বাবার হাতে গড়া

বাবা ইকবাল খান ক্রিকেট শিখিয়েছেন নিজের হাতে। চাচা আকরাম খান কোনো দিন তাদের জন্য অনুরোধ করেননি কোথাও। বড় ভাই নাফিস ইকবাল সম্ভাবনা দেখিয়েও হারিয়ে গেলেন। তামিম ইকবাল  হলেন বিশ্বের অন্যতম ওপেনার। কীভাবে? নাফিসের সঙ্গে কথা বলেছেন রানা মিত্র

৩০ বছর ৩ মাস ১ দিন বয়স আজকে তার। জন্ম হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ২০ মার্চ। বাবা ইকবাল খান খুব আগ্রহ নিয়ে তার এই দ্বিতীয় পুত্রসন্তানের নাম রেখেছিলেন তামিম ইকবাল খান। ইকবাল খান নাম রেখে ছেলের মধ্যে অমরতা চেয়েছিলেন তিনি। যেমন করে বড় ছেলের মধ্যেও সেই বাসনা ছিল। তার নাম রেখেছেন নাফিস ইকবাল খান। এই দুই ছেলেই বিশ^খ্যাত। ছোট ছেলে তো আরও বিখ্যাত।

তামিমকে বিবেচনা করা হয় বিশে^র অন্যতম সেরা ওপেনিং ব্যাটসম্যান। স্টাইলিস্ট এই ক্রিকেটার প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ হাজার রান করেছেন। এক দিনের ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশের মানুষ হয়ে ছয় হাজার রান ছুঁয়েছেন। ব্যাট হাতে ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি লম্বা ক্রিকেটারটি যখন ক্রিজে দাঁড়ান, বিশে^র যেকোনো দেশের যেকোনো সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে মেলানো যায়। তাদের মতোই আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক ও ভালো খেলা উপহার দেন। অসাধারণ এই খেলোয়াড়ের জন্ম বাবার হাতে। বাবা ইকবাল খান দেশের অন্যতম নামি ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন, ফুটবল কোচ হিসেবেও নাম করেছেন। অনেক ভালো খেলোয়াড়ের জন্ম দিয়েছেন। বড় ভাই নাফিসের মনে পড়েÑ ছয় কী সাত বছর বয়সে বাবা ফুটবল নয়, ক্রিকেটের ব্যাট উপহার দিয়েছিলেন তার ছেলেকে। যেভাবে বড় ছেলের জন্য করেছেন। ফুটবলার হয়েও ক্রিকেটের প্রতি তার এই আগ্রহ আকরাম খানের হাত ধরে। তার ছোট এই ভাইটি বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন, আইসিসি বিশ^কাপ জিতে বাংলাদেশকে বিশ^জয়ের পথে যাত্রা করিয়েছেন।

টেনিস বলে ছেলে ব্যাট করত, বাবা নিজে বল করতেন। প্রতিদিন তামিমকে তুলে নিয়ে যেতেন অনুশীলনে। ছোট সন্তান বলে তার সঙ্গেই আত্মার বাঁধন ছিল তার। তামিম যেদিন সারা বিশে^ নাম ছড়াবে, সেদিন হয়তো আমি বেঁচে থাকব না। কীভাবে যেন টের পেয়েছিলেন তিনি। সেটিই হয়েছে ২০০০ সালে। বড় ভাইয়ের বয়স তখন ১৫ আর ছোট ভাইয়ের মাত্র ১০। তখন নাফিস ইকবাল পেশাদার লিগে খেলা শুরু করেছেন। যশোরে জাতীয় লিগে খেলতে গিয়েছেন। চার দিনের টেস্ট। দুদিন কেটে গেছে। রাত আড়াইটায় ছোট কাকা আকরাম খান নিজে যশোর স্টেডিয়ামে এসে হাজির। বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক এসেছেন বলে স্টেডিয়ামে সাড়া পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়ের অধিনায়ককে স্টেডিয়ামের গেট খুলে দেওয়া হলো। বিশাল শরীরের মানুষটিকে দেখেই দৌড়ে এলেন নাফিস। কী হয়েছে কাকা? তুমি এত রাতে কেন এসেছো? আকরামের একটিই উত্তর, তোকে এখনই আমার সঙ্গে যেতে হবে। ভাইয়ার শরীরটি খুব খারাপ। সারা রাত কাকার গাড়িতে চড়ে চলে এলেন তারা ভোরে চট্টগ্রামের বাড়িতে। এসেই কান্নার রোল। বাবা আর বেঁচে নেই। বিশ^াস করতে পারলেন না। কদিন আগেই তো কুমিল্লায় তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের শুরুতে গিয়েছিলেন, আর এখন তিনি পরকালে! তখন বাবার কাছে ছিল এই তামিমই। চোখের সামনে বাবাকে মারা যেতে দেখে মেনে নিতে পারেননি ১০ বছরের শিশু। ১৫ বছরের কিশোর ভাই তখন তার আশ্রয় হয়েছেন। ফলে মানসিক দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন তামিম ইকবাল। এভাবেই ভাইয়ের জন্য ভাইয়ের প্রাণ বিলানোর শুরু। তাকে হাতে ধরে ক্রিকেটের নিয়মকানুনগুলো শিখিয়েছেন তিনি।

এই বাবাই তাদের দুই ভাইয়ের অনুপ্রেরণা এমনকি কাকা আকরাম খানেরও। তবে বাবার চাওয়া ছিল বলে ক্রিকেটে ভালো করার আরও জেদ ছোটবেলা থেকেই তামিমের মধ্যে তৈরি হয়েছে। বাবা-কাকার মতোই তামিম ভীষণ পরিশ্রমী। কাকার কাছ থেকে পেয়েছে সাহস, বাবার কাছ থেকে ইচ্ছা। আর ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছেন ক্রিকেট খেলা। বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার হিসেবে শুরু থেকেই নাফিস ইকবালের খ্যাতি ছিল। তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড় ছিলেন।

২০০৩ সালে ওয়ানডের মাধ্যমে তার ক্যারিয়ারের শুরু। ২০০৫ সালে আমাদের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের নায়ক তিনি। ১২১ রান করে অ্যান্ডি-গ্র্যান্ড ফ্লাওয়ার আর হিথ স্ট্রিকদের জিম্বাবুয়ে দলকে হারিয়েছেন। তখন তাকে সংবাদ সম্মেলনে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়া হলো। ভাই অন্তঃপ্রাণ ক্রিকেটার বলে বসলেন, ‘আমার চেয়েও ভালো ক্রিকেটার চট্টগ্রামে আছে। ওর নাম তামিম ইকবাল। সে আমার চেয়েও ভালো খেলোয়াড় হয়ে আসছে।’ ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের যে ভালোবাসা সেটির আদর্শ উদাহরণ নাফিস-তামিম। চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের হয়ে তারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেছেন। এক ভাই আরেক ভাইয়ের খেলা, চলাফেরা, চিন্তা সবই বুঝতে পারতেন বলে অনেকগুলো বড় রানের ইনিংসের অংশীদার হয়েছে। ঢাকার প্রিমিয়ার লীগও একত্রে খেলেছেন তারা। তবে ইনজুরি তাকে ভাইয়ের সঙ্গে একত্রে জাতীয় দলে ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দেয়নি। মা-কাকাসহ সবাই চাইলেন, ২৮ বছর বয়সে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা নাফিস জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা দেখালেন। তবে তখন আর তাকে বিবেচনা করা হলো না। ফলে অবহেলায় শেষ হয়ে গেল একটি প্রতিভা। তবে চাচা বিসিবির পরিচালক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্যতম নির্বাচক আকরাম খান কোনো দিন কোথাও ভাতিজার জন্য সুপারিশ করেননি। কেউ তার বা তামিমের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বললে চুপ করে শুনে গেছেন। বারবার বাড়ি ফিরে তাদের একটি কথাই বলেছেন, পরিশ্রম করে যাও, সাফল্য পাবেই।

তবে ইনজুরির হতাশা নাফিসকে বেশি দিন সেই সুযোগ দিল না। নাফিসের চেয়েও তামিমকে নিয়ে তার আশা বেশি ছিল। নাফিস বিখ্যাত হয়ে গেলেও তিনি বলেছেন, তামিম ওর চেয়েও ভালো খেলে। খান পরিবার আসলে তামিমকেই তুলে ধরতে চেয়েছে ক্রিকেটার হিসেবে। ২০০৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আমার ভাইয়ের জাতীয় দলে ওপেনার হিসেবে যাত্রা শুরু হলো, এখনো মনে করতে পারেন তিনি। তিনিও ছিলেন ওপেনার, তামিমও তাই। এখনো অর্ধশত বা শতরান করার পর তামিম যে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তখন তিনি তার বাবাকে বলেনÑ বাবা আমি পেরেছি।

ইকবাল খানই তামিমের একমাত্র আদর্শ ও জীবনের প্রথম কোচ। ওপর থেকে বাবা ছেলেকে দোয়া করছেনÑ এটিই মনে হয় তামিম ইকবালের। তিনি দেশের হয়ে ১৯৬টি আন্তর্জাতিক এক দিনের খেলা খেলেছেন। ৬ হাজার ৬৯৫ রান করেছেন। আছে ১১টি সেঞ্চুরি ও ৪৬টি হাফসেঞ্চুরি! এতগুলো ভালো ইনিংসের সবগুলোই কোলে পিঠে মানুষ করায় নাফিসের কাছে সেরা মনে হয়। তবে ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত লর্ডস ক্রিকেট মাঠে তিনি যে সেঞ্চুরিটি করেছেন, সেটি নাফিসের কাছে বিশেষ কিছু। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ক্রিকেটে তীর্থে তামিম ১০০ করলেন ও অনার্স বোর্ডে নাম লেখালেন। এই সেঞ্চুরি যে করতে হবে সেই স্বপ্ন কিন্তু তিনি বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পেয়েছেন। নাফিসই বলেছেনÑ ‘লর্ডসে সেঞ্চুরি করতে পারলে অনার্স বোর্ডে তোমার নাম উঠবে তামিম।’ তারপরই জেদ চাপল তামিমের। ভাইয়ের পর ওপেনার হিসেবে এলেন বলে ভাইয়ের দুঃখ বোঝেন তামিম। আর নাফিসও খেলা নিয়ে কিছু বলে ছোট ভাইয়ের মনোবল ভেঙে দিতে চান না। ফলে ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ, বোদ্ধা ও বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবদান রাখা এই পরিবারের কারও মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না।

তারপরও তামিম ইকবালের ক্যারিয়ারের দুঃসময়ে পরিবারের সবাই এক হয়ে যান। পাহাড়ি শহর চট্টগ্রাম, অনিন্দ্য সুন্দর চট্টগ্রাম বিভাগে ঘোরার জায়গার অভাব নেই; একসঙ্গে বেড়াতে তখন বেরিয়ে যান সবাই। শক্তিশালী মানসিকতার তামিম হারানো বল ফিরে পান। নিজের চাপগুলোকে জয় করে আবার খেলায় ফিরে আসেন। খেলাতেও বড় দলের চাপ সহ্য করা তার স্বভাবের অংশ।

এবার নিয়ে চারটি বিশ^কাপে খেলছেন তামিম ইকবাল। প্রথম খেলেছেন ২০০৭ সালে। এবারের বিশ^কাপে যাওয়ার আগে বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা সামান্যই হলো। তখন নাফিস বলেছেন, ‘তোমার ওপর আমাদের সবার আস্থা ও বিশ্বাস আছে তামিম ইকবাল। আলাদাভাবে কোনো কিছু নিয়ে ভেব না। তুমি আমাদের সবাইকে বারবার গর্বিত করেছ, ভবিষ্যতেও করবে জানি।’ এভাবেই ভাইকে আস্থার জোগান দিয়ে নিজে ক্রিকেট বিশ^কাপের বিশ^মঞ্চে খেলার দুঃখ ভুলেছেন নাফিস। আর তার রান খরার সময়েও বাংলাদেশ দলকে সমর্থন দিয়ে পাশে থাকার অনুরোধ করেছেন। ‘দেশসেরা এই ওপেনার দুটি ম্যাচ খারাপ খেললেই ফর্ম হারিয়ে ফেলেন না’, বলেছেন তিনি।

ইকবাল খান-আকরাম খান পরিবারের অনেক অবদান চট্টগ্রামের নানা খেলায়। তামিম, আকরামের মতো খেলোয়াড়দের তুলে আনতে চান নাফিস ইকবাল। তিনিই তো এখন চট্টগ্রামের ক্রিকেট খেলোয়াড় নির্বাচক কমিটির অন্যতম সদস্য। তবে খেলার মাঠের অভাব ভালো খেলোয়াড় তৈরিতে খুব বাধা অনুভব করেছেন তিনি। আরও মাঠ তৈরির জন্য তিনি অনুরোধ করেছেন চট্টগ্রামের বিত্তশালী, মেয়র ও মন্ত্রী ও প্রভাবশালী সমাজসেবী, রাজনীতিবিদদের। তাহলে আলোকিত চট্টগ্রামও তৈরি হবে।

বাংলাদেশের বিশ^কাপ দলের অন্যতম সদস্য হয়ে তামিম ইকবাল দেশের সুনাম ধরে রাখবেনÑ এই আশা তার।