশি সুযোগ পাবে তত বেশি নিজেদের প্রমাণ করতে পারবে।