পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫ স্মরণীয় জয়

৯৯’র সেই ঐতিহাসিক জয়

 

৩১ মে, ১৯৯৯। এদিনেই এসেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয়। বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে ৬২ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।

ম্যাচটা হয়েছিল নর্দাম্পটনে। ২০ বছর পরেও নাকি নর্দাম্পটনশায়ার কাউন্টি গ্রাউন্ড আগের মতোই আছে। একদিকে ক্যাথেড্রল। অন্যদিকে লাল ইটের বাড়িঘর। সঙ্গে সবুজ গাছপালা। মিনহাজুল আবেদীন নান্নু বলেন, ‘সেই জয় আর ওই মাঠটা চিরদিন আমাদের হৃদয়ে থাকবে।’

সেই ম্যাচ জেতার মুহূর্তে মজার কিছু ঘটনা এখনো মনে করতে পারেন বাংলাদেশ দলের উইকেটকিপার খালেদ মাসুদ পাইলট। বাংলাদেশ দলের তরুণ সদস্যের একজন ছিলেন তিনি। ব্যাট হাতে ১৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলার পর তিনটি রান আউটও করেছিলেন। সাকলাইন মোশতাককে রান আউট করার পরেই ঘটেছিল সেই ঘটনা। পাকিস্তানের শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে উইকেটে তখন সাকলাইন আর শোয়েব আখতার। তো সাকলাইনকে রান আউট করার পর নর্দাম্পটনে কী হয়েছিল সে সম্পর্কে দেশ রূপান্তরকে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পাইলট বলেন, ‘আমি জানতাম ও রান আউট। কিন্তু সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল থার্ড আম্পায়ারকে। আমি একটা স্টাম্প আর বল কুড়িয়ে নিলাম। এরপর তাকিয়ে দেখি মৌমাছির মতো দর্শক ছুটে আসছে উইকেটের দিকে। আমরা সবাই পড়িমরি করে ড্রেসিংরুমের দিকে দৌড় দিলাম। কাছাকাছি পৌঁছানোর পর কেউ একজন আমার কিপিং গ্লাভস জোরে টান মেরে নিয়ে গেল। তখনো একটা গ্লাভস আমার হাতে। ওটাই সেই ম্যাচের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছি।’

পাইলটের গ্লাভস হারিয়েছিল। আর মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর টুপি নিয়ে দৌড় দিয়েছিল দর্শক। সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ক্রিকইনফোকে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের শেষ উইকেট ছিল রান আউট। আমরা তৃতীয় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সব দর্শক তখন মাঠে ঢুকে পড়েছে। সেই সময় এটা খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। হঠাৎ দেখলাম একজন আমার মাথার টুপি নিয়ে দৌড় দিল। মজার ব্যাপার লোকটা নিজেও টুপি পরে ছিল। অথচ আমার টুপিটা নিয়ে দিল চম্পট।’ ২০ বছর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে নর্দাম্পটনে বাংলাদেশ যখন খেলতে নামে তখন তাদের বিশ্বকাপ শেষ। মানে এবারের মতোই ডেড রাবারের লড়াই। যদিও মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার দলের সঙ্গে তাদের তুলনাই চলে না। আজ লর্ডসে যে বাংলাদেশ খেলবে পাকিস্তানের বিপক্ষে তারা সেমিফাইনালের সম্ভাবনা জাগিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। আর ১৯৯৯ সালে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল খেলার আগে পাকিস্তানকে হারানোর কল্পনাই করেনি। সেই ম্যাচ জয়ের নায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ (শাহরিয়ার হোসেন), আকরাম (খান) ভাই, নান্নু ভাই খুব দরকারি ইনিংস খেলেছিলেন। (নাঈমুর রহমান) দুর্জয় অসাধারণ একটা রান আউট করেছিল। আমরা দুনিয়ার সেরা দলের মোকাবিলা করছিলাম। ভেবেছিলাম ২২৩ রান ডিফেন্ড করার একটা সুযোগ হয়তো আছে। আমরা ভেবেছিলাম একটা লড়াই দিতে পারব। কিন্তু আমি ভাবিনি তাদের হারাতে পারব। এমনকি ম্যাচের মধ্যবিরতির সময়ও মনে হয়নি আমরা জিতব।’ কখন মনে হয়েছিল বাংলাদেশ জিততে পারে? উত্তর সুজন বলেন, ‘সাঈদ আনোয়ার রান আউট হয়েছিল এরপরই আউট সেলিম মালিক ও ইনজামাম-উল-হক। তখন পাকিস্তান চার উইকেট হারিয়েছে। সেই সময় আমাদের বিশ্বাস হতে শুরু করেছিল এই ম্যাচ জিততে পারব। সবার দেহভঙ্গিই তখন বদলে গেছে। মনে আছে ডিপ স্কয়ার লেগে ওয়াসিম আকরামের ক্যাচ নিলেন নান্নু ভাই। তখন আমরা নিশ্চিত হলাম, জয়টা কেবল সময়ের অপেক্ষা।’

৬২ রানে সেদিন জিতেছিল বাংলাদেশ। সুজন ১০ ওভার বল করে দুই মেডেনসহ ৩১ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। ব্যাট হাতে করেছিলেন ২৭ রান। ম্যাচসেরা হওয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো প্রতিদ্বন্দীই ছিল না। অথচ সেদিন নতুন বল হাতে নাও নিতে পারতেন সুজন। নিয়মিত পেসার হাসিবুল হাসান ও মঞ্জুরুল ইসলামকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তাই নতুন বল হাতে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সুজন। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, ‘শহিদ আফ্রিদিকে আউট সুইং দিয়েছিলাম। টপ এজে লেগে পয়েন্টে ক্যাচ উঠল। মেহরাব হোসেন অপি ধরল। এরপর আমি ইনজামাম ও সেলিম মালিককে এলবিডব্লিউ করলাম। মনে হয় ইংলিশ কন্ডিশনে আমি মানিয়ে নিয়েছিলাম। আমার বলে পেস ছিল না। কিন্তু আমি বল দুদিকে সুইং করাতে পারতাম।’ সেই ম্যাচে সুজনের সাফল্যের কারণ ছিল এটাই।

তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই একটা গুজব ছড়িয়েছিল যে বাংলাদেশ দলের কোচ গর্ডন গ্রিনিজ বরখাস্ত হয়েছেন। সেই ঘটনা নিয়ে খালেদ মাহমুদের স্মৃতিচারণ, ‘অনেক বছর আগের ঘটনা তবু সেই স্মৃতি এখনো আমার মনে তরতাজা হয়ে আছে। সেদিন একটা নাটক হয়েছিল। আমরা খেলার আগে শুনলাম গ্রিনিজ দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। সে আমাদের বলেছিল কোচ হিসেবে এটাই তার শেষ ম্যাচ।’

পরের ঘটনাপ্রবাহ সবার জানা। হতে পারে প্রিয় কোচকে একটা বিদায়ী উপহার দিতেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়টা তুলে নিয়েছিল টাইগাররা।

১৭ এপ্রিল ২০১৫, মিরপুর

বাংলাদেশ ৭৯ রানে জয়ী

গত বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ওয়ানডেটি ছিল ১৭ এপ্রিল ২০১৫ মিরপুরে। টস জিতে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশকে বড় সংগ্রহ পাইয়ে দেন তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম। দুজনই পান সেঞ্চুরির দেখা। দ্বিতীয় উইকেটে ১৭৮ রানের জুটি গড়েন দুজন মিলে। তামিম ১৩৫ বলে ১৩২ করলেও ঝড়ো ব্যাটিংয়ে মুশফিক ১০৬ রান করতে খরচ করেন মাত্র ৭৭ বল। ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ পায় ৩২৯ রানের বড় পুঁজি। ওয়াহাব রিয়াজ নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। জবাব দিতে নেমে ২৫০ রানেই গুটিয়ে যায় পাকিস্তান। অধিনায়ক আজহার আলি, মোহাম্মদ রিজওয়ান ও হারিস সোহেলের ফিফটিগুলো বড় করতে দেননি তাসকিন আহমেদ-আরাফাত সানি। ৩টি করে উইকেট নেন দুজনই। ম্যাচসেরা হন মুশফিক।

 

১৯ এপ্রিল ২০১৫, মিরপুর

বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী

দুদিন পর একই মাঠে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু স্বাগতিকদের মতো ব্যাট হাতে জ্বলে উঠতে পারেননি অতিথি ব্যাটসম্যানরা। বলা যায় নিয়ন্ত্রিত বোলিং করে সফরকারীদের জ্বলে উঠতে দেননি বাংলাদেশের বোলাররা। ৬ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৩৯ রান। টপ অর্ডার পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ার পরও এই সংগ্রহে যেতে পেরেছিল পাকিস্তান অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে নামা ওয়াহাব রিয়াজের ৪০ বলে ৫১ রানের ইনিংসে। সাকিব আল হাসান ২ উইকেট নেন। সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে তামিম যেন শুরু করেছিলেন প্রথম ম্যাচ থেকে। এ ম্যাচেও সেঞ্চুরির দেখা পান এই বাঁহাতি ওপেনার। আর ফর্মের ধারা অব্যাহত রেখে মুশফিকও (৭০ বলে ৬৫) দেন যোগ্য সংগত। ১১৬ বলে ১১৬ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা তামিম ৭১ বল হাতে রেখে দলের ৭ উইকেটের জয় নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি সিরিজ জয়ও নিশ্চিত হয় মাশরাফী বাহিনীর।

২২ এপ্রিল ২০১৫, মিরপুর

বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী

এই ম্যাচটা ছিল পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার। টসজয়ী অধিনায়ক আজহার আলি ১০১ রানের ইনিংস খেলেন। এছাড়া হারিস সোহেলের ফিফটি এবং আরেক ওপেনার সামি আসলামের ৪৫ রানে ভর করে পাকিস্তান এক ওভার বাকি থাকতে গুটিয়ে যায় ২৫০ রানে। বাংলাদেশের মাশরাফী, রুবেল হোসেন, আরাফাত সানি ও সাকিব ২টি করে উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে বড় সংগ্রহ পেতে দেননি। ২৫১ তাড়া করতে নেমে দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার গড়েন ম্যাচজয়ী ১৪৫ রানের জুটি। আগের দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকানো তামিম ৬৪ রানে বিদায় নিলেও সৌম্য সরকার ১১০ বলে ১২৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে ৬৩ বল হাতে রেখে দলের ৮ উইকেটের জয় নিশ্চিত করেন। মুশফিক অপরাজিত থাকেন ৪৯ রানে। ম্যাচসেরা হন সৌম্য। আর পাকিস্তানকে প্রথম হোয়াইটওয়াশ করা সিরিজের সেরা হন তামিম ইকবাল।

 

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, আবুধাবি

বাংলাদেশ ৩৭ রানে জয়ী

এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠার ম্যাচ ছিল এটি। যারা জিতবে তারাই চলে যাবে ফাইনালে। খেলবে ভারতের সঙ্গে শিরোপা জিততে। আবুধাবিতে টস জিতে ব্যাটিং নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। কিন্তু ১২ রানে প্রথম তিন ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশ। সেখান থেকে টেনে তোলেন মুশফিকুর রহিম ও মোহাম্মদ মিঠুন। চতুর্থ উইকেটে ১৪৪ রানের জুটি গড়েন দুজন। মিঠুন ৮৪ বলে ৬০ রানে বিদায় নিলেও মুশফিক ১১৬ বলে ৯৯ রানের ইনিংস গড়ে দলকে ২৩৯ রানের সংগ্রহ পাইয়ে দেন। মূলত জুনায়েদ খানের ১৯ রানে ৪ উইকেট শিকারেই বাংলাদেশ পায়নি বড় সংগ্রহ। সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারায় পাকিস্তান। ওপেনার ইমাম-উল-হক একপাশ আঁকড়ে রেখে খেলেন ১০৫ বলে ৮৩ রানের ইনিংস। যদিও সেটা যথেষ্ট ছিল না। মোস্তাফিজুর রহমানের কাটারে রীতিমতো কাঁপতে থাকা পাকিস্তানের বাকি ব্যাটসম্যানরা ব্যস্ত ছিলেন আসা-যাওয়ার মিছিলে। সুবাদে ৯ উইকেট হারিয়ে ২০২ রানের বেশি তুলতে পারেনি তারা। বাংলাদেশ ৩৭ রানের অনায়াস জয় নিয়ে নাম লেখায় এশিয়া কাপের ফাইনালে। এ জয়টা আজও বাংলাদেশকে দেবে বাড়তি প্রেরণা। কারণ এরপর দুটি দল আর মুখোমুখিই হয়নি।