ওয়ার্নার উইনার

গুনে গুনে ৪৩৩ দিন পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে নামা একজন ব্যাটসম্যানকে শুরু থেকেই সাবলীল দেখা যাবেÑ এমনটা আশা করার সুযোগ নেই। ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারির হোতা ডেভিড ওয়ার্নার নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বিশ্বকাপ দিয়ে ফিরেছেন আন্তর্জাতিক আঙিনায়। আফগানিস্তানের ছুড়ে দেওয়া ২০৮ রানের সহজ লক্ষ্যে খেলতে নেমে অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চের সঙ্গে ৯৬ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন এই প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান। ওই সময়টায় অবশ্য বড্ড নড়বড়ে দেখা গেছে ওয়ার্নারকে। নিজের সহজাত বিধ্বংসী রূপটা একদমই ছিল না। কিন্তু ওয়ার্নার যে অন্য ধাতুতে গড়া, তার প্রমাণ তিনি রেখেছেন লড়াই চালিয়ে গিয়ে। ৪৯ বলে ৬৬ রান করা ফিঞ্চের বিদায় দেখলেন। উসমান খাজা এবং তার সঙ্গেই বল ট্যাম্পারিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে নিষিদ্ধ হয়ে ফের ফিরে আসা স্টিভ স্মিথকেও দেখলেন অল্প রানে ফিরতে। কিন্তু ওয়ার্নার অবিচল। মনঃসংযোগে বিন্দুমাত্র চিড় ধরতে না দিয়ে খেললেন ১১৪ বলে ৮৯ রানের হার না মানা ইনিংস। তাতে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া মিশন শুরু করল ৭ উইকেটের অনায়াস জয় দিয়ে। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে প্রত্যাবর্তনটা ওয়ার্নার রাঙালেন ম্যাচসেরা হয়ে।

আগে ব্যাট করা আফগানিস্তান যখন ২০৭ রানেই গুটিয়ে গেল, তখনই জয়ের পেন্ডুলামটা ঝুলে পড়েছে চ্যাম্পিয়নদের দিকে। জবাব দিতে ফিঞ্চের সঙ্গে যখন ব্যাট হাতে নামলেন ওয়ার্নার, তখন ব্রিস্টলের গ্যালারি থেকে উঠল দুয়োধ্বনি। ২০১৮-এর সেই ঘটনার পর স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন ব্যানক্রাফট যতটা সমবেদনা কুড়িয়ে নিয়েছিলেন নিজেদের দোষ স্বীকার করে, ওয়ার্নারের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি। তার প্রতি শুধুই ঘৃণা প্রকাশ করেছে খোদ অস্ট্রেলিয়ানরাই। গোটা ক্রিকেটবিশ্বেও তার প্রতি ছিল না কোনো সমবেদনা। কারণ তিনিই সাজিয়েছিলেন স্যান্ড-পেপার দিয়ে বল ট্যাম্পারিংয়ের পুরো নাটক।

আন্তর্জাতিক আঙিনায় নিষিদ্ধ থাকলেও ওয়ার্নার-স্মিথরা পেয়েছিলেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ। খেলার পাশাপাশি স্মিথ যেমন বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকা-ে নিজেকে জড়িয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছেন, ওয়ার্নার নিশ্চুপ থেকেই নিজেকে শুধরে নিতে চেয়েছেন। আইপিএলে অল্প সময় খেলেও ব্যাটের রানের তুবড়ি ছুটিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। তাই তো নিষিদ্ধাদেশ উঠে যাওয়ার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া দেরি করেনি এই পরীক্ষিত ম্যাচ উইনারকে বিশ্বকাপ দলে ফেরাতে। আর প্রথম ম্যাচেই খানিকটা নড়বড়ে, তবে লক্ষ্যে অবিচল থেকে অপরাজিত ইনিংস খেলে আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন ওয়ার্নার।

‘প্রায় ১২ থেকে ১৪ মাস টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলার পর আজ যেন আমার পা-ই চলছিল না শুরুর দিকে’Ñ ম্যাচ শেষে সহজ স্বীকারোক্তি ওয়ার্নারের। নিজেকে ফিরে পেতে তাই চেষ্টা করেছি যতটা সম্ভব উইকেটে টিকে থাকতে। অবশেষে ঠিকই নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পেরেছি। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, একটা দারুণ জয়ে আমরা বিশ্বকাপ শুরু করতে পেরেছি, যা সামনের পথটা মসৃণ করবে।’

ওয়ার্নারের ওই ইনিংসে বোলারদের ওপর আগ্রাসন ছিল না। এত বড় ইনিংসে একটিবারও বল সীমানার ওপারে উড়িয়ে মারেননি। ছিল ৮টি বাউন্ডারি। তবে সহজাত ফর্মে ফিরতে তিনি জোর দিয়েছিলেন সিঙ্গেলস-ডাবলসে। অধিনায়ক ফিঞ্চও পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন ওয়ার্নারকে তার ঠা-া মাথার ব্যাটিংয়ের জন্য, ‘ওয়ার্নার আমাদের দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। ইনিংসের শুরুর দিকে ও খুব লড়াই করছিল টিকে থাকতে। বল ঠিকঠাক ব্যাটে আসছিল না। তখনই ও কেবল উইকেটে টিকে থাকতে চাইল এবং শেষ পর্যন্তও নিজের দায়িত্বটা সফলভাবেই শেষ করল।’

চার বছর আগে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপজয়ী দলে অন্যতম সদস্য ছিলেন ওয়ার্নার। সেই দল আর এই দলের মধ্যে বেশ তফাতও খুঁজে পাচ্ছেন ওয়ার্নার এবং বর্তমান দলটিকেই এগিয়ে রাখছেন অনেকটা, ‘এই দলটা আগের দলগুলোর চেয়ে একটু অন্যরকম। একটা সময় আমাদের দলে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ে ছিল ঠাসা, যাদের একশোরও বেশি ওয়ানডে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু এই দলটা অপেক্ষাকৃত তরুণ হলেও অনেক বেশি উজ্জীবিত এবং সামর্থ্যও অনেক।’

ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলে শুরুতেই নিজেকে ফিরে পাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন ওয়ার্নার। আসছে ম্যাচগুলোতে শুরুর অস্বস্তিটা নিশ্চয়ই থাকবে না। যদি তাই হয়, এই বিশ্বকাপটা হতে পারে ওয়ার্নারময়।