জয় দিয়ে শেষ হোক বিশ্বকাপ মিশন

কী এক হাস্যকর পরিস্থিতি বলুন তো! সেমিফাইনালে খেলতে হলে পাকিস্তানের শুধু জিতলে চলছে না, বাংলাদেশকে তাদের হারাতে হবে অদ্ভুত শর্ত পূরণ করে। তারা ৪০০ করলে বাংলাদেশের সঙ্গে জয়ের ব্যবধান

থাকতে হবে অন্তত ৩১৬ রানের। আবার টস জিতে বাংলাদেশ আগে ব্যাট করলে খেলা শুরু হওয়ার আগেই পাকিস্তানের সেমিতে খেলার স্বপ্ন শেষ! হাস্যকর নয়?

এটা অসম্ভব এক ব্যাপার। কোনো ছোট দলকেই তো এত বড় ব্যবধানে হারানো যায় না। আর এখন বাংলাদেশ অনেক পরিণত ও ভালো এক দল। পাকিস্তানের এই হিসাব-নিকাশ পূরণ করে শেষ চারে উঠে যাওয়া আমার মতে অসম্ভব ব্যাপার। কখনই সম্ভব না।

তাছাড়া আমার খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পাকিস্তানের বিপক্ষে আমাদের সবসময় বাড়তি প্রেরণা থাকে। এমনিতে অন্য দলের সঙ্গে প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলি। কিন্তু এই ব্যাপারটা আলাদা। পাকিস্তানের বিপক্ষে নামলে আমাদের খেলোয়াড়দের মাথায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কাজ করে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। পাকিস্তানকে হারাতে পারলে আমাদের মধ্যে একাত্তরের সেই বিজয়ের মতো একটা ব্যাপার কাজ করে। তাছাড়া খেলা তো আমার চোখে একরকম যুদ্ধই। পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা আরও বড় যুদ্ধ। এ ম্যাচ আমরা সবসময় জিততে চাই প্রাণ দিয়ে হলেও।

আরও একটা কথা। এই ম্যাচ জিতলে আমরা পাঁচ নম্বরে থেকে এবারের বিশ্বকাপ শেষ করতে পারব। এটা অনেক বড় এক অর্জন হবে। ভাবুন একবার, তখন আমাদের পেছনে থাকবে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা এমনকি পাকিস্তানও। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এখন আমরা সাত নম্বর দল। কিন্তু বিশ্বকাপের বিচারে আমরা হয়ে যাব পাঁচ নম্বর।

হ্যাঁ, এটা ঠিক কিছু ছোট ছোট ভুলের কারণে আমাদের সেমিফাইনালে খেলা হলো না। কিন্তু এটা আমাদের জন্য ভালো একটা শিক্ষা ছিল আমি বলব। এখান থেকে শেখা জরুরি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ একবারই পাকিস্তানের সঙ্গে খেলেছে আর সেই ঘটনা ছিল বিশ্বকে নাড়া দেওয়া। আমার জন্য সেই দিনটা অবশ্য নিদারুণ দুঃখের। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যায়। আর পাকিস্তানকে যেদিন ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটিয়ে ওই বিশ্বকাপে হারিয়ে দেয়, সেই ম্যাচ চলাকালে আমার বাবা মারা যান। এই দিনটা আমার পক্ষে ভোলার উপায় নেই।

তাই সেদিন ম্যাচের পুরোটা দেখা হয়নি। পরে হাইলাইটস দেখেছিলাম। ভাবতেই অবাক লাগে, বিশ্ব ক্রিকেটে শুরুর দিকেই আমরা পাকিস্তানকে বিশ্বকাপের মতো আসরে হারিয়েছি। তখন ওরা কিংবদন্তিদের দল। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুসদের দল। খুব পরিণত ও সমীহ জাগানো দল। কেউ কল্পনাও করতে পারেনি বাংলাদেশের মতো একটা অপরিণত দল সেদিন পাকিস্তানকে হারিয়ে দিতে পারে। আমাদের জন্য বিরাট এক অর্জন ছিল ওই ম্যাচের জয়।

ফেরা যাক আজকের ম্যাচ প্রসঙ্গে। লর্ডসে আজ সম্ভবত আমাদের একাদশে পরিবর্তন আসবে। মাহমুদউল্লাহ ফিট হয়ে খেলতে পারলে আমি মোসাদ্দেক হোসেনের জায়গায় সাব্বির রহমানকে খেলানোর পক্ষে। এটা ঠিক ও নিয়মিত রান করে না। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ওই ম্যাচে তার ৩৬ বলে খেলা ৩৬ রানের ইনিংস বিচার করলে দেখবেন সাব্বির থেকে গেলে আমরা এক ওভার হাতে রেখেই হয়তো ম্যাচটা জিততাম। ও কতদিন দলের বাইরে ছিল। কিন্তু খেলায় তার ছাপ ছিল না। সুইপ করেছে, ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে খেলেছে। ড্যাশিং ব্যাটসম্যান সাব্বির, আক্রমণাত্মক। বলছি না মোসাদ্দেক দলের হয়ে খেলে না। সেও তাই খেলে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি সাব্বিরকে অনেক বেশি ইতিবাচক ক্রিকেটার হিসেবে দেখি। দলের জন্য খেলে। কখনো নিজের কথা চিন্তা করে স্বার্থপর খেলা খেলে না।

আরেকটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারছি না। সৌম্য সরকার বল করলেই ভালো করছে। তাহলে তাকে কেন নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না? ও ভালো করছে বলে আমাদের বাড়তি একজন পেসারের তো দরকার নেই। পাকিস্তানের বিপক্ষে যেমন রুবেল হোসেনের জায়গায় মেহেদী হাসান মিরাজকে ফিরিয়ে আনা ভালো। তরুণ অফ স্পিনার খুব ইকোনমিক্যাল। কখনো কখনো রান বেশি দেয়। কিন্তু সাকিব আল হাসানের সঙ্গে ওর রসায়ন ভালো কাজ করে। দলের কাজে আসে।

সব মিলিয়ে আমি চাই, বাংলাদেশ এবারের বিশ্বকাপটা জয় দিয়ে শেষ করুক। আমাদের একটা দুঃখ থাকবেই। সেমিফাইনালে খেলতে পারলাম না। কিন্তু যা হয়েছে তা তো কম না। সারা বিশ্বের হৃদয় জয় করেছে বাংলাদেশ তাদের ব্র্যান্ড ক্রিকেট খেলে। কিন্তু খারাপ লাগে যখন দেখি ক্যাচ কিংবা স্টাম্পিং মিস করার জন্য তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমকে যা তা বলা হয়। রেকর্ড ঘেঁটে দেখুন, জন্টি রোডস, হার্শেল গিবসদের মতো বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফিল্ডারও ক্যাচ মিস করেছে। এসব তো খেলার অংশ। মেনে নিতে হবে। মেনে নেওয়া শিখতে হবে।

তাই এমন যারা তাদের বলি, খেলোয়াড়দের নিন্দা না করে ওদের সমর্থন করুন। বিশ্বকাপই তো শেষ না। এরপর আরও খেলা খেলতে হবে। বাংলাদেশ দলের পাশে থাকুন সব অবস্থায়।