দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের লড়াইটা যেন প্রাণের সঞ্চার ঘটাল বিশ্বকাপের। ৩০ মে শুরু হওয়া এই বৈশ্বিক আসরে যেন প্রাণ ছিল না প্রথম তিন দিন। চারটি ম্যাচই ছিল একপেশে। ব্যাটে-বলের মারকাটারি লড়াইটা ছিল অনুপস্থিত। জয়ী দলগুলো বিজিতদের দেয়নি কোনো সুযোগ।
রবিবার ওভালের ম্যাচ, আরও ছোট করে বললে বাংলাদেশের ২১ রানের অবিস্মরণীয় জয়, ঘুমন্ত বিশ্বকাপকে যেন জাগিয়ে তুলল। গ্যালারিতে দুই দেশের দর্শকের আনন্দ-উদ্দীপনা বিশ্বকাপকেই নাড়িয়ে দিল। বাংলাদেশের দর্শকরা ওভালকে নিজেদের মাঠ বানিয়ে নেওয়ার দিনে, লাল-সবুজ ভক্তদের অগ্রিম ঈদের উপহারই যেন দিল মাশরাফী বাহিনী। একই সঙ্গে নিজেদের শক্তিমত্তার বার্তাটাও তারা দিয়ে রাখল ক্রিকেটবিশ্বকে।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৭-এ থাকা বাংলাদেশ দলকে শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের সঙ্গে এ আসরের দুর্বল দলগুলোর তালিকায় রেখেছিলেন অনেকে। তাদের নিয়ে বাজি ধরার লোক খুব বেশি ছিল না। টাইগারদের র্যাংকিংয়ের অবস্থান তাদের সত্যিকার সামর্থ্যরে বহিঃপ্রকাশ ঘটায় না। গত ১২ মাসে হার-জিতের হিসাবে বাংলাদেশ সেরাদের তালিকার চতুর্থ স্থানে। শেষ ২৩ ওয়ানডের ১৫টিতে জিতেছে দলটি। যে দলে সাকিব আল হাসানের মতো বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, গত এক বছরে ৫০-এর ওপর গড়ে ব্যাটিং করা তামিম ইকবাল-মুশফিকুর রহিমের মতো বিশ্বমানের ব্যাটসম্যান আছে, সে দল নিয়ে যাচ্ছেতাই কথা বলার সময় এখন শেষ হয়েছে।
আন্ডারডগ দলের তকমা আগের বসন্তে পার করা দলটি এই বসন্তে ক্রিকেটের পরাশক্তি হিসেবে ওয়ানডেতে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের বাইরেও নিয়মিত জয় পাওয়া বাংলাদেশকে তাই আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একই পাত্রে রাখাটা অসম্মানের। প্রথম ম্যাচে প্রোটিয়াদের পাত্তা না দিয়ে জয়ে শেষ চারের স্বপ্নটা আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে টাইগারদের চোখে। এখন আর বড় দলগুলোর ভীতি ছড়ায় না টাইগার শিবিরে। বরং চোখে চোখ রেখেই জয়ের আশা নিয়ে মাঠে নামে তারা।
সৌম্য-তামিমের শুরুর আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে সাকিব-মুশফিকের ঠা-া মাথার রেকর্ডগড়া ১৪২ রানের জুটি, সøগ ওভারে মাহমুদউল্লাহ-মোসাদ্দেকের ঝড়ে প্রোটিয়াদের পাহাড়সম লক্ষ্য দিয়েছিল বাংলাদেশ। ওভালের ব্যাটিংবান্ধব উইকেট এবং বাংলাদেশের পেস দুর্বলতার কথা ভেবে ক্রিস মরিসকে দলে যোগ করা হলেও সৌম্যের ঝড়ে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তামিম-সৌম্যের উদ্বোধনী জুটি সাত ওভারে ৫০ রানের শুরু এনে দিয়ে বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়। তাদের দেখানো পথে সাকিব-মুশফিক জুটি খুব সহজে পাড়ি দেয় খুব বেশি বাধা না পেয়েই। তাই তো রেকর্ড জুটির পর সাকিব-মুশফিকের দ্রুত ফিরে যাওয়া সত্ত্বেও মাহমুদউল্লাহ, মোসাদ্দেকরা হাত খুলে খেলেছেন। ব্যাটসম্যানদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায় বিশ্বকাপে রেকর্ডগড়া ৩৩০ রানের সংগ্র গড়ে তোলে বাংলাদেশ।
রেকর্ড গড়ে জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নামা দক্ষিণ আফ্রিকা ভালো শুরু করলেও, ওভালের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ডি ককের রান আউট উদযাপনের মধ্য দিয়ে নিজেদের ম্যাচে ফিরিয়ে আনে টাইগাররা। বোলিংয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে ইংল্যান্ড কন্ডিশন বিবেচনায় কিপ্টে বোলিং করা সাকিব, মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিনে নিজেদের বারবার হারিয়ে খুঁজে ফিরেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এদিন সাইফউদ্দিন নিজেকে সøগ ওভারে খুঁজে পাওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার জয়ের আশা শেষ হয়ে যায় তিন ওভার বাকি থাকতেই।
বিশ্বকাপে আসার আগে ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের মাধ্যমে অনেক মানসিক বাধা কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশ এবার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ পার করল তারা। তাই তো ওয়ানডেতে নিজেদের সর্বোচ্চ সংগ্রহ গড়ে পাওয়া এই জয় নিয়ে টাইগারদের বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস নেই। তারা জানে, সামনে আরও বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে তাদের। প্রতিটি ম্যাচেই এমনধারা পারফরম্যান্স দেখিয়ে স্বপ্নের ফাইনালে নাম লেখানোই তাদের লক্ষ্য।
এটা বড্ড বাড়াবাড়ি ভাবনা। তারপরও র্যাংকিংয়ের তিনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে মিশন শুরু করা বাংলাদেশ কি বিশ্বকাপ শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেই নিজেদের মেলে ধরল না?
ব্রিটিশ সাংবাদিক রয় জনস্টনের লেখা থেকে