বার্মিংহ্যাম দুঃখ হয়েই রইল প্রোটিয়াদের

কুড়ি বছর আগে এই বার্মিংহ্যাম শহরে হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। এ মাঠেই ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ক্লাসিক্যাল ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ টাই হওয়ায় ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিতে হয় প্রোটিয়াদের। ল্যান্স ক্লুজনার ও অ্যালান ডোনাল্ডের ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট হয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে ক্রিকেটপ্রেমীদের।

কুড়ি বছর পর সেই শহরেই বুধবার লেখা হলো আরেকটি প্রোটিয়া ‘দুঃখগাথা’। নিউজিল্যান্ডের কাছে ৪ উইকেটে হেরে বলতে গেলে শেষ হয়ে গেছে তাদের সেমিফাইনাল স্বপ্ন। ছয় ম্যাচ থেকে পাওয়া ৩ পয়েন্ট নিয়ে ১০ দলের এই আসরের সেরা চারে নাম লেখানোটা দূর স্বপ্ন। পরের তিন ম্যাচে জিতলেও হবে না, পক্ষে আসতে হবে অনেক সমীকরণ। নিউজিল্যান্ডকে হারানোর মতো অবস্থায় থেকেও শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই হার মানতে হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন বলতে গেলে একাই হারিয়ে দিয়েছেন দলকে। ম্যাচ শেষে হতাশ প্রোটিয়া অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসি সে কথাই বললেন।

‘কেন (উইলিয়ামসন) দুর্দান্ত একটা ইনিংস খেলেছে। যা দুদলের মধ্যে ব্যবধানটা তৈরি করে দিয়েছে। একজন ক্রিকেটারের কাছেই বলতে গেলে হেরে গেলাম আমরা’Ñ বলছিলেন ডু প্লেসি। আরও যোগ করেন, ‘আপনার দলে এমন একজনকে প্রয়োজন যে একাই দলকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, আমাদের এই দলটিতে এখনো সেভাবে কেউ নিজেকে প্রকাশিত হতে পারেনি।’

গত বিশ্বকাপেও এই নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরেই ফাইনাল খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে গিয়েছিল প্রোটিয়াদের। এবারও হয়তো সর্বনাশের শেষটা হলো ব্ল্যাক ক্যাপসদের হাতে। তবে প্রোটিয়াদের শনির দশা লেগেছিল বিশ্বকাপের শুরু থেকেই। স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে হেরে মিশন শুরু করা দক্ষিণ আফ্রিকা পরের দুই ম্যাচে হেরে যায় বাংলাদেশ ও ভারতের কাছে। এরপর উইন্ডিজের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচ থেকে ১ পয়েন্ট দিয়ে তারা খাতা খুলেছিল। পরের ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারানোর পরও আশা ছিল। কিন্তু বুধবার নিউজিল্যান্ডের কাছে হারটা তাদের সেই সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ তিন ম্যাচে শতভাগ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারবে কি না তারা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

মাঠে সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছেন না দলের কেউই। তার ওপর চোটগ্রস্ত ডেল স্টেইনকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে উড়িয়ে না এনেও সমালোচিত হচ্ছে দলটি। ৩৫ বছরের এই পেসার কাঁধের ইনজুরির কারণে এখন পর্যন্ত একটি ম্যাচও খেলেননি। তার ওপর এই দশকের অন্যতম সেরা প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এবি ডি ভিলিয়ার্সের অবসর ভেঙে বিশ্বকাপ দলে ফেরার ইচ্ছেকে এড়িয়ে যাওয়াও ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন অনেকে। মাঠ ও মাঠে বাইরে এত আলোচনার মাঝে শতক হাঁকানো উইলিয়ামসনের বিরুদ্ধে রিভিউ না চাওয়ায় আঙুল উঠেছে ডু প্লেসির দিকে। ইমরান তাহিরের অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিটা উইলিয়ামসনের ব্যাটের কানায় লেগে যখন জমা পড়েছিল উইকেটকিপার কুইন্টন ডি ককের হাতে, তখন নিউজিল্যান্ড অধিনায়কের নামের পাশে মাত্র ৩০ রান। আম্পায়ার অবশ্য সেটা আউট দেননি। ডি ককের কাছ থেকেও রিভিউ নেওয়ার ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি ডু প্লেসি। অথচ পরে রিপ্লেতে দেখা গেছে বলটা ব্যাটের কানা ছুঁয়ে এসেছিল। এমন জীবন পাওয়ার পর উইলিয়ামসন নিজের সংগ্রহে আরও যোগ করেন ৭৬ রান। তাতে তিন বল বাকি থাকতে নিউজিল্যান্ড পেয়েছে পঞ্চম ম্যাচে চতুর্থ জয়ের দেখা। ম্যাচ শেষে এ প্রসঙ্গে ডু প্লেসি বলেন, ‘ওই সময়টায় আমি ফিল্ডিং করছিলাম লং অনে এবং কুইনি (ডি কক) ছিল সবচেয়ে কাছে। তবে আমি মনে করি না ওই ঘটনাটাই ম্যাচের জয়-পরাজয় নির্ধারক।’ নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাটিং অর্ডারে আমরা বেশ কজন তরুণ প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান খুঁজে পেয়েছি। তবে এই মুহূর্তে অন্য দলগুলোর সেরা ছয় ব্যাটসম্যানের সঙ্গে যদি আমাদের ব্যাটিং লাইনআপকে পাশাপাশি দাঁড় করান তবে আমি কখনই আমাদের সেরা তিনে রাখব না।’

নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের পর একজন ভেঙে পড়া ডু প্লেসির দেখা মিলল। কুড়ি বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার পর বুধবার নিউজিল্যান্ডকে পুষ্পমাল্য পরিয়ে ডু প্লেসিরা দুঃখের বার্মিংহ্যাম থেকে কেবল সঙ্গী করল কাঁটার জ্বালা।