সময়টা ২০০৫ সাল। তখন আমি জাতীয় দলে। এক বছর আগে ঢুকেছি। বাংলাদেশ সফরে আসা বিদেশি দলের বিপক্ষে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল বিকেএসপিতে। আমাদের ভিডিও অ্যানালিস্ট নাসু (নাসির আহমেদ) ভাই সেই খেলার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছিলেন। তখন এক কিশোরকে দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটা জাতীয় দলে আসবে।’ ওই প্রথম আমি সাকিব আল হাসানকে দেখি।
এরপর ২০০৬ সালে বাংলাদেশ দলে সাকিবের অভিষেক। লিকলিকে একটা ছেলে। চিকন। হাত-পাগুলো পাতলা। তখন মাত্র এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে অভ্যস্ত করছিল। সবকিছুতে। সেই সাকিবের সঙ্গে এখন বিশ্বকাপ কাঁপাচ্ছে যে সাকিব তার আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
তখন অতটা পরিণত না। কত আর বয়স। জাতীয় দলে খেলার মতো বোলিং ছিল। কিন্তু এখন ওর বোলিংয়ে যে ধার তা তো আর ছিল না। কেবল শেখার সময় ওর। কিন্তু ওই বয়স থেকে ওর মধ্যে দেখেছি দারুণ আত্মবিশ্বাস। কখনো কোনোকিছুতে চাপ নিত না। ধরুন, একজন পয়েন্টে ভালো ফিল্ডিং করতে পারে না। তাকে ওখানে দিলে তার মধ্যে নার্ভাসনেস কাজ করবে। কিন্তু সাকিবকে দেখতাম এসব ওর মধ্যে নেই। যেখানে ফিল্ডিংয়ে অভ্যস্ত না সেখানে গিয়েও সেটা করছে, ও উপভোগ করছে। ওর সবচেয়ে যেটা ভালো লেগেছিল তা হলো, জাতীয় দলে প্রথম ঢুকলে যে টেনশন কাজ করে তা একেবারে কম ছিল। খুব দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। সব কাটিয়ে উঠেছে। তখন থেকেই ও এমন আত্মবিশ্বাসী। এই বিশ্বাসের কারণেই কিন্তু আজকের অবস্থানে আসা ওর জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
সাকিব এক সাক্ষাৎকারে বলছিল, কঠোর পরিশ্রম করেছে। ২০১৯ বিশ্বকাপে তার দুর্ধর্ষ অলরাউন্ড সাফল্যের রহস্য প্রসঙ্গে। কিন্তু এ সাফল্য শুধু কঠোর পরিশ্রমে আসে না। যুবরাজ সিং ছয় বলে ছক্কা মেরেছে। এসব বিরল। আর কখনো পারেনি। একেকটা বলে মেরেছে আর ওর মনে হয়েছে পরেরটাতে পারবে। এভাবে ছয় বলে ছয় ছক্কা হয়ে গেছে। প্রতি শটে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।
এবারের টুর্নামেন্টে সাকিব প্রথম ম্যাচে পারফরম করল। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে। এভাবে ওর ভেতরে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, ‘হ্যাঁ, আমার পক্ষে রান করা সম্ভব। পরের ম্যাচেও রান করতে পারব।’ এই যে পরিশ্রমের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস যখন খাপে খাপে মিলে যায় তখন এমন পারফরম্যান্স বেরিয়ে আসে। পরের ম্যাচে রান করবে কী করবে না সেটা ব্যাপার না। ওর ভেতরের বিশ্বাসটাই গুরুত্বপূর্ণ। ও জানে, পরের ম্যাচে সেঞ্চুরি করতে না পারলেও আরামে ৫০/৬০ করে ফেলতে পারবে। এই আত্মবিশ্বাসটাই শুরুটা চমৎকার করে দেয়। ওই সময়ের মধ্য দিয়ে ও যাচ্ছে। ওর আত্মবিশ্বাস খুব ভালো। একটার পর একটা পারফরম্যান্সে বিশ্বাস জন্মেছে যে নামলেই রান হবে। ওই বিশ্বাসটাই সাকিবের কাজে দিচ্ছে।
৫০০-এর কাছাকাছি রানের সঙ্গে ১০ উইকেট নিয়ে ফেলেছে। এবারের বিশ্বকাপের ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হওয়ার দাবিদারদের সেরা এখন সাকিব। ওর বোলিং সবসময় ভালো ছিল। ব্যাটিং হয়তো এত ভালো ছিল না। কিন্তু আমি বরাবর দেখেছি, ও বোলিংয়ে এলে প্রতিপক্ষ অন্তত এটা ভেবেছে আর কাউকে দেখি না দেখি সাকিবকে দেখে খেলি। বোলিংয়ে সবসময় দারুণ। কিন্তু ব্যাটিংয়ে এই বিশ্বকাপে পরিপূর্ণ একজন সাকিবকে দেখছি। এখানে ওর উন্নতি হয়েছে অনেক।
সাকিবকে খুব কাছ থেকে দেখার সূত্রে বলতে পারি, ওর জেদ খুব বেশি। সেটাই ওর আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছে। আইপিএলে বসিয়ে রাখা কিংবা ক্যাম্পে যোগ না দেওয়াসহ নানা নেতিবাচক ঘটনা ওর মনে জেদ তৈরি করে থাকবে। তাছাড়া আমি সাকিব-তামিম ইকবাল-মুশফিকুর রহিমদের সবসময় দেখেছি, সেই ওদের শুরুর দিনগুলো থেকে যে নিজেদের মধ্যে মৃদু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। মজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যা স্বাস্থ্যকর। ইতিবাচক। যেমন একজন ১০০ করলে অন্যজন ১০১ করতে চায়। আরেকজন ৫ হাজার করলে ভিন্নজন ৫ হাজার ১ করতে চায়। আমি জাতীয় দলে থাকতেই ওদের আসা। এক সিরিজে একজন আরেকজনকে এমনও বলত, ‘তুই তিনশো করলে আমি সাড়ে তিনশো করব।’ তামিম আবার রেকর্ড নিয়ে শুরু থেকে খুব মজে থাকত। রেকর্ড ব্রেক করার টার্গেট করত। এই তিনজনের এই প্রতিযোগিতা খুব কাজে এসেছে।
বিশ্বকাপে সাকিবের ব্যাটিংয়ে তিন নম্বরে চলে আসা যে কী কাজে এসেছে! এই যে ওপেনাররা বড় রান করতে পারছে না তা আমরা অনুভব করতে পারছি না শুধু সাকিবের জন্য। সাকিবের কারণে কোচের পরিকল্পনার কাজ খুব সহজ হয়েছে। আর দল এখনো ওপরের দিকের সমস্যাটা বুঝতে পারেনি একমাত্র সাকিবের কারণে।